, ,

দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুর টোলে ৫৩ কোটি টাকার গরমিল,অভিযোগের তীর নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের দিকে

নিউজটি শেয়ার করুন

দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুর টোলে ৫৩ কোটি টাকার গরমিল অভিযোগের তীর বরিশাল সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের দিকে । দৈনিক আদায় ১৩ লাখ টাকা, কোষাগারে জমা মাত্র পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ,সরকারি রাজস্ব তসরুপের অভিযোগে মন্ত্রণালয় ও দুদকের সমন্বিত তদন্তের দাবি ।

 

ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত দক্ষিণাঞ্চলের দুই গুরুত্বপূর্ণ সেতুর টোল আদায় নিয়ে সরকারি রাজস্ব তসরুপের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (দোয়ারিকা) সেতু ও মেজর এম এ জলিল (শিকারপুর) সেতু থেকে গত প্রায় দুই বছরে আনুমানিক ৯৫ কোটি টাকা টোল আদায় হলেও সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ৪২ কোটি টাকা। এই দুই অঙ্কের বিশাল পার্থক্য প্রায় ৫৩ কোটি টাকা, যা পুরো বছরের রাজস্ব বাজেটের অনেক বড় একটি খাতের সমান বলে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। আর এই অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম, তাঁর নামেই সরকারি ওই বিভাগের বারিশাল ডিভিশন দপ্তরের তালিকায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগের সূত্রপাত ইজারা ব্যবস্থা থেকে সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায়, যাকে খাস কালেকশন বলা হয়, সেই পদ্ধতি চালুর পর। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই খাস কালেকশনের সময়কালে অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই সেতু থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ টাকার বেশি টোল আদায় হয়েছে, অথচ সরকারি কোষাগারে দৈনিক গড়ে জমা পড়েছে মাত্র পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। প্রকৃত আদায়ের সঙ্গে জমাকৃত অর্থের এই বিস্তর ব্যবধানই আত্মসাতের অভিযোগের মূল ভিত্তি বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

সেতু দুটির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এগুলো শুধু যানবাহন পারাপারের স্থাপনা নয়, দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণসংযোগের প্রতীক। বরিশালের বাবুগঞ্জে সুগন্ধা নদীর ওপর নির্মিত দোয়ারিকা সেতুর দৈর্ঘ্য ৩৯০ মিটার, আর উজিরপুরের সন্ধ্যা নদীর ওপর শিকারপুর সেতু ২৯২ মিটার দীর্ঘ। জাতীয় মহাসড়কের ১৪৮তম কিলোমিটারে অবস্থিত দোয়ারিকা সেতু ও ১৪৬তম কিলোমিটারের শিকারপুর সেতু মিলে নির্মাণ ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১২ কোটি টাকা। ২০০৩ সালের ১২ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যান চলাচলের জন্য সেতু দুটি উদ্বোধন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের দুই বীর শহীদের নামে সেতু দুটির নামকরণ করা হয়। প্রতিদিন এই দুই সেতু দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ এবং পণ্যবাহী হাজারো যানবাহন চলাচল করে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সেতু দুটি নির্মাণের ফলে বরিশালের সঙ্গে দেশের অন্যান্য বিভাগের যোগাযোগ উন্নত হয়েছে, ব্যবসায়ীরা স্বল্প খরচে পণ্য পরিবহন করতে পারছেন।

টোল ইজারার হিসাব বিশ্লেষণ করলে ধাপে ধাপে অনিয়মের চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক হাজার ছিয়ানব্বই দিনের জন্য মেসার্স রহমান ট্রেডার্সকে ভ্যাট ও আয়করসহ মোট ৫৮ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায় দুই সেতুর টোল ইজারা দেওয়া হয়েছিল। তখনও একই ধরনের সন্দেহের জায়গা ছিল। ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর এ দুই সেতুর টোল আয় প্রায় চারগুণ বেড়ে যায় এবং দৈনিক আদায় পৌঁছে যায় নয় থেকে দশ লাখ টাকায়। পর্যটন মৌসুম, চরমোনাই ও শর্ষিনার মাহফিল, পায়রা বন্দর ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারী যানবাহন, সামরিক ঘাঁটির যান চলাচল, ঈদ ও পূজার মতো সময়ে আয় আরও কয়েকগুণ বাড়ে। এমতাবস্থায় সরকার প্রতিদিন ন্যূনতম নয় লাখ টাকা হিসাবে এক হাজার ছিয়ানব্বই দিনে প্রায় ৯৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আয়ের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে ইজারার মেয়াদ শেষের আগেই মূল্যায়ন ছাড়া আগের মূল্যের সঙ্গে মাত্র সাত শতাংশ যোগ করে নতুন ইজারা অনুমোদনের চেষ্টা নেওয়া হয় বলে তখনই অভিযোগ ওঠে, যাতে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল।

ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিন বছরের জন্য এক শত এক কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যে চাঁদনী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসকে নতুন ইজারাদার হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে সওজ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির জামানত বাজেয়াপ্ত করে। এরপর নতুন করে ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় খাস কালেকশন শুরু করা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্যে, ইজারাদারের হিসাবের মতো এখানে কোনো বহির্বিশ্ব নেই, সরকারের নিজস্ব কর্মীরাই টোল আদায় করছেন, অথচ এই পদ্ধতিতেই সবচেয়ে বেশি অর্থ হিসাবের বাইরে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের নির্দেশে প্রতিদিন সংগৃহীত প্রকৃত টোলের তুলনায় কম অর্থ সরকারি চালানে জমা দেখিয়ে ব্যবধানের টাকা হরিলুট করা হয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের নিজের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

খাস কালেকশনের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে সওজেরই একটি সরকারি চিঠি। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নবম আহ্বানে সর্বোচ্চ দরদাতা আতিক কনস্ট্রাকশনের অনুকূলে তিন বছরের জন্য ৮৫ কোটি টাকায় ইজারা অনুমোদনের সুপারিশ করেন। ওই চিঠিতেই খাস কালেকশনের ভিত্তিতে তিন বছরে সরকারের আয় ৬৩ কোটি টাকা হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি নথির হিসাবেই প্রতি বছর গড়ে মাত্র ২১ কোটি টাকা রাজস্ব আসার কথা, যেখানে ইজারা দিলে প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর গড়ে ২৮ কোটি টাকার মতো দিতে রাজি ছিল। আতিক কনস্ট্রাকশনের প্রস্তাবিত ইজারা মূল্য সম্ভাব্য খাস আয়ের চেয়ে ২২ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি হওয়া সত্ত্বেও সুপারিশের পরও নতুন ইজারা কার্যকর না হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন খাস কালেকশন চলতে থাকায় সরকারি রাজস্ব ক্ষতির প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে।

এর আগেও এই সেতু দুটির টোল আদায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দোয়ারিকা সেতুতে সরকারি রসিদ ছাড়াই টোল আদায়ের অভিযোগ ওঠে সওজ কর্মীদের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে সেতু পারাপারে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও অভিযোগ ছিল স্থানীয়দের। সুগন্ধা ও সন্ধ্যা নদীর ওপর সেতু দুটির ল্যাম্পপোস্টে আলো না থাকায় রাতের বেলা ছিনতাইসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য। বরিশালের সঙ্গে যোগাযোগের এই জীবনরেখায় টোল আদায়ে দুর্নীতির অভিযোগে এবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, এটি কোনো সাধারণ হিসাবের গরমিল নয়, জাতীয় রাজস্বের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত একটি আর্থিক অপরাধের অভিযোগ, যা যাচাইয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত প্যানেল গঠন করতে হবে। একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি শর্তসাপেক্ষে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ যানবাহন সেতু দুটি পার হয়, তাতে পাঁচ লাখ টাকার কম রাজস্ব জমা হওয়া কল্পনাতীত। তাঁর ভাষ্যে, প্রকৃত হিসাব বের করতে হলে দৈনিক টোল রেজিস্টার, টিকিটের হিসাব, ব্যাংক জমার চালান এবং ট্রাফিকের পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখতে হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়বে। সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ সালের ৫ ধারার অধীনে মামলা হতে পারে, যেখানে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুযায়ী কমিশন চাইলে কারও অভিযোগের অপেক্ষা না করেই স্বতঃপ্রণোদিত অনুসন্ধান চালাতে পারে। এছাড়া অভিযোগকারীরা প্রমাণসহ সরাসরি দুদক বা সওজ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিলের আইনি পথও খোলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৯৫ কোটি টাকা আদায়ের হিসাবটি যেভাবে তৈরি হয়েছে এবং ৪২ কোটি টাকা জমার তথ্য কোন সময়সীমা ও কোন সরকারি খাতা থেকে নেওয়া হয়েছে, তা যাচাই ছাড়া পুরো পার্থক্যকে আত্মসাত হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। টোল আদায়ের অর্থ পরিবহন, কর্মীদের পারিশ্রমিক বা অন্য কোনো অনুমোদিত খাতে ব্য হয়ে থাকলে তার নথিও পরীক্ষা করতে হবে। তবে যে গতিতে বিষয়টি সামনে আসছে, তাতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে জনগণের করের টাকার জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কারা দায়ী এবং কীভাবে এই অনিয়ম ঘটানো হয়েছে, তার উত্তর দিতে হবে প্রামাণ্য নথি ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে।

এখন সবার নজর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং দুদকের দিকে। সেতু দুটির টোল আদায়ের প্রতিদিনের হিসাব, ব্যাংকে জমার চালান এবং ইজারা সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশ করে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষের যাতায়াতের এই প্রাণসংযোগে রাজস্বের প্রতিটি টাকার হিসাব জনগণের জানার অধিকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসবে কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ।