রাসেল আহমদ: বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল শুধু ক্ষমতার রদবদল নয়; এটি আঞ্চলিক কূটনীতির সমীকরণও পুনর্লিখন করেছে। বিশেষত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় থেকে ২০২৫-এর শেষভাগ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক একটি অস্বস্তিকর নিম্নবিন্দু ছুঁয়ে এখন নতুন ভারসাম্য খুঁজছে। এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন, অন্তর্ভুক্তি, নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং বাস্তববাদী কূটনীতি।
ইউনূস সরকারের সময় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তার মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে মতপার্থক্য এবং ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস। দিল্লি ধারাবাহিকভাবে “ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ” নির্বাচনের কথা বললেও বাস্তবে আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখেই নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হওয়া ভারতের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি কৌশলগত ধাক্কা হয়ে আসে। প্রথমে সীমিত চাপ ও প্রতীকী বার্তার মধ্যে থাকলেও দ্রুতই তারা বুঝে নেয়- বাস্তবতা বদলানো সম্ভব নয়, তাকে মোকাবিলা করাই একমাত্র পথ।
এই উপলব্ধি থেকেই ভারতের নীতিতে আসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। লক্ষ্য আর নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং নির্বাচনের পর উদ্ভূত বাস্তবতায় প্রভাব বজায় রাখা। এখানে নিরাপত্তা-উদ্বেগ একটি কেন্দ্রীয় উপাদান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে এমন কোনো শক্তির উত্থান, যা আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে বা প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব বাড়াতে পারে- দিল্লির কাছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে তারা দ্রুত “রিঅ্যাকটিভ” নয়, বরং “অ্যাডাপটিভ” কৌশলে সরে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন ভারতের জন্য কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। অতীতের টানাপোড়েন- অনুপ চেটিয়া, ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা কিংবা নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ- দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস তৈরি করেছিল। কিন্তু কূটনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা বন্ধু নেই, থাকে স্থায়ী স্বার্থ। সেই স্বার্থের জায়গা থেকেই দিল্লি বিএনপির সঙ্গে একটি কার্যকর কর্মসম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়।
তবে এখানেই ভারতের নীতির সূক্ষ্মতা। একদিকে নতুন বাস্তবতায় বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানো, অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ঘোষণা না করা- এই দ্বৈত অবস্থানই এখন তাদের কৌশলের কেন্দ্র। কারণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ শুধু একটি দল নয়; রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রধান শক্তি।
এই বাস্তবতাই ভারতের ভাষ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। “ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন” থেকে সরে এসে এখন তারা বলছে “ফিয়ারলেস, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এবং ইনক্লুসিভ স্টেট”- শব্দের এই পরিবর্তন কেবল কূটনৈতিক শৈলী নয়, নীতিগত পুনর্নির্ধারণ। এর অন্তর্নিহিত বার্তা পরিষ্কার: বাংলাদেশে টেকসই স্থিতিশীলতা চাইলে কোনো প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে বাইরে রাখা যাবে না।
কারণ, রাজনৈতিক শূন্যতা কখনো স্থায়ী থাকে না। আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি বাইরে রাখা হলে যে ভ্যাকুয়াম তৈরি হবে, তা অন্য শক্তি পূরণ করবে- এবং সেই শক্তি কতটা পূর্বানুমেয় হবে, সেটিই দিল্লির বড় উদ্বেগ। গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই তারা দেখেছে, এই শূন্যতায় বহিরাগত প্রভাব প্রবেশের ঝুঁকি থাকে। ফলে ভারতের কাছে এখন মূল লক্ষ্য—ভারসাম্য রক্ষা, একচেটিয়া প্রভাব নয়।
