আমাদের দেশে রাজনীতি মানেই চেয়ার। মন্ত্রী, এমপি, চেয়ারম্যান না হলে যেন দেশের জন্য কিছু করা যায় না – এই ধারণাই প্রতিষ্ঠিত। এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন একজন মানুষ, তার নাম সিরাজুল আলম খান।
তিনি কখনো মন্ত্রী হননি, এমপি হননি, কোনো দলের সভাপতিও হননি। অথচ বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির জন্মের পেছনে তার মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল।
১. নিউক্লিয়াস: রাষ্ট্রের ভ্রূণ তৈরি
১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সিরাজুল আলম খান বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে বাঙালির মুক্তি সম্ভব নয়। স্বাধীনতার কথা তখন প্রকাশ্যে বলা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতা। তিনি প্রকাশ্যে না বলে, গোপনে গড়ে তুললেন “নিউক্লিয়াস”।
এর কাজ কি ছিল? মেধাবী ছাত্রদের বাছাই করে বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি পড়ানো। অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নয়, আগে মস্তিষ্কের প্রশিক্ষণ। এই নিউক্লিয়াস থেকেই পরে ছাত্রলীগের ভেতরে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ, সেখান থেকেই জয় বাংলা বাহিনী, মুজিব বাহিনী। আজ আমরা যে পতাকা উড়াই, যে মানচিত্রে বাস করি, তার প্রথম নকশা আঁকা হয়েছিল তার ছোট্ট মেসের ঘরে। তিনি চেয়ারে বসেননি, কিন্তু চেয়ারে বসার মতো মানুষ তৈরি করেছেন।
২. তিনি তাত্ত্বিক, তিনি সংগঠক নন শুধু
সিরাজুল আলম খান ছিলেন মূলত একজন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। ক্ষমতার রাজনীতি নয়, তিনি বিশ্বাস করতেন নীতির রাজনীতিতে।
তার প্রধান তত্ত্ব ছিল তিনটি:
ক) বাঙালি জাতীয়তাবাদ: ধর্ম নয়, ভাষা ও সংস্কৃতিই বাঙালির পরিচয়।
খ) বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র: স্বাধীনতা মানে শুধু পতাকা নয়, ক্ষুধা ও বৈষম্য থেকে মুক্তি।
গ) জাসদের জন্ম: ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর তিনি দেখলেন, স্বাধীনতা এসেছে কিন্তু শোষণমুক্ত সমাজ আসেনি। তখন তিনি গড়ে তুললেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল – জাসদ। ক্ষমতার ভাগ নিতে নয়, রাষ্ট্রকে তার আদর্শের পথে রাখতে।
৩. ক্ষমতাকে না বলার সাহস
এটাই তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। ১৯৭১ সালের পর বঙ্গবন্ধু তাকে বড় পদ দিতে চেয়েছিলেন। তিনি নেননি। তিনি বলতেন, “আমি ক্ষমতার অংশ হলে সমালোচনা করার নৈতিক অধিকার হারাবো।”
আমাদের আজকের বুদ্ধিজীবীরা, রাজনীতিবিদরা চেয়ারের জন্য দল বদলান, আদর্শ বদলান। আর তিনি চেয়ারকে প্রত্যাখ্যান করে আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের একজন “Conscience” দরকার, বিবেক দরকার। বিবেক কখনো মন্ত্রিসভায় বসে না, বিবেক থাকে বাইরে, রাস্তায়, মানুষের মাঝে।
৪. আজকের তরুণদের জন্য তার প্রাসঙ্গিকতা
আজকের ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার থেকে শুরু করে জাতীয় নেতা পর্যন্ত সবার ভাবা উচিত – আমি চেয়ার পেলাম, কিন্তু আমি ইতিহাসে থাকবো কিভাবে?
সিরাজুল আলম খান শিখিয়ে গেছেন:
১. পদ ছাড়াও নেতা হওয়া যায়, যদি আপনার কাছে একটি পরিষ্কার আদর্শ থাকে।
২. সংগঠন গড়াই আসল ক্ষমতা, চেয়ার নয়। একটি আদর্শিক কর্মী বাহিনী ১০০ জন এমপির চেয়ে শক্তিশালী।
৩. জ্ঞানই মুক্তির প্রথম অস্ত্র। অস্ত্র হাতে নেওয়ার আগে ইতিহাস জানতে হয়।
তিনি ২০২৩ সালের ৯ জুন পৃথিবী ছেড়েছেন, প্রায় নিঃস্ব অবস্থায়। কোনো বাড়ি-গাড়ি রেখে যাননি। রেখে গেছেন একটি প্রশ্ন – “তুমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করো, নাকি মানুষের জন্য?”
চেয়ারে না বসেও যে ইতিহাসের চালকের আসনে বসা যায়, সিরাজুল আলম খান তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আমাদের সমাজে আজ এমন দাদার বড় অভাব, যিনি চেয়ারের লোভ দেখাবেন না, পথ দেখাবেন।







