ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ : বাংলাদেশের ইতিহাসে যে কয়েকটি তারিখ বা দিবস নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে, ৭ই নভেম্বর তার অন্যতম। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে তৎকালীন সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। কর্নেল তাহের বীর উত্তম কর্তৃক সংগঠিত বিপ্লবী সৈনিকেরা তাকে মুক্ত করেছিল। জেনারেল জিয়াকে বন্দী রাখা সহ অন্যান্য কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ, বীর উত্তম, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা, বীর বিক্রম এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দার, বীর উত্তম রংপুর থেকে ঢাকার সংসদ ভবনে বিশেষ কর্তব্যে আসা ১০ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ৭ই নভেম্বর উত্তেজিত একদল সেনাসদস্যের গুলিতে এই তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধারও মৃত্যু ঘটে। এই দিনটিতে তথাকথিত বিপ্লবী সৈনিকেরা আরো হত্যা করে একজন লেডি ডাক্তার সহ ১৩ জন অফিসারকে। বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরীর স্ত্রীকেও তারা হত্যা করে। বিপ্লবী সৈনিকেরা পরিকল্পনা মোতাবেক ক্ষমতা গ্রহণে ব্যর্থ হন।পরে এমন বিপ্লব সংঘটিত করায় বিচারের মুখোমুখি হন কর্নেল তাহের। বিচারের রায়ে ফাঁসি হয় একাত্তরে যুদ্ধাহত এই কর্নেলের। খালেদ মোশারফের পক্ষ অবলম্বন করায় কারাবরণ করেন কর্নেল জামিল। এসব কারণে জিয়া ভক্তদের দৃষ্টিতে ৭ই নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। আবার জিয়া বিরোধীদের কাছে মুক্তিযোদ্ধা ও সৈনিক হত্যা দিবস হিসাবে চিহ্নিত। কর্ণেল তাহের অনুসারী ও সমাজতন্ত্রকামীদের কাছে ৭ই নভেম্বর শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় একটি মাইল ফলকের নাম।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বাকশাল প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল দেশ-বিদেশের বহু পক্ষ ও চক্রান্তকারী। তবে মুজিব পরিবারের সদস্যদের সরাসরি হত্যার কাজটি সম্পন্ন করেন গুটি কয়েক মেজর ও অন্যান্য পদবীর সেনারা। এই হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে তৎকালীন সংসদ ও নতুন করে সাজানো মন্ত্রী সভা চালু থাকলেও মূল ক্ষমতা থাকে হত্যাকাণ্ডে ঘটানো গুটিকয় সেনা অফিসারদের হাতে। তবে সেনাবাহিনী শ্রেষ্ঠতা অনুসারে এমন মেজরদের খবরদারি মেনে নেওয়া তাদের সিনিয়র অফিসারদের জন্য কঠিন ছিল। এসব অফিসারদের মধ্যে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ বীর উত্তম রহস্যময় কারণে খন্দকার মোশতাকের সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। একই পথে হাঁটেন বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) এবং পুলিশ বাহিনী প্রধানসহ বেসামরিক আমলারা।
অন্যদিকে এসব মেজরদের খবরদারি মানতে পারছিলেন না তৎকালীন মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ ও কর্নেল শাফায়েত জামিন সহ আরেকদল মুক্তিযোদ্ধা অফিসার। তারা কি ভারতপন্থী হিসেবে মুজিব হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিপক্ষে ছিলেন নাকি প্রকৃতই সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা তথা চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। একই সময়ে আবার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট কর্নেল তাহের এমন ঘোলাটে পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অফিসারদের হত্যা করে বা হটিয়ে কেবল সৈনিকদের নিয়ে শ্রেণীহীন সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একটি শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তৎপর থাকেন।
১৫ ই আগস্ট এর পর থেকেই সারা দেশে বিশেষত সেনা ছাউনিসমূহে এক অস্থির উত্তেজনাকর রহস্যময় ও গোমর পরিস্থিতি বিরাজ করতে থাকে এ সময় নানা প্রকার গুজবের অন্যতম ছিল ভারতের সম্ভাব্য আক্রমণ এবং পুরনো পুনরায় মুজিবপন্থীদের ক্ষমতায় বসানোর সম্ভাবনা এই সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করে দিতে শেখ মুজিবুর রহমানের মূল সহযোগী মেধাবী রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের চার কান্ডারী তাজউদ্দিন আহমেদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম ক্যাপ্টেন মনসুর আহমেদ ও কামরুজ্জামানকে হত্যার মিশনে নামে মুজিব পরিবার থেকে হত্যার সাথে জড়িত সদস্যরা উল্লেখিত চার নেতা ১৫ই আগস্ট এর পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিলেন। ৩রা নভেম্বর রাতের আঁধারে এই কারাগারেই তাদের হত্যা করা হয়। এতে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টাতে থাকে সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল কেম শফিউল্লাহকে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দিয়ে সেনা নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয় সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তবে তার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা খরগো করতে খন্দকার মোস্তাক গম মেজ জেনারেল খলিলুর রহমানকে সেনাপ্রধানের উপরের ধাপে চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এ জি ওসমানী কে প্রেসিডেন্টের ডিফেন্স এডভাইজার নিযুক্ত করেন প্রেসিডেন্ট জিয়া এসব নিয়োগ এবং মুজিব হত্যা ও জেল হত্যায় জড়িত মেজরদের খবরদারি নিরবে মেনে নেওয়ার কৌশল নেন বলে ধারণা করতেন জেনারেল খালেদ মোশারফ গং। তবে তারা চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিশেষত নির্বিচারে ও বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ড মেনে নেওয়ার পক্ষে ছিলেন না।
