জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) ‘গ্রামীণ স্যানিটেশন প্রকল্প’-এর আওতায় তিনটি বড় প্যাকেজের দরপত্র মূল্যায়নে নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পের মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী বশির আহমেদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, তিনি ‘এসএলটি’ (Significantly Low-priced Tender) বা ‘অস্বাভাবিক কম দর’ সংক্রান্ত নিয়মটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে রীতিমতো ‘স্বার্থ বাণিজ্য’ চালিয়েছেন। গাণিতিক কৌশলের আশ্রয় নিয়ে অভিজ্ঞ ও যোগ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে বাদ দিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করেছেন।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে যে তিন প্যাকেজ
সাভার, ধামরাই ও কেরানীগঞ্জ উপজেলার জন্য আহ্বান করা তিনটি প্যাকেজের (প্যাকেজ আইডি: ১২৩০৫৮৫, ১২৩০৫৮৭ ও ১২৩০৫৮৮) দরপত্র মূল্যায়নে এই কারসাজি হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, আফরা কর্পোরেশন লিমিটেড তিনটি প্যাকেজেই ‘লোয়েস্ট’ (সর্বনিম্ন দরদাতা) হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিল এবং কারিগরিভাবে উত্তীর্ণ ছিল। অথচ, নির্বাহী প্রকৌশলী বশির আহমেদ অত্যন্ত চতুরতার সাথে ‘এসএলটি’ ফর্মুলা প্রয়োগ করে দুই জায়গায় প্রতিষ্ঠানটিকে বাদ দিয়ে সিন্ডিকেটের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়েছেন।
সমঝোতার মহোৎসব ও স্বার্থ বাণিজ্য
অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাস্তব চিত্রটি ভয়াবহ। সাভার প্যাকেজে (১২৩০৫৮৫) আফরা কর্পোরেশনকে ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৯ হাজার ১৯৫ টাকা মূল্যে কাজ দেওয়া হয়েছে। অথচ একই প্রতিষ্ঠান যখন ধামরাই ও কেরানীগঞ্জ প্যাকেজেও সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল, তখন তাদেরকে কারিগরি ও গাণিতিক মারপ্যাঁচে ‘অস্বাভাবিক কম দর’ দেখিয়ে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, ধামরাই প্যাকেজে (১২৩০৫৮৭) ৫ কোটি ৬৭ লাখ ২৪ হাজার ৩৮২ টাকায় কাজ পেয়েছে মেসার্স লুৎফর রহমান এবং কেরানীগঞ্জ প্যাকেজে (১২৩০৫৮৮) ৭ কোটি ১৭ লাখ ১১ হাজার ১৫৩ টাকায় কাজ পেয়েছে মেসার্স জিলানী ট্রেডার্স। প্রশ্ন উঠেছে—আফরা কর্পোরেশন যদি সবচেয়ে বড় প্যাকেজটি (৮ কোটি টাকার বেশি) সফলভাবে সম্পন্ন করার যোগ্য বিবেচিত হয়, তবে তার চেয়ে কম মূল্যের অন্য প্যাকেজগুলো কেন তাদের দেওয়া হলো না? প্রকৌশলী বশির আহমেদের এই দ্বিমুখী আচরণ প্রমাণ করে, এটি কোনো ভুল নয়, বরং সুপরিকল্পিত ‘স্বার্থ বাণিজ্য’। সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘আন্ডার টেবিল’ সমঝোতার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সাথে কমিশন বাণিজ্য করে এই কাজগুলো বণ্টন করা হয়ে থাকে।
সিস্টেমের অপব্যবহার ও সরকারি অর্থের অপচয়
ই-জিপি সিস্টেমের স্বচ্ছতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বশির আহমেদ নিজেই এই মূল্যায়নের ‘নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে কাজ করেছেন। গাণিতিক ফর্মুলার ইচ্ছাকৃত অপব্যাখ্যা এবং অস্পষ্ট নথিপত্রকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে তিনি দক্ষ কোম্পানিগুলোকে সরিয়ে নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। এই অনিয়মের ফলে সরাসরি সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে এবং প্রকল্পগুলোর গুণগত মান ও স্থায়িত্ব বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। ঠিকাদারদের অভিযোগ, সিস্টেমের ভেতরে বসে এই ধরনের কারসাজি করার ফলে সাধারণ উদ্যোক্তারা সরকারি কাজে অংশগ্রহণের আগ্রহ হারাচ্ছেন।
প্রয়োজন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত
এই দুর্নীতির ঘটনায় সংক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা অবিলম্বে উক্ত তিনটি প্যাকেজের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এটি কেবল একটি প্রকল্পের অনিয়ম নয়, বরং সরকারি প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থার ওপর একটি বড় আঘাত। ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদাররা তথ্য অধিকার আইনের (আরটিআই) আওতায় ইভালুয়েশন রিপোর্টের কপি চেয়ে আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সরকারি ক্রয় বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও কেন এসএলটি-কে এভাবে জালিয়াতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে এবং নির্বাহী প্রকৌশলী বশির আহমেদের এই ‘স্বার্থ বাণিজ্যের’ উৎস খুঁজে বের করতে প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকসহ উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যে প্রকৌশলী নিজ দপ্তরে এমন অনিয়মকে প্রশ্রয় দেন, তার দায়ভার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কতদিন বহন করবে? নাকি এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে আরও বড় কোনো রাঘববোয়াল রয়েছেন?






