কৃষিবিদ এম. মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম, পিএইচডি
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষকের আয় বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো মানসম্মত বীজ। উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করলেও অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, ভৌত বিশুদ্ধতা, জাতগত বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন গুণগত মান নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া কঠিন। ফলে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বীজ পরীক্ষা দেশের বীজশিল্পের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতায় লাল তীর সিড লিমিটেডের এমএনটি সিড টেস্টিং ল্যাবরেটরি বাংলাদেশের বীজের গুণগতমান নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ল্যাবরেটরি ২০২২ সালে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের (BAB) অধীনে ISO/IEC 17025:2017 স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে এটি International Seed Testing Association (ISTA)-এর স্বীকৃতি অর্জন করে। লাল তীরের তথ্য অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের প্রথম ISTA-স্বীকৃত বীজ পরীক্ষাগার।
আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষায় সক্ষমতা
ISTA স্বীকৃতি শুধু একটি সনদ নয়; নির্দিষ্ট বীজ পরীক্ষার ক্ষেত্রে একটি পরীক্ষাগারের কারিগরি সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ISTA-এর তথ্য অনুযায়ী, এমএনটি সিড টেস্টিং ল্যাবরেটরির স্বীকৃত পরীক্ষার পরিধির মধ্যে বিভিন্ন কৃষিফসল, শস্য, ডাল, সবজি, মসলা, ভেষজ ও ঔষধি প্রজাতির বীজের লট থেকে ম্যানুয়াল নমুনা সংগ্রহ, ভৌত বিশুদ্ধতা নির্ণয় এবং অঙ্কুরোদগম পরীক্ষাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে।
ISTA-এর নিয়ম অনুযায়ী, স্বীকৃত পরীক্ষাগারকে আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত International Rules for Seed Testing অনুসরণ করে পরীক্ষা পরিচালনার পাশাপাশি কার্যকর মাননিশ্চয়তা ব্যবস্থা বজায় রাখতে হয়। এতে পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা ও পরীক্ষাগারের কারিগরি সক্ষমতার ওপর আস্থা বাড়ে।
BAB স্বীকৃতিতে শক্তিশালী মান ব্যবস্থাপনা
অন্যদিকে ISO/IEC 17025 স্বীকৃতি একটি পরীক্ষাগারের কারিগরি সক্ষমতা ও মান ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এমএনটির BAB স্বীকৃতির মাধ্যমে পরীক্ষার পদ্ধতি, দক্ষ জনবল, নমুনা ব্যবস্থাপনা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্যালিব্রেশন, নথিপত্র এবং পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়েছে।
ফলে BAB ও ISTA—দুই ধরনের স্বীকৃতি এমএনটির সক্ষমতাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে এগিয়ে দিয়েছে। একদিকে রয়েছে জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন কাঠামোর আওতায় পরীক্ষাগারের মান ও কারিগরি সক্ষমতা; অন্যদিকে নির্দিষ্ট বীজ পরীক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি ও দক্ষতা।
কৃষকের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বীজের গুণগতমান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে কৃষক নিম্নমানের বীজ কিনে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। বিপরীতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে বীজের মান যাচাই করা গেলে বাজারজাতকরণের আগেই সমস্যাযুক্ত লট শনাক্ত করা সম্ভব।
অঙ্কুরোদগম পরীক্ষা বীজ থেকে মাঠে চারা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। ভৌত বিশুদ্ধতা পরীক্ষায় অন্য ফসলের বীজ, আগাছার বীজ ও অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়। একই সঙ্গে সঠিক নমুনা সংগ্রহ নিশ্চিত করে যে পরীক্ষার জন্য নেওয়া নমুনাটি সংশ্লিষ্ট বীজ লটের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করছে।
অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য নমুনা সংগ্রহ → বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা → মান যাচাই → ভালো বীজ → ভালো ফসল—এই ধারাকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বীজশিল্পে বাড়বে আস্থা
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষার সুবিধা দেশের বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলোর মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে বীজ ক্রেতা, পরিবেশক ও কৃষকের কাছে পরীক্ষিত বীজের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ISTA-স্বীকৃত পরীক্ষাগারের গুরুত্ব রয়েছে। কিছু বাজারে বীজ আমদানির ক্ষেত্রে ISTA Certificate প্রয়োজন হতে পারে। ফলে এমএনটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের বীজশিল্পের সম্ভাব্য রপ্তানি সম্প্রসারণেও সহায়ক হতে পারে।
ভবিষ্যতে হতে পারে ‘Quality Seed Hub’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমএনটি সিড টেস্টিং ল্যাবরেটরির বিদ্যমান অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে এটিকে একটি সমন্বিত ‘Quality Seed Hub’ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