যে কোন মূল্যে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা বিশেষত চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার ব্রতে অটল তৎকালীন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ ও তার অনুসারীরা জেল হত্যার পরপর সকল বিষয়ে নমনীয় মেজর জেনারেল জিয়াকে সরিয়ে ক্ষমতার গ্রহণে তৎপর হন। একপর্যায়ে তারা মেজর জেনারেল জিয়াকে গৃহবন্দী করেন এবং তার কাছ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করছেন মর্মে একটি পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর নেন। তাদের পরিকল্পনার মধ্যে ছিল মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে জাতিসংঘ মিশন অথবা অন্য কোন দেশে কূটনৈতিক দায়িত্বে প্রেরণ করা ও চেইন অফ কমান্ড ভঙ্গকারী সেনা সদস্যদের বিচারের আওতায় আনা। মেজর জেনারেল খালেদের তৎপরতা টের পেয়ে নিজেদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ছাড়ে মুজিব হত্যাকাণ্ডে জড়িত সেনা অফিসারগণ। এদিকে মেজর জেনারেল জিয়া ছিলেন সৈনিকদের বিশেষত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রিয় ভজন। তার বন্দিদসা ও অন্যান্য গুজব সেনা শিবিরে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়িয়ে তোলে।
কর্নেল তাহের যেন এমন সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। ৬ নভেম্বর রাতেই লিফলেট বিতরণ করে সেই উত্তেজনাকে আরো উসকে দেয় তাহের অনুসারী তৎকালীন জাসদ কর্মী ও একশ্রেণীর সেনারা। তাদের বক্তব্যের মূল কথা ছিল “সৈনিক সৈনিক ভাই – ভাই অফিসারের রক্ত চাই”। এই সৈনিকদের কাজে লাগিয়েই মেজর জেনারেল জিয়াকে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত করেন কর্নেল তাহের ও বিপ্লবী সৈন্যরা। তাদের প্রত্যাশা ছিল জিয়া শ্রেণীহীন সেনাবাহিনী তথা শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিপ্লবী সেনাদের সহযাত্রী হবেন। কিন্তু মুক্ত হয়ে জিয়া সে পথে হাঁটেননি। জিয়া দেখতে পান যে মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ কর্তৃক খন্দকার মোশতাক আহমেদকে সরিয়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়েছে। জিয়া প্রথমেই বিচারপতি সায়ামের নেতৃত্ব মেনে নেন এবং তার অধীনে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন। তবে সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি সেনা শিবিরে উত্তেজনা ছড়ানো, শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বিদ্রোহের দায়ে অভিযুক্তদের কঠোর বিচার করেন। এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। এসব বিতর্কের কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছেন কর্নেল তাহেরসহ একাধিক মুক্তিযোদ্ধা অফিসার, যাদের সংক্ষিপ্ত সময়ে বিচার করা হয় এবং ফাঁসির মাধ্যমে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
প্রিয় পাঠক, ৭ই নভেম্বর নিয়ে বহু বই এবং নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। আমি নিজে এ নিয়ে ৭টি বই পড়েছি, যা লিখেছেন কর্নেল শাফায়েত জামিল, মেজর নাসির উদ্দিন, মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল শরিফুল হক ডালিম (মেজর ডালিম), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন এবং মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্
রাহিম। মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ এবং কর্নেল শাফায়েত জামিলের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক বই সম্পাদনা করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সম্পাদক মতিউর রহমান। এছাড়া বিদেশি লেখকদের লেখা ইংরেজি বই ও নিবন্ধেও ৭ ই নভেম্বর প্রসঙ্গটি এসেছে বহুভাবে। এসব বই ও লেখা পড়ে ৭ ই নভেম্বর নিয়ে কোন সমাপনী মন্তব্য করা অত্যন্ত কঠিন।
তবে সাতই নভেম্বর থেকে আমাদের অবশ্যই শিক্ষা নেয়া উচিত। আমাদের মনে রাখতে হবে যে সেনাবাহিনীকে সবসময় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা অত্যাবশ্যক। রাজনীতিতে সেনাবাহিনী জড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বয়ং সেনাবাহিনী। সেনানিবাসে অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ থাকে, যা সাধারণ মানুষের করের টাকায় কেনা। অনাবশ্যক কারণে কিংবা কোন দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির স্বার্থে এসব অস্ত্র গর্জে উঠা বা দেশের শত্রুর বদলে নিজ জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার চেয়ে দুঃখজনক ও কলঙ্কময় আর কিছু হতে পারে না। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং পূর্বসূরীদের দেখানো গৌরবময় পথ ধরে উৎকর্ষতা চরম শিখরে আরোহন করুক আমাদের সেনাবাহিনী এবং পেশাদার বাহিনী হিসাবে আন্তর্জাতিক মহলে আরো সমাদৃত হোক এটাই প্রার্থনা।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর, গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
ইমেইল: directoradmin2007@gmail.com







