বিশেষ প্রতিবেদক: পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ৪৯২ জন অফিস সহায়ক ও ৭২ জন নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, উত্তরপত্র জালিয়াতি, নিয়োগ-বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে ২৩০ জন পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্রে একই ধরনের উত্তর, একই হাতের লেখা এবং একটি প্রকাশনার গাইড বইয়ের সঙ্গে হুবহু মিল পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট (এফআইসিএসডি)। ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবরের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১২ জুন পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ৪৯২ জন অফিস সহায়ক এবং ৭২ জন নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে ৩৭২ জন অফিস সহায়ক ও ৬৯ জন নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে সবচেয়ে গুরুতর যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো ২৩০ জন পরীক্ষার্থীর লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্রে সব প্রশ্নের উত্তর হুবহু একই পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকজন পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্রে একই ব্যক্তির হাতের লেখারও মিল পাওয়া যায়। বিষয়টি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে উপস্থিত করা হলে তারা উত্তরপত্রের লেখা নিজেদের নয় বলে স্বীকার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও বলা হয়েছে, ওই ২৩০টি উত্তরপত্রের উত্তরগুলোর সঙ্গে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরের মাসে অগ্রদূত প্রকাশনার প্রকাশিত ‘জব সল্যুশন’ গাইড বইয়ের উত্তরগুলোর হুবহু মিল পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে এসব বিষয়কে নিয়োগ পরীক্ষায় গুরুতর জালিয়াতির আলামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২০২৩ সালের ১১ মে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ছয় সদস্যের একটি নিয়োগ কমিটি গঠন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা যায়, ওই সময়ে ব্যাংকে দুজন সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক কর্মরত থাকলেও মো. আলাউদ্দীনকে নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সদস্য সচিব হিসেবে তিনি পুরো নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত আর্থিক অনিয়ম বা অবৈধ লেনদেনের অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অর্থের প্রকৃত পরিমাণ ও লেনদেনের সঙ্গে কারা জড়িত—তা নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট নথি থেকে প্রতীয়মান হয়।
নিয়োগ পরীক্ষার উত্তরপত্র সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে।
পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষার উত্তরপত্র সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ট্রাঙ্কের চাবি তৎকালীন জিএম মো. আলাউদ্দীনের কাছে সংরক্ষিত ছিল।
এই তথ্যের সঙ্গে ২৩০টি উত্তরপত্রে জালিয়াতির অভিযোগের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা আরও তদন্তের বিষয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই চার জেলার জন্য নির্ধারিত ২৭টি পদের বিপরীতে ৪০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রযোজ্য কোটা বিধান উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া নিয়োগ কার্যক্রমে ঘুষের অর্থ সংগ্রহ ও ভাগ-বাটোয়ারার ক্ষেত্রে মো. আলাউদ্দীনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল—এমন অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়োগ জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে রাজধানীর মিরপুর, মাতিকাটা, ভাষানটেকসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগও পরিদর্শন প্রতিবেদনে রয়েছে।
এ ছাড়া অবৈধ অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কানাডায় বসবাসরত তার ছেলের কাছে পাচার করা হয়েছে—এমন অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদ ও অর্থের উৎস এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী ও তদন্তকারী সংস্থার পৃথক অনুসন্ধান প্রয়োজন।
মো. আলাউদ্দীনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন এবং হাউস বিল্ডিং ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে বৈষম্য করার অভিযোগও উঠে এসেছে।
এ ছাড়া ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিভাগীয় ব্যবস্থা থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে।
বিভাগীয় আপিল ও শৃঙ্খলা (ডিএসি) কমিটির কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগও করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে উত্থাপিত এসব তথ্য পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ করে ২৩০টি উত্তরপত্রে একই উত্তর, একই হাতের লেখার অভিযোগ এবং প্রকাশিত গাইড বইয়ের সঙ্গে উত্তর মিলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, মেধার মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, সরকারি চাকরিতে নিয়োগপ্রত্যাশী লাখো তরুণের আস্থার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।







