হোটেল ও রেস্তোরাঁ সেক্টরে সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি ও শ্রম আইন বাস্তবায়ন এবং শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা পরিকল্পিত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে রাজধানী ঢাকায় বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করেছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, সুইটমিট ও বেকারি শ্রমিকরা।
আজ ৩১ আগস্ট (সোমবার) সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘হোটেল রেস্তোরাঁ সেক্টরে সরকার ঘোষিত নিম্নতম মজুরি ও শ্রম আইন বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ’-এর উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে হাজার হাজার শ্রমিকের অংশগ্রহণে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল শ্রম মন্ত্রণালয় অভিমুখে যাত্রা করে এবং শ্রম মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ করা হয়।
সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক এবং বাংলাদেশ হোটেল রেস্তোরাঁ সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি আক্তারুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন, যুগ্ম সম্পাদক প্রকাশ দত্ত, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রহমত আলী, সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক তোফাজ্জল হোসেন এবং বাংলাদেশ হোটেল রেস্তোরাঁ মিষ্টি বেকারি শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক মোঃ খোকন শিকদার। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আনোয়ার হোসেন। এছাড়াও ঢাকা মহানগরসহ বিভিন্ন থানা ও আঞ্চলিক কমিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সমাবেশে বক্তব্য প্রদান করেন।
স্মারকলিপিতে জানানো হয়, ২০২৫ সালের মে মাসে সরকার হোটেল ও রেস্তোরাঁ সেক্টরে ন্যূনতম মজুরির গেজেট প্রকাশ করলেও দীর্ঘ ১৬ মাস পার হয়ে গেলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তা কার্যকর করা হয়নি। শ্রমিকরা নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র ও সার্ভিস বুক ছাড়াই দৈনিক ১২-১৩ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন ও ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে চুক্তি সম্পাদিত হলেও মালিকপক্ষ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো তা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পরিদর্শনের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা পরবর্তীতে থমকে যায়।
স্মারকলিপিতে আরও অভিযোগ করা হয়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্রম মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে এই খাতকে অন্তর্ভুক্ত করলেও বাস্তবে আইন প্রয়োগের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। উল্টো অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়ায় ঢাকার স্টার কাবাবের ৪ জন শ্রমিক সহ নেত্রকোনা ও সিলেটের বহু শ্রমিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, রংপুরের খামারবাড়ি আলম হোটেলের শ্রমিক শাওনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মালিককে এখনো গ্রেপ্তার না করার প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে শ্রমিকদের ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়:
১. হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বেকারি সেক্টরে ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
২. শ্রমিকদের নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র, সার্ভিস বই প্রদান এবং ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস নিশ্চিত করা।
৩. শ্রম আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪. অতিরিক্ত কাজের মজুরি ও বকেয়া পাওনা সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা।
৫. কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা।
৬. অসাধু ও দুর্নীতিবাজ পরিদর্শন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
৭. হোটেল শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা।
৮. শ্রমিক ও নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা ও জিডি প্রত্যাহার করা।
৯. রংপুর নগরীর হোটেল শ্রমিক শাওন হত্যার মূল আসামি হোটেল মালিককে দ্রুত গ্রেপ্তার, সর্বোচ্চ শাস্তি এবং আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
১০. ২০১৭ সালে ঢাকার ঘরোয়া হোটেলের মালিক সোহেল বয়াতি কর্তৃক শ্রমিক রিয়াজুল ইসলাম রিয়াদ হত্যাসহ পূর্বের সব শ্রমিক হত্যার বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা।
স্মারকলিপিতে শ্রম মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়, দেশের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই খাতে অবদান রাখলেও তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দ্রুত আইন অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি ও শ্রমিকদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়।






