বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীকে প্রায়ই একটি আদর্শভিত্তিক ধর্মীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু দলটির ইতিহাস, রাজনৈতিক অবস্থান এবং রাষ্ট্র ও সমাজে তার ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় জামায়াত কেবল একটি নির্বাচনী দল নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-ধর্মীয় আন্দোলন, যার অবস্থান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই সংঘর্ষপূর্ণ।
জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪১ সালে, ব্রিটিশ শাসনামলের এক সংকটময় সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তখন উপনিবেশিক শাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রভাব বিস্তার করছে। এই সময়েই আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বে ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ’ গঠিত হয়।
প্রতিষ্ঠালগ্নে জামায়াত কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল ছিল না; বরং একটি আদর্শিক আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে ‘পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। মওদুদী জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে পশ্চিমা প্রভাবজাত ধারণা হিসেবে সমালোচনা করেন এবং এগুলোকে ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী বলে মনে করতেন।
এই কারণে জামায়াত একদিকে মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্ব ও দেশভাগের বিরোধিতা করে, অন্যদিকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদকেও প্রত্যাখ্যান করে। মওদুদীর রাজনৈতিক দর্শনে রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল ধর্মীয় আদর্শ, নাগরিকত্ব নয়। ফলে জামায়াত শুরু থেকেই গণতান্ত্রিক জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জামায়াতে ইসলামী ভারত ও পাকিস্তানে পৃথক সংগঠনে বিভক্ত হয়। পাকিস্তানে দলটি একদিকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে, অন্যদিকে আধুনিক সংবিধান ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিরোধিতা করে। মওদুদী নিজেও একপর্যায়ে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন এবং মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হন। তবে এসব দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও জামায়াতের মৌলিক আদর্শিক অবস্থান অপরিবর্তিত থাকে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামীর সবচেয়ে বিতর্কিত ভূমিকা আসে ১৯৭১ সালে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয়। ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই ভূমিকার কারণেই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়।
১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৬ সালে দলটি পুনরায় রাজনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ পায়। এরপর থেকে জামায়াত ক্ষমতাকেন্দ্রীক বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোটের রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে।
জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো,তারা সরাসরি ভোটের রাজনীতিতে প্রধান শক্তি হওয়ার চেয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তারকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছাত্র রাজনীতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং অর্থনৈতিক খাতে দলটির সক্রিয়তা দীর্ঘদিন ধরে দৃশ্যমান।
বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক উদ্যোগ ও দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে জামায়াত একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, এমন অভিযোগ বহুদিনের। সমালোচকদের মতে, এই অর্থনৈতিক শক্তি আদর্শিক প্রচারের পাশাপাশি সাংগঠনিক বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
নারী অধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বরাবরই বিতর্কিত। দলটির বক্তব্য ও কর্মসূচিতে ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবে এসব অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচিত হয়েছে। নারী নেতৃত্ব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় বহুত্বের প্রশ্নে দলটির দ্বৈত অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজে প্রশ্ন রয়েছে।
অনেকে যুক্তি দেন জামায়াতের ভোটব্যাংক সীমিত, তাই তাদের নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগের কারণ নেই। তবে বাস্তবতা হলো, জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতির বদলে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল অনুসরণ করেছে। এই কৌশল তাদের রাজনৈতিক প্রভাবকে ভোটের অঙ্কের বাইরে নিয়ে গেছে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও জামায়াতকে ঘিরে নানা বিশ্লেষণ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হয়েছে,এটি নতুন নয়। বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জামায়াতে ইসলামীকে কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা আন্দোলন, যার আদর্শিক অবস্থান বাংলাদেশের সংবিধানিক চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক।
এই বাস্তবতা নিয়ে যুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক ও শান্ত আলোচনার প্রয়োজন আছে। কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নির্ভর করবে,রাষ্ট্র কোন মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে এগোবে, এবং সমাজ কোন পথকে বেছে নেবে তার ওপর।
রাসেল আহমদ
সাংবাদিক ও কলামিস্ট







