, ,

গণভোটের রায় উপেক্ষা করে জনগণের মতামতকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে: ডা. শফিকুর রহমান

নিউজটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

পরিবর্তনের জন্য গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা পাশ কাটিয়ে সরকার নিজেদের ইচ্ছামতো দেশ পরিচালনা করছে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনগণের রায়কে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। একই নির্বাচনের একটি রায় গ্রহণ করা হবে, আরেকটি প্রত্যাখ্যান করা হবে—এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

শুক্রবার সকালে রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা জেলার ষান্মাসিক সদস্য (রোকন) সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ঢাকা জেলা আমির ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান (এমপি), নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন (এমপি) এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল (এমপি)। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা জেলা সেক্রেটারি মাওলানা আফজাল হোসাইন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০০৬ সালের লগি-বৈঠার ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শক্তির গণহত্যার রাজনীতি শুরু হয়। এরপর পিলখানা হত্যাকাণ্ড, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের হত্যাকাণ্ড এবং জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ—এসবই জাতির ইতিহাসে ধারাবাহিক গণহত্যার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তিনি শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাইয়ের সকল শহীদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ ঘোষণার আগে ছাত্রদের আন্দোলনে নৈতিক সমর্থন দিয়েছিল। দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর জনগণ ও নেতাকর্মীদের রাজপথে নামার আহ্বান জানানো হয়।

তিনি অভিযোগ করেন, ইন্টারনেট বন্ধ রেখে অভিযান পরিচালনা করায় জুলাইয়ে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আহত ও পঙ্গুদের যথাযথ খোঁজ নেওয়া হয়নি। শহীদ ও আহত পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের পরও তাদের প্রতি প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করা হয়নি।

তিনি বলেন, জনগণের রায়কে অপমানের প্রতিবাদে তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছেন। সংসদে সমস্যার সমাধান না হলে জনগণই গণতান্ত্রিক উপায়ে তার সমাধান করবে। সংশোধন কমিটিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান এলেও জনগণের রায়কে অস্বীকার করে সেখানে অংশ নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। দাবি আদায়ের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে।

জামায়াত সম্পর্কে তিনি বলেন, “জামায়াতে ইসলামী ফেরেশতাদের সংগঠন নয়, মানুষের সংগঠন।” তাই ভুল-ত্রুটি হতে পারে, তবে নৈতিকতার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। কেউ ভুল করলে তাকে অবশ্যই সংশোধনের আওতায় আসতে হবে। তিনি নেতাকর্মীদের নফস ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে সতর্ক থাকার এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করার আহ্বান জানান।

প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। অন্যদেরও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। বাংলাদেশ শান্তিতে থাকতে চায়, তবে সীমান্তে অশান্তি সৃষ্টি করা হলে তার প্রভাব উভয় দেশকেই বহন করতে হবে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাস করে—সব ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবেন। নেতা ও নীতির সংশোধনের মাধ্যমেই সমাজে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বক্তব্যের শেষে তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে সবার কাছে দোয়া চান এবং সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সত্য তথ্য দেশবাসীর কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, যারা রোকন হিসেবে শপথ নিয়েছেন, তাদেরকে সেই শপথ রক্ষায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কারণ আল্লাহ তাআলা কুরআনে প্রতিশ্রুতি পূরণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে দেশকে আবার ফ্যাসিবাদের দিকে নিয়ে যেতে চায়। তবে জনগণ তা কখনোই হতে দেবে না। তিনি বলেন, “জামায়াতকে যারা নির্মূল করতে চায়, তারাই নির্মূল হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।”

নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, বর্তমান শাসনব্যবস্থায় জনগণ সন্তুষ্ট নয়; তারা মৌলিক পরিবর্তন চায়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে জামায়াতে ইসলামীকে বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে এবং ব্যাপক জনসংযোগের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। তিনি বলেন, মুসলিমরা কুরআনের অনুসরণ করেই একসময় বিশ্বনেতৃত্ব দিয়েছে। তাই কুরআন-সুন্নাহর ওপর অটল থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বিচ্ছিন্ন ঘটনায় হতাশ না হয়ে আরও সতর্ক হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

নির্বাহী পরিষদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি ফরজ দায়িত্ব। ইসলামের সৌন্দর্য মানুষের সামনে তুলে ধরতে হলে নিজেদের চরিত্র, আচরণ ও কর্মকাণ্ডকে আরও সুন্দর করতে হবে। তিনি গণমুখী নেতৃত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, রোকনদের মাসিক পরিকল্পনার মাধ্যমে তৃণমূল মানুষের কাছে সংগঠনের দাওয়াত ও কার্যক্রম পৌঁছে দিতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা জেলা আমির মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন সদস্যদের আদর্শিক দৃঢ়তা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল পরিচালক মো. মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মসিউল আলম, সংসদ সদস্য অধ্যাপক ইলিয়াস আলী মোল্লা এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম।