অরবিন্দ সরকার রচিত “পূজা আসে যায়” কবিতা : দারিদ্র্যের কশাঘাত ও সামাজিক বৈষম্যের এক চরম দলিল
আলোচনায় : শংকর হালদার শৈলবালা
আলোচনা কাল : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বাঙালির সর্বজনীন উৎসব দুর্গাপূজা যখন আলোর রোশনাই, আনন্দ আর কেনাকাটার জোয়ারে ভেসে যায়, ঠিক তখনই সমাজের এক প্রান্তিক, সর্বহারা শ্রেণির ক্ষোভ, যন্ত্রণা এবং বঞ্চনার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে কবি অরবিন্দ সরকারের “পূজা আসে যায়” কবিতায়। বহরমপুরের কবি অরবিন্দ সরকার অত্যন্ত নিখুঁত ও তীক্ষ্ণ ভাষায় সমাজের ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এবং দারিদ্র্যের ভয়াবহ রূপকে কবিতার মূল উপজীব্য করেছেন।
কবিতাটি শুরু হয়েছে দুই মেহনতী মানুষের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে—যেখানে পুজোর আনন্দের বদলে ভেসে ওঠে নাড়ু, মুড়কি, নারকেল আর গুড়ের অনটন। সারাবছর খেটেও যে শ্রেণির কপালে কোনো বোনাস জোটে না, জোটে কেবল দীর্ঘশ্বাস আর হা-হুতাশ, তাদের জন্য উৎসব কোনো আনন্দ নিয়ে আসে না, বরং নিয়ে আসে লজ্জার নতুন বোঝা।
কবির ভাষায় সমাজব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা এবং বেঁচে থাকার নিরুপায় হাহাকার অত্যন্ত রূঢ়ভাবে ধরা পড়েছে:
“দুগ্গা আসে যায়, মোড়লদের মণ্ডপে, ধনী বাবুদের বাড়ীতে ঠাঁই! / পঙ্গপাল নিয়ে এসে ফলমূল, মণ্ডা মিঠাই, আবার পাঁঠার মাংস খায়!”
মৃন্ময়ী দেবীর অন্ধত্ব, পুরোহিতের পেট ভরানোর প্রতিযোগিতা এবং দশমীর বিদায়ে দেবীর বিসর্জনের সাথে সাথে দরিদ্র মানুষের অপমানের চিরাচরিত বাস্তবতাকে কবি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন। সহজ-সরল আঞ্চলিক ও লোকায়ত শব্দের ব্যবহারে কবিতাটি এক বাস্তবমুখী প্রতিবাদী দলিলে পরিণত হয়েছে।
■ কবিতার মান নির্ণয় (বাঙালি লেখক সংসদ কর্তৃক আন্তর্জাতিক কবিতা সমীক্ষা-২০২৬ অনুসারে):
প্রাপ্ত নম্বর: ৭৮/১০০
■ মান নির্ণয়ের কারণ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:
১. সমাজচেতনা ও প্রতিবাদের সুর: উৎসবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সামাজিক বৈষম্য ও শোষিত মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বলিষ্ঠ প্রতিফলন।
২. কথ্য ও বাস্তবসম্মত ভাষা: ‘খেঁদির মা’, ‘ডাবকি মারা প্যান্ট’, ‘পাটালি’-র মতো লোকায়ত শব্দের ব্যবহারে বাস্তবতার এক জীবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি।
৩. আবেগের তীব্রতা: দারিদ্র্যের কারণে মরণকেও আক্ষেপ করার মতো নির্মম সত্যকে অত্যন্ত স্পর্শকাতরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
৪. বিষয়বস্তুর গভীরতা: উৎসব কেবল ধনীদের জন্য—এই বাস্তবতাকে চাবুকের মতো পাঠকের বিবেকের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার সার্থক প্রয়াস।
এমন সত্যসন্ধানী ও তীব্র অনুভূতির রচনার জন্য কবি অরবিন্দ সরকারকে জানাই আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও সাহিত্যিক শুভকামনা। তাঁর কলম আগামীতে শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে আরও উজ্জ্বল হোক।





