মুজিব শতবার্ষিকী উদযাপনের নামে যে লুটপাট হয়েছে, তার প্রধান হাতিয়ার ছিল দেশব্যাপী ১০ হাজার ম্যুরাল নির্মাণ। কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে এমদাদুল্লাহ মিয়ান এই প্রকল্পের নীতিনির্ধারণী থেকে শুরু করে ঠিকাদার নির্বাচন পর্যন্ত সব নিয়ন্ত্রণ করতেন।
খরচের হিসাব বনাম বাস্তব চিত্র:
সরকারি নথিতে (প্রকল্প কোড: ২০২১-এমভি-০৯) প্রতিটি ম্যুরাল নির্মাণের জন্য গড় বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৫.৫০ লক্ষ টাকা।
কাগজে কলমে ব্যয়: ১০,০০০ ম্যুরাল × ৫.৫০ লক্ষ = ৫৫০ কোটি টাকা।
বাস্তব চিত্র: মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ ম্যুরাল স্থানীয় রাজমিস্ত্রি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে যার প্রকৃত ব্যয় ছিল মাত্র ১.২০ লক্ষ থেকে ১.৫০ লক্ষ টাকা।
পকেটে গেছে: প্রতিটি ম্যুরাল থেকে প্রায় ৪ লক্ষ টাকা করে মোট ৪০০ কোটি টাকা সিন্ডিকেটের পকেটে গেছে বলে ধারণা করা হয়।
ঠিকাদার নিয়োগে ‘গোপালগঞ্জ ও ঢাকা সিন্ডিকেট’:
উন্মুক্ত দরপত্র (Open Tendering Method) পদ্ধতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এমদাদুল্লাহ মিয়ান তার নিজ ক্ষমতাবলে ‘কোম্পানি লিমিটেড’ নামক একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করেন।
দলীয় আত্মীয়করণ:
প্রাপ্ত দলিল অনুযায়ী, এই প্রকল্পের কাজ পাওয়া ৮০% ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক হয় তৎকালীন ছাত্রলীগের সাবেক প্রভাবশালী নেতা অথবা এমদাদুল্লাহ মিয়ানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।
গোপন সমঝোতা:
ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম ১৫% কমিশন নেওয়া হতো, যা মিয়ানের ব্যক্তিগত ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হতো।
অস্তিত্বহীন বা ‘ভৌতিক’ ম্যুরাল:
অনুসন্ধানে সবচেয়ে ভয়াবহ যে তথ্যটি উঠে এসেছে তা হলো—কাগজে কলমে ম্যুরাল নির্মিত হয়েছে দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক স্থানে কোনো ম্যুরাল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
উদাহরণ: কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ২০০টি ম্যুরাল নির্মাণের বিল চূড়ান্ত করা হয়েছে (স্মারক নং: ৩৩৪/২১)। কিন্তু আমাদের প্রতিনিধি সরজমিনে ১০টি কেন্দ্র পরিদর্শন করে মাত্র ২টিতে ম্যুরাল দেখতে পেয়েছেন, বাকি ৮টি ছিল কেবল ইটের দেয়াল অথবা ফাঁকা জায়গা।
দুর্নীতির খতিয়ান ও সহযোগীদের নেটওয়ার্ক:
এমদাদুল্লাহ মিয়ান তার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে যে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, তাতে জড়িত ব্যক্তিবর্গ ও তাদের ভূমিকা নিচে কোনো বন্ধনী বা আন্ডারলাইন ছাড়াই তুলে ধরা হলো:
ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী:
সাবেক প্রধান সচিব এবং শতবার্ষিকী কমিটির প্রধান সমন্বয়ক। তিনি ছিলেন এই পুরো লুটপাটের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এমদাদুল্লাহ মিয়ানের প্রতিটি বিতর্কিত ফাইলে তিনি প্রশাসনিক ছাড়পত্র দিতেন এবং দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতেন।
আবু নাসের:
শতবার্ষিকী কমিটির আহ্বায়ক। বর্তমানে তিনি কারাগারে বন্দী। তার মাধ্যমেই রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতির ভাগ পৌঁছে দেওয়া হতো। আবু নাসের জেলে থাকলেও তার প্রধান সহযোগী ও মাস্টারমাইন্ড এমদাদুল্লাহ মিয়ান এখনো সচিবালয়ে স্বপদে বহাল রয়েছেন, যা প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের জন্য চরম অবমাননাকর।
লিয়াকত আলী লাকী:
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আড়ালে মিয়ানের সাথে যোগসাজশ করে কয়েকশ কোটি টাকার ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরিতে তিনি মূল ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে সাংস্কৃতিক উৎসবের নামে সরকারি বরাদ্দ লুটপাটে তারা একে অপরের পরিপূরক ছিলেন।
আসাদুজ্জামান নূর:
সাংস্কৃতিক উপ-কমিটির আহ্বায়ক। তিনি প্রশাসনিক এই সিন্ডিকেটকে রাজনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করতেন। বড় বড় বাজেটের সাংস্কৃতিক ইভেন্টগুলোর তদারকি ও ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে মিয়ানের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
গোপালগঞ্জ ও ঢাকা নেটওয়ার্ক:
টুঙ্গিপাড়া সফরের সময় তৎকালীন জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা এবং পুলিশ সুপার আয়েশা সিদ্দিকা প্রশাসনিক প্রটোকল ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের আড়ালে শতবার্ষিকী কমিটির বিলাসবহুল আয়োজনগুলো বাস্তবায়ন করতেন। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান চৌধুরী ইমদাদুল হক এবং উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতারা এই দুর্নীতির স্থানীয় ভাগীদার ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনিক পচনের শেষ কোথায়?
এমদাদুল্লাহ মিয়ানের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ কেবল আর্থিক দুর্নীতি নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার শামিল।
ক্ষমতার অপব্যবহারের সময়কাল:
২০২০ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনি ক্রমাগতভাবে প্রশাসনকে দলীয়করণ করেছেন।
ভবিষ্যৎ শঙ্কা: কৃষি সচিব হিসেবে বর্তমানে তিনি ১৮ হাজার নির্বাচনী কর্মকর্তার ভাগ্যবিধাতা। এই পদে তার বহাল থাকা মানেই একটি সাজানো ও একপাক্ষিক নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করা।
জনদাবি ও পরবর্তী পদক্ষেপ:
দালিলিক প্রমাণ বলছে, এমদাদুল্লাহ মিয়ান একজন পেশাদার আমলা নয় বরং একজন ‘পলিটিক্যাল ক্যাডার’। অবিলম্বে তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলে মুজিব শতবার্ষিকীর লুটপাট করা শত শত কোটি টাকার হদিস মিলবে।







