অমিতাভ চৌধুরী, কেশবপুর (যশোর): বিশাল দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন বটগাছ। চারপাশে পুরোনো দিনের নানা স্মৃতি। সপ্তাহের রবিবার ও বৃহস্পতিবার দূর-দূরান্ত থেকে মানুষের আগমন। কেউ ধূপ-মোমবাতি জ্বালিয়ে স্মরণ করেন মান্দার ফকিরকে, কেউ করেন মানত। আবার সনাতন ধর্মাবলম্বী অনেক পরিবার শিশুদের নিয়ে পালন করেন গালেভাতসহ বিভিন্ন পারিবারিক আচার। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও এই স্থানকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস ও উপস্থিতিতে যেন মিলেমিশে যায় নানা সম্প্রদায়ের মানুষ।
যশোরের কেশবপুর সদর ইউনিয়নের মাগুরাডাঙ্গা এলাকায় অবস্থিত কালা পাহাড় ফকির আওলিয়া দমের মান্দার, স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মান্দার ফকির’ নামে। তাঁকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে এ ঐতিহাসিক স্থান। স্থানীয়দের ভাষ্য, মান্দার ফকিরের নাম থেকেই একসময় এলাকাটি ‘মান্দারডাঙা’ নামে পরিচিতি পায়।
স্থানীয় প্রবীণদের দাবি, এ স্থানের বয়স ৬০০ বছরেরও বেশি। তবে এর পক্ষে লিখিত ঐতিহাসিক দলিল বা সরকারি নথি পাওয়া গেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সন্তান না থাকলেও বংশের ধারাবাহিকতা
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মান্দার ফকিরের নিজের কোনো সন্তান ছিল না। তাঁর বোনের সন্তানদের বংশধররাই পরবর্তী সময়ে এ স্থানের দেখভাল ও ভোগদখলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আসছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের মধ্যেই এই ধারাবাহিকতা চলে আসছে বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় মুনসুর ফকির বলেন, মান্দার ফকিরের নিজের কোনো সন্তান ছিল না। তাঁর বোনের বংশধররাই দীর্ঘদিন ধরে এ স্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
রবিবার ও বৃহস্পতিবার বসে মেলা
সপ্তাহের রবিবার ও বৃহস্পতিবার এখানে বসে সাপ্তাহিক মেলা। কেশবপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এ মেলায় আসেন। কেউ আসেন মানত করতে, কেউ মানত পূরণ করতে, আবার কেউ আসেন ঐতিহ্যবাহী এ স্থানটি দেখতে।
স্থানীয়দের মতে, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই মেলা এখন এলাকার লোকসংস্কৃতিরও একটি অংশ হয়ে উঠেছে।
ধর্মের ভিন্নতা নেই বিশ্বাসের জায়গায়
মান্দার ফকিরের আস্তানার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উপস্থিতি। স্থানীয়দের ভাষ্য, মুসলিমদের পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও নিয়মিত এখানে আসেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বী অনেক পরিবার তাদের শিশুদের মুখেভাতসহ বিভিন্ন পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠান এখানে এসে পালন করেন। কেউ ধূপ-মোমবাতি জ্বালান, কেউ মানত করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস আলাদা হলেও স্থানটিকে ঘিরে মানুষের আবেগ ও শ্রদ্ধার জায়গাটি যেন এক।
সন্তান লাভের মানত—লোকবিশ্বাসের এক অধ্যায়
মান্দার ফকিরের আস্তানাকে ঘিরে নানা ধরনের লোকবিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয়দের মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় সন্তান লাভের মানতের কথা।
লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে—যেসব দম্পতির সন্তান হয় না, তারা এখানে এসে মানত করলে সন্তান লাভ করেন। এ বিশ্বাসে অনেক দম্পতি এখানে আসেন এবং মানত করেন বলে স্থানীয়রা জানান।
তবে সন্তান লাভের বিষয়টি লোকবিশ্বাস ও জনশ্রুতির অংশ; এর কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণের দাবি করা হচ্ছে না।
পুরোনো বটগাছ ও বিশাল দিঘি
মান্দার ফকিরের আস্তানার সামনে রয়েছে বিশাল একটি দিঘি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ দিঘিটিও স্থানটির ঐতিহ্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে।
প্রায় ৫ একর জায়গাজুড়ে দিঘিসহ পুরো স্থানটি বিস্তৃত বলে স্থানীয়রা জানান। সেখানে রয়েছে একটি পুরোনো বটগাছ, যেটিকে স্থানীয়রা সেই প্রাচীন সময়ের সাক্ষী হিসেবে দেখেন।
বটগাছ, দিঘি, মাজার ও আশপাশের পরিবেশ—সব মিলিয়ে স্থানটিতে তৈরি হয়েছে একটি ঐতিহাসিক আবহ।
শ্রীগঞ্জের পুরোনো ব্রিজ নিয়েও জনশ্রুতি
মান্দার ফকিরকে ঘিরে কেশবপুরের আরও একটি ঐতিহাসিক জনশ্রুতি রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কেশবপুর শ্রীগঞ্জের পুরোনো ব্রিজটি মান্দার ফকিরের সময়কালে তাঁর উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল।
তবে ব্রিজটির নির্মাণকাল, নির্মাতা এবং মান্দার ফকিরের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্কের বিষয়ে কোনো লিখিত ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া গেছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রবীণদের স্মৃতিতে মান্দার ফকির
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ লুৎফর ফকির দীর্ঘদিনের স্মৃতি ও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত নানা তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্যেও মান্দার ফকিরের আস্তানাকে ঘিরে বহু পুরোনো ঐতিহ্য ও লোককথার কথা উঠে আসে।
স্থানীয়দের বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে একই কথা—এটি শুধু একটি মাজার বা ধর্মীয় স্থান নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মানুষের বিশ্বাস, লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির একটি স্থান।
ছয় শতাব্দীরও বেশি পুরোনো হওয়ার দাবি সত্য হোক কিংবা লোকমুখে চলে আসা একটি ঐতিহ্যই হোক—মান্দার ফকিরের আস্তানা আজও কেশবপুরের মানুষের বিশ্বাস, স্মৃতি ও সম্প্রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।