এর আওতায় প্রচলিত বীজ পরীক্ষার পাশাপাশি Seed Health Laboratory, Molecular Laboratory, Seed Vigor Testing, Genetic Purity Testing, Digital Seed Traceability, Research and Innovation এবং Training & Capacity Building যুক্ত করা যেতে পারে।
বীজবাহিত রোগ শনাক্তকরণে PCR, qPCR ও LAMP-এর মতো প্রযুক্তি, জাত ও জেনেটিক বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে DNA-based testing এবং বীজের অঙ্কুরোদগম ও চারা বিশ্লেষণে আধুনিক ইমেজ অ্যানালাইসিস প্রযুক্তি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চালু হতে পারে ডিজিটাল ‘Seed Passport’
বীজ উৎপাদন থেকে কৃষকের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত তথ্য সংরক্ষণে ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালু করা গেলে মাননিয়ন্ত্রণ আরও স্বচ্ছ হবে। প্রতিটি বীজ লটের জন্য QR কোডভিত্তিক ‘Digital Seed Passport’ চালু করা যেতে পারে।
এতে বীজের উৎপাদন এলাকা, লট নম্বর, পরীক্ষার ফলাফল, অঙ্কুরোদগমের হার, ভৌত বিশুদ্ধতা, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ব্যবস্থা কৃষক ও ভোক্তার আস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি নকল বা নিম্নমানের বীজ শনাক্ত করতেও সহায়ক হতে পারে।
রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ
বাংলাদেশের বীজের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে মাননির্ভর পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষার সক্ষমতা দেশের বীজ কোম্পানিগুলোকে রপ্তানি বাজারের কারিগরি শর্ত পূরণে সহায়তা করতে পারে।
২০২৩ সালে ISTA স্বীকৃতি পাওয়ার সময় লাল তীরের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, এ স্বীকৃতি মানসম্মত বীজ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বীজ রপ্তানি বাড়াতে সহায়ক হবে।
তাই বাংলাদেশের বীজ খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে পরীক্ষাগারকে শুধু মান যাচাইয়ের কেন্দ্র হিসেবে না দেখে গবেষণা, উদ্ভাবন, বীজস্বাস্থ্য, জেনেটিক বিশুদ্ধতা ও রপ্তানি সহায়তার সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
প্রয়োজন দক্ষ জনবল ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ
আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার পরিচালনার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির পাশাপাশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ অপরিহার্য। বীজ বিশ্লেষক, নমুনা সংগ্রহকারী, গবেষক ও ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ানদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, proficiency testing এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষতা উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে।
জাতীয় পর্যায়ে মডেল হতে পারে
বাংলাদেশের বীজ খাতে মাননিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে সরকারি ও বেসরকারি পরীক্ষাগারগুলোর মধ্যে সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি পর্যায়ের প্রশিক্ষণ ও তথ্যসূত্রেও দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ISTA-সংশ্লিষ্ট বীজ পরীক্ষাগারের কার্যক্রমের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে এমএনটি সিড টেস্টিং ল্যাবরেটরির অভিজ্ঞতা দেশের অন্যান্য বীজ পরীক্ষাগারের মানোন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য মডেল হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
পাঁচ ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে ‘National Quality Seed Hub’
ভবিষ্যতে এমএনটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘National Quality Seed Hub’ হিসেবে গড়ে তুলতে পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে—
১. অ্যাক্রেডিটেশন
২. আধুনিক প্রযুক্তি
৩. ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি
৪. দক্ষ মানবসম্পদ
৫. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহায়তা
এর সঙ্গে Seed Testing, Seed Health, Molecular Diagnostics, Seed Vigor, Research & Innovation এবং Training যুক্ত হলে একটি সমন্বিত বীজমান নিশ্চয়তা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা সম্ভব।
কৃষির ভবিষ্যৎ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
বাংলাদেশের কৃষিতে মানসম্মত বীজের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এ বাস্তবতায় এমএনটি সিড টেস্টিং ল্যাবরেটরির BAB-এর ISO/IEC 17025:2017 স্বীকৃতি এবং ISTA accreditation দেশের বীজ পরীক্ষাব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এখন প্রয়োজন এ অর্জনকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানো। বীজস্বাস্থ্য, জেনেটিক বিশুদ্ধতা, আধুনিক আণবিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, গবেষণা ও রপ্তানি সহায়তাকে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা গেলে এমএনটি ভবিষ্যতে শুধু একটি বীজ পরীক্ষাগার নয়, বরং বাংলাদেশের একটি ‘Quality Seed Hub’ হিসেবে বিকশিত হতে পারে।
এর মাধ্যমে কৃষকের কাছে মানসম্মত বীজ পৌঁছানো, বীজশিল্পে আস্থা বাড়ানো, কৃষি উৎপাদনশীলতা উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বীজের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।