এই কারণেই দিল্লি এখন ‘সফট এনগেজমেন্ট’-এর পথে হাঁটছে। তারা প্রকাশ্যে চাপ তৈরি না করে সম্পর্ক পুনর্গঠন করছে- জ্বালানি সহযোগিতা, কূটনৈতিক যোগাযোগ, উচ্চপর্যায়ের সফর- এসবের মাধ্যমে একটি কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে তারা এমন কোনো অবস্থান নিচ্ছে না, যা বিএনপিকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে বা সম্পর্ককে অস্থিতিশীল করে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের অবস্থানও লক্ষণীয়ভাবে পরিমিত। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া, তাকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রোটোকল দেওয়া- এসব পদক্ষেপ একটি বার্তা দেয়: সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি, বরং অপেক্ষমাণ। তবে সেই অপেক্ষা শর্তহীন নয়। দিল্লির প্রত্যাশা- আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরতে হলে নিজেদের সক্ষমতা দিয়েই ফিরতে হবে, বাইরের কূটনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে নয়।
এখানেই আওয়ামী লীগের সামনে বাস্তবতার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি দাঁড়ায়। প্রবাসে থেকে কূটনৈতিক সহানুভূতির ওপর নির্ভর করা, নাকি ঝুঁকি নিয়েও দেশে ফিরে সাংগঠনিক ভিত্তি পুনর্গঠন করা, এই দ্বিধা এখন আর দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই।
কারণ, রাজনীতির মৌলিক সত্য একটাই: মাঠে অনুপস্থিত শক্তি ধীরে ধীরে প্রাসঙ্গিকতা হারায়। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই। নেতা-কর্মীদের দেশে ফিরে সংগঠন সক্রিয় করা, জনসম্পৃক্ততা পুনর্গঠন করা- এই পথই বাস্তবসম্মত, যদিও তা ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমান সরকারের কৌশলও এখানে প্রাসঙ্গিক। একদিকে তারা নিজেদেরকে ‘প্রতিহিংসাপরায়ণ নয়’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। অন্যদিকে পুরোনো মামলা বহাল রাখা এবং বেছে বেছে গ্রেফতারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে। এই দ্বৈত কৌশল- নরম ও কঠোরের মিশ্রণ- রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সীমাবদ্ধ রাখার একটি কার্যকর পদ্ধতি, যদিও তা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে না।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিস্থিতি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা। তারা চায়, বাংলাদেশে একটি কার্যকর সরকার থাকবে, তার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ থাকবে, এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা টিকে থাকবে। কারণ, একপাক্ষিক আধিপত্য বা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা- দুটিই তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় আওয়ামী লীগকে তারা এক ধরনের ‘স্ট্যাবিলিটি মেকানিজম’ হিসেবে বিবেচনা করছে- একটি বিকল্প শক্তি, যা প্রয়োজনে ভারসাম্য পুনঃস্থাপনে ভূমিকা রাখতে পারে। এটি কোনো আবেগগত অবস্থান নয়, এটি ঠান্ডা মাথার কৌশলগত হিসাব।
কিন্তু এই কৌশলকে যদি আওয়ামী লীগের ভেতরে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, যদি মনে করা হয় যে- বাইরের কোনো শক্তি তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে- তাহলে সেটি হবে মারাত্মক ভুল। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘কৃপা’ বলে কিছু নেই, আছে কেবল স্বার্থের সমীকরণ।
এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ নীরবতার পর নেতা-কর্মীদের দেশে ফেরার আহ্বান- এটি কেবল সাংগঠনিক নির্দেশ নয়, এটি বাস্তবতার স্বীকৃতি। তিনি সম্ভবত বুঝেছেন- প্রবাসে থেকে রাজনীতি টিকিয়ে রাখা যায় না, এবং রাজনৈতিক বৈধতা ফিরে পেতে হলে মাঠে উপস্থিতি অপরিহার্য।
সবশেষে প্রশ্নটি সোজা: আওয়ামী লীগ কি নিজের শক্তিতে ফিরে আসার ঝুঁকি নেবে, নাকি অনিশ্চিত কূটনৈতিক সম্ভাবনার অপেক্ষায় থাকবে?
ভারত তার স্বার্থে ভারসাম্যের কূটনীতি চালিয়ে যাবে,এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো দেশের রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে সেই দেশের জনগণ এবং সেই দলের নিজস্ব সক্ষমতা। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না।
রাজনীতিতে শূন্যস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয় না, এবং অনুপস্থিত শক্তিকে ইতিহাস খুব কমই দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়- প্রত্যাবর্তন, নাকি প্রান্তিক হয়ে পড়া।
#
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
০১৭৪০৮৯৮৩৩২(হোয়াটসএ্যাপ)
ই-মেইল : raselahmed1980bk@gmail.com







