রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ৮০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা আমদানির মেগা দরপত্রকে ঘিরে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল)–এর চিফ প্রকিউরমেন্ট অফিসার (সিপিও) এস এম জাহিদ হাসান নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দিতে দরপত্রের শর্তাবলী ব্যবহারে দ্বিমুখী নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি খাতের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
দরপত্র মূল্যায়নে দ্বিমুখী নীতি ও অস্পষ্টতা
শিল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দরপত্র মূল্যায়নের পুরো প্রক্রিয়াটিতে সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা হয়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, অংশগ্রহণকারী সব প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ও আর্থিক মানদণ্ড একইভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। নিরপেক্ষ মূল্যায়নের বদলে একটি বিশেষ মহলকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলায় বাকি দরদাতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
বিতর্কিত ও অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা: অভিযোগ উঠেছে, দরপত্র মূল্যায়নে লিয়্যানেক্স, মোহিত মিনারেলস এবং লোশে শিপিংয়ের মতো কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ কয়লা সরবরাহের পূর্ব অভিজ্ঞতা, প্রয়োজনীয় কারিগরি ও লজিস্টিক সক্ষমতা এবং দরপত্রের কঠিন শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। অপরদিকে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘লিয়্যানেক্স’ প্রয়োজনীয় সব কারিগরি নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রস্তাবে জোরপূর্বক ত্রুটি খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
‘মাইন এমওইউ’ এবং খনির সক্ষমতা সরাসরি যাচাইয়ের দাবি: কয়লার উৎস সংক্রান্ত ‘মাইন এমওইউ’ (সমঝোতা স্মারক) যাচাই প্রক্রিয়ার দুর্বলতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। দরদাতাদের জমা দেওয়া সমঝোতা স্মারকগুলো শুধুই একটি কাগজ হিসেবে গ্রহণ না করে, সরাসরি কয়লা খনির মালিক বা তাঁদের অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করার জোর দাবি উঠেছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার যেসব খনি থেকে কয়লা আনার কথা বলা হচ্ছে, সেসব খনির প্রকৃত মালিকানা, প্রতিদিনের উৎপাদন সক্ষমতা, কয়লার মান এবং তা নিয়মিত সরবরাহ করার সামর্থ্য খনি কর্তৃপক্ষের অফিশিয়াল ই-মেইল ও যোগাযোগের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি।
সরবরাহ ব্যর্থতায় জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে মারাত্মক ঝুঁকির আশঙ্কা: ভুল বা অক্ষম কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে চুক্তি দেওয়া হলে তার মাশুল গুণতে হবে পুরো দেশকে। তারা সময়মতো সঠিক মানের কয়লা যোগান দিতে ব্যর্থ হলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি ব্যাহত হতে পারে। এটি কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানবে না, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
প্রতিযোগিতা ধ্বংস এবং ক্ষমতার অপব্যবহার: এস এম জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী দরদাতারা। তাঁদের অভিযোগ, কোনো এক অদৃশ্য পক্ষকে সুবিধা দিতে অন্য যোগ্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে চক্রান্ত করে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক দরপত্রের মৌলিক নীতি, স্বচ্ছতা ও মুক্ত প্রতিযোগিতার ধারণার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের যোগসাজশ: জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার অভিযোগও সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল। এই সম্পর্ককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি দরপত্রের সিদ্ধান্ত নিজের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ‘এস আলম গ্রুপ’-এর সাথেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের তথ্য উঠে এসেছে।
অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির ছায়া
শুধু দরপত্র জালিয়াতিই নয়, জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাঁর নিজ জেলা নওগাঁয় নদীর কোল ঘেঁষে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও এসব সম্পদ বিবরণী ও মালিকানার নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করার প্রক্রিয়া এখনও চলছে, তবুও অভিযোগের তীর তাঁর দিকেই নির্দেশ করছে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও নতুন দরপত্রের দাবি
৮০ লাখ মেট্রিক টন কয়লার এই বিশাল চুক্তি নিয়ে যে সন্দেহ দানা বেঁধেছে, তা দূর করতে দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটির প্রতিটি ধাপ সর্বসাধারণের সামনে স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।
প্রতিটি দরদাতার লজিস্টিক, আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা সমানভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশ করা উচিত। অভিযোগগুলোর সতত্যা প্রমাণিত হলে বর্তমান দরপত্র বাতিল করে নতুনভাবে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষা ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ: রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই দরপত্রটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, এর সাথে যুক্ত রয়েছে পুরো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠীর অপপ্রভাবের কাছে দেশের কৌশলগত স্বার্থ বলি দেওয়া যাবে না। তাই কোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যাচাইযোগ্য নথি, প্রমাণিত অভিজ্ঞতা ও শতভাগ স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া এখন সময়ের দাবি।





