দেশের আবাসন খাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক সংস্থা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) এখন গভীর সংকটে। প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার পাশাপাশি আর্থিক মেরুদণ্ড ধসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। গত ৯ মাস ধরে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলামের মধ্যকার এক ‘অঘোষিত সমঝোতা’র মাধ্যমে সংস্থাটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নজিরবিহীন সব অনিয়মের খতিয়ান:
১. লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশে নেমেছে রাজস্ব আয়:
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মোসা. ফেরদৌসী বেগমের ৯ মাসের দায়িত্বকালীন সময়ে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আবাসন খাতের উন্নয়নের জন্য কোনো নতুন প্রকল্প গ্রহণ না করা এবং সেবাগ্রহীতাদের ফাইল দিনের পর দিন আটকে রাখাকেই এই ধসের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ গ্রাহকদের প্রতিটি ফাইলে ‘তদন্তের’ নামে জটিলতা সৃষ্টি করে তাদের সরাসরি চেয়ারম্যানের দফতরে হাজিরা দিতে বাধ্য করা হতো, যা মূলত একটি বিশেষ চক্রের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি করত।
২. ‘অযোগ্যদের’ দিয়ে নিয়োগ ও পদায়ন বাণিজ্য:
সংস্থাটির জনবল নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে ‘আর্থিক লেনদেন’ প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ আলমগীর হোসাইনের যোগসাজশে নিয়োগ কমিটির মাধ্যমে অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি নিয়োগপ্রাপ্ত চালকদের অনেকেরই সাধারণ চালক হিসেবে নূন্যতম দক্ষতা নেই এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরদের অনেকেরই টাইপিং বা সাধারণ আইটি জ্ঞান নেই।
এর পাশাপাশি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ ও জালিয়াতির মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মাদকাসক্ত ও বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সরাফত হোসেনকে সব নিয়ম লঙ্ঘন করে ‘ডাবল প্রমোশন’ দিয়ে মিরপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পদায়ন করা হয়েছে, যা সৎ ও সিনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
৩. ধানমন্ডি ও মিরপুরে শত কোটি টাকার সম্পদ লুট:
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, সচিব নজরুল ইসলাম ও সাবেক চেয়ারম্যানের সরাসরি যোগসাজশে ধানমন্ডির অত্যন্ত মূল্যবান একটি সরকারি প্লটকে ‘পরিত্যক্ত’ দেখিয়ে জাল নথির মাধ্যমে ব্যক্তিবিশেষের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই একটি জালিয়াতিতেই সরকারের শত কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া মিরপুর ১ নম্বর এলাকার ‘স্বাধীন বাংলা মার্কেটের’ বিশাল জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করতে গত নভেম্বরে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হলেও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। অভিযোগ আছে, দখলদারদের কাছ থেকে মোটা অংকের ‘মাসোহারা’ নিশ্চিত হওয়ার পর সচিব ও চেয়ারম্যানের নির্দেশে উচ্ছেদ ফাইলটি ধামাচাপা দেওয়া হয়।
৪. ম্যানুয়াল জালিয়াতির রাজত্ব ও ডিজিটাল সিস্টেম অচল:
এক সময় জাগৃক-এর প্রধান কার্যালয় থেকে প্লট বা ফ্ল্যাটের নথি যাচাইয়ের ডিজিটাল সুযোগ ছিল। কিন্তু বর্তমানে সুকৌশলে ডিজিটাল যাচাই প্রক্রিয়া বন্ধ বা অচল করে রাখা হয়েছে। এর ফলে এক শ্রেণির অসাধু সাব-রেজিস্ট্রারের সাথে যোগসাজশ করে মোটা অংকের বিনিময়ে একজনের সম্পদ অন্যজনের নামে নামজারি ও রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছে একটি চক্র। ডিজিটাল সিস্টেম অচল থাকায় এই জালিয়াতি ধরাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
৫. নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগে সচিবের ‘নজিরবিহীন বাধা’:
গত ২৬ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও সচিব নজরুল ইসলাম তা কার্যকর হতে দিচ্ছেন না বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান চেয়ারম্যানকে আগামী জুন ২০২৬ (অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত) পদে বহাল রাখতে সচিব মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে নজিরবিহীন লবিং করছেন।
একজন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রতি সচিবের এই বিশেষ ‘মমত্ববোধের’ নেপথ্যে গভীর কোনো আর্থিক লেনদেন বা বড় ধরণের অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার পরিকল্পনা কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমান চিত্র:
বর্তমানে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। একদিকে সাধারণ গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারি সম্পত্তি লুটের মহোৎসব চলছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবিলম্বে এই ‘সিন্ডিকেট’ ভেঙে দিয়ে স্বচ্ছ ও নিয়মিত চেয়ারম্যান নিয়োগ না দিলে সংস্থাটি চিরস্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে পড়বে। এই দুর্নীতির মহোৎসবের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও উচ্চতর বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ এবং নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির বিষয়ে বক্তব্য জানতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগমের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কারো সাড়া পাওয়া যায়নি।







