গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়ার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে ৩০ মামলার আসামি ‘পিচ্চি রাজা’ পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
তদন্তে জানা গেছে, গাজীপুরের বাইমাইল এলাকা থেকে নয়, ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকেই প্রিজন ভ্যান থেকে বের হয়ে একটি অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকারে করে পালিয়ে যান পিচ্চি রাজা। পরে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিতে বাইমাইল থেকে পালানোর একটি কাহিনি সাজানো হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমা, স্কট পার্টির ইনচার্জ এসআই প্রবীর কুমার এবং প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত চালক কামাল হোসেনের বাড়ি থেকে নগদ ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে গাজীপুর মহানগর পুলিশের সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার।
পুলিশ কমিশনার জানান, গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ৩০ আসামিকে ঢাকার আদালতে হাজিরা ও মামলার শুনানির জন্য নেওয়া হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে রাতে তাদের কাশিমপুর কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার পথে পিচ্চি রাজা প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান।
ঘটনার পর দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রিজন ভ্যানটি গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় পৌঁছালে সঙ্গে থাকা এক এসআই পিচ্চি রাজাকে টয়লেট করানোর কথা বলে ভ্যান থেকে নামান। এ সময় সুযোগ বুঝে পিচ্চি রাজা দৌড়ে পালিয়ে যান। পরে ভ্যানে থাকা অন্য ২৯ আসামিকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে প্রিজন ভ্যানের সঙ্গে থাকা এসআই প্রবীর কুমার, কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন, মো. সাকিব, শাকিল হোসেন এবং প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সঙ্গে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তবে তদন্তে বেরিয়ে আসে ভিন্ন তথ্য।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ঢাকা জেলা জজ আদালত থেকে ২৯ আসামিকে নিয়ে স্কট পার্টির প্রিজন ভ্যানটি কাশিমপুরের উদ্দেশে রওনা দেয়। পথে ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকার পুপলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছে প্রিজন ভ্যানটি থামানো হয়। সেখানে স্কট পার্টির ইনচার্জ এসআই প্রবীর কুমার প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনের কাছ থেকে গাড়ির চাবি নেন।
এরপর পিচ্চি রাজা ও হাজতি আসামি খাইরুল বাশারকে প্রিজন ভ্যান থেকে বের করে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। খাইরুল বাশারকে প্রিজন ভ্যানের চালকের পাশের আসনে বসানো হলেও পিচ্চি রাজা ও এসআই প্রবীর কুমার আর ভ্যানে ওঠেননি।
তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় সেখানে অপেক্ষমাণ একটি প্রাইভেটকারে করে পিচ্চি রাজা পালিয়ে যান। পরে এসআই প্রবীর কুমার রাত সাড়ে ৮টার দিকে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় গিয়ে প্রিজন ভ্যানে ওঠেন। এরপর পিচ্চি রাজা বাইমাইল এলাকা থেকে পালিয়েছেন—এমন একটি ঘটনা সাজিয়ে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের দাবি, বিভিন্ন সাক্ষ্য, আলামত ও তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করেই প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তদন্তের ভিত্তিতেই তাসলিমা, এসআই প্রবীর কুমার ও নায়েক কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া ৩০ মামলার আসামি পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ।
পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার বলেন, বিভিন্ন সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমা, স্কট লিডার এসআই প্রবীর কুমার এবং প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর প্রিজন ভ্যানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা এবং বহুমামলার একজন আসামি কীভাবে আদালত থেকে কারাগারে ফেরার পথে নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে পালিয়ে গেলেন—তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তদন্ত এগিয়ে গেলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।







