সালাম মাহমুদ : উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব গবেষণা ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল। প্রায় ২৫ বছরের গবেষণা ও শিক্ষকতা জীবনে তিনি উদ্ভিদের রোগ ব্যবস্থাপনা, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, রোগজীবাণু ও উদ্ভিদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করে আসছেন।
তাঁর নেতৃত্বে দেশীয় মাটি থেকে সংগৃহীত ট্রাইকোডারমা অ্যাসপ্যারেল্লাম অণুজীব ব্যবহার করে ‘পিজি ট্রাইকোডারমা (প্ল্যান্ট গার্ড ট্রাইকোডারমা)’ নামে একটি উদ্ভাবনী জৈব-প্রযুক্তি পণ্য উন্নয়ন করা হয়েছে। এই প্রযুক্তিটি একই সঙ্গে জৈব-ছত্রাকনাশক ও জৈব-সার হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে কৃষিতে রাসায়নিক উপকরণের ব্যবহার কমিয়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন হলো পিজি ট্রাইকোডারমা। দেশীয় মাটি থেকে বাছাই করা ট্রাইকোডারমা অ্যাসপ্যারেল্লাম অণুজীবকে কাজে লাগিয়ে তৈরি এই প্রযুক্তির কার্যকর স্ট্রেইন হিসেবে এমবিসিটি উল্লেখ করা হয়েছে, যার এনসিবিআই জেনব্যাঙ্ক অ্যাকসেশন নম্বর-ওআর ১০১২৫৬২৩। পণ্যটির ফর্মুলেশন ১.৫ শতাংশ ভেটেবল পাউডার এবং এটি জৈব-ছত্রাকনাশক ও জৈব-সার হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি।
বিভিন্ন ফসলে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। গবেষণায় টমেটোতে ৪০–৭০ শতাংশ, আলুতে ৩০-৪০ শতাংশ, ধানে ৩০-৫০ শতাংশ এবং গমে ৩০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধির সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে পিজি ট্রাইকোডারমা ব্যবহারের মাধ্যমে রাসায়নিক সারের ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে বলে জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমকক্ষ-পর্যালোচিত (পিয়ার-রিভিউড) জার্নালে ৫৫টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। ২০২৪ সালে ‘প্ল্যান্ট ফিজিওলজি’ জার্নালেও তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার পাশাপাশি তিনি ২০১১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বর্ণপদক অর্জন করেন এবং ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জাপান সরকারের মনবুকাগাকুশো মেক্সট ফেলোশিপ লাভ করেন।
তাঁর শিক্ষাজীবনও উল্লেখযোগ্য। তিনি জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি এবং ২০১০ সালে কৃষি বিজ্ঞান (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব) বিষয়ে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে উদ্ভিদ রোগতত্ত্বে এমএস এবং ২০০১ সালে বিএসসি কৃষি (সম্মান) সম্পন্ন করেন। বিএসসি পর্যায়ে ৪৬৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন।
২০০২ সালে প্রভাষক (লেকচারার) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে তিনি পর্যায়ক্রমে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি শহীদ জামাল হোসেন হলের প্রভোস্ট, বীজ রোগতত্ত্ব কেন্দ্র -এর সাবেক পরিচালক এবং উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান হিসেবেও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি শিক্ষার্থী সমিতির সভাপতি হিসেবেও ২০১১-২০১২ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে উদ্ভিদ রোগ শনাক্তকরণ ও রোগ ব্যবস্থাপনা, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, অণুজীবীয় জৈব-নিয়ন্ত্রণ উপাদান, ট্রাইকোডারমা এবং ব্যাকটেরিয়াল জৈব-উপাদান, অণুজীবীয় বালাইনাশক ফর্মুলেশন, উদ্ভিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, পোষক-রোগজীবাণু পারস্পরিক সম্পর্ক, বীজ রোগতত্ত্ব ও বীজবাহিত ছত্রাক। পাশাপাশি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়নেও তিনি কাজ করছেন।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়নে বিশেষ অবদানের পাশাপাশি স্বর্ণপদক এবং জাপানিজ গভর্নমেন্ট মনবুকাগাকুশো মেক্সট ফেলোশিপসহ বিভিন্ন স্বীকৃতি তাঁর গবেষণা ও একাডেমিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত।
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগে অধ্যাপনা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। দেশীয় অণুজীবভিত্তিক প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং রাসায়নিক উপকরণের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর গবেষণা কার্যক্রম কৃষিখাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।






