, ,

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আমাদের প্রস্তুতি

নিউজটি শেয়ার করুন

লেখক: মোঃ মাহবুবুল আলম 
বাংলাদেশ প্রকৃতির এক অপার আশীর্বাদ। নদী, সবুজ, ষড়ঋতুর দেশ আমরা। কিন্তু এই আশীর্বাদের পাশেই আছে অভিশাপ। ভৌগোলিক অবস্থান, নদীমাতৃকতা আর বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছর নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা, ভূমিকম্প—এগুলো এখন আমাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
দুর্যোগের চিত্র
প্রতি বছর বর্ষায় বন্যা আসে। ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা, মেঘনার পানি ফুলে-ফেঁপে উঠলে দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা তলিয়ে যায়। ফসল ডোবে, ঘর ভাঙে, মানুষ পথে বসে।
উপকূলীয় অঞ্চলে আবার ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব। সিডর, আইলা, বুলবুল, আম্পান—প্রতিটি ঝড়ের পর রেখে যায় শোক আর ক্ষতির বিশাল চিহ্ন। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি আজও জাতিকে কাঁদায়।
এছাড়া উত্তরাঞ্চলে খরা, সারাদেশে নদীভাঙন আর ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেটে ভূমিকম্পের ঝুঁকি তো আছেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
 *ক্ষয়ক্ষতি ও প্রভাব*
দুর্যোগ শুধু ঘরবাড়ি ভাঙে না, ভেঙে দেয় স্বপ্ন। একটা বন্যায় একজন কৃষকের সারা বছরের ফসল শেষ। একটা ঝড়ে উপকূলের জেলের নৌকা ডুবে যায়। স্কুল বন্ধ হয়, হাসপাতালে রোগী বাড়ে, দারিদ্র্য আরও গভীর হয়। সরকারের কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো ক্ষতি হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী, শিশু ও প্রান্তিক মানুষ।
*আমরা কী করছি?*
একটা সময় ছিল যখন দুর্যোগ মানেই ছিল শুধু ত্রাণ আর লাশের সারি। এখন চিত্র অনেক বদলেছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে “দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় রোল মডেল”।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম বার্তা, উপকূলে ৫ হাজারের বেশি সাইক্লোন শেল্টার, সিপির ৭০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক, উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও সবুজ বেষ্টনী—এসবের কারণে প্রাণহানি অনেক কমেছে। “ডেল্টা প্ল্যান ২১০০” আর “মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান” দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির দৃষ্টান্ত।
 *আরও যা করা প্রয়োজন*
তবে শুধু সরকারের পক্ষে একা সব সম্ভব নয়। আমাদের ৩টি জায়গায় আরও জোর দিতে হবে।
*১. সচেতনতা*: স্কুল-কলেজে দুর্যোগ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রতিটি পরিবারে দুর্যোগকালীন ব্যাগ—শুকনো খাবার, পানি, ওষুধ, টর্চ—রাখার অভ্যাস গড়তে হবে।
*২. পরিবেশ রক্ষা*: নদী-খাল দখল বন্ধ করতে হবে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। ব্যাপক বৃক্ষরোপণ করতে হবে। কারণ সুন্দরবনই আমাদের সবচেয়ে বড় ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধক।
*৩. টেকসই উন্নয়ন*: নগর পরিকল্পনা হতে হবে দুর্যোগ সহনীয়। অপরিকল্পিত ভবন, ভূমি ভরাট বন্ধ করতে হবে। জলবায়ু তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
 *শেষ কথা*
প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমরা ঠেকাতে পারব না। কিন্তু প্রস্তুতি দিয়ে এর ক্ষতি কমানো যায়। দুর্যোগের সময় আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানবতা ও একতা। সরকার, এনজিও, স্থানীয় জনগণ—সবাই মিলে কাজ করলেই আমরা টিকে থাকব।
মনে রাখতে হবে, পৃথিবী আমাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নয়। আমরা ধার নিয়েছি পরের প্রজন্মের কাছ থেকে। তাই আজকের প্রস্তুতিই আগামীর বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখবে।
“দুর্যোগ নয়, প্রস্তুতিই হোক আমাদের অঙ্গীকার”।
লেখক: মোঃ মাহবুবুল আলম 
সহযোগী সম্পাদক জাতীয় দৈনিক স্বদেশ বিচিত্রা