ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়ন দাখিল শেষ হয়েছে, আর সেই সঙ্গে আবার আলোচনায় এসেছে প্রার্থীদের হলফনামা। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এসব হলফনামা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে টেলিভিশন টকশো- সবখানেই চলছে বিশ্লেষণ। কে কত আয় দেখালেন, কার কত সম্পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা কী, মামলার সংখ্যা কত- এসব তথ্য ঘিরেই প্রশ্নের শেষ নেই। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়। নতুন হলো কেবল নির্বাচনের সাল।
বাংলাদেশে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়ার বিধান চালু হয়েছিল ভোটারদের সামনে প্রার্থীদের একটি স্বচ্ছ ছবি তুলে ধরার উদ্দেশ্যে। ভাবনাটি ছিল মহৎ- ভোটার যেন জানেন তিনি কাকে ভোট দিচ্ছেন, সেই প্রার্থীর আর্থিক অবস্থা কী, তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা আছে কি না, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা কী। কিন্তু বাস্তবে এসে এই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হলো, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়া শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের হলফনামা প্রকাশের পর যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা আসলে এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। কোটি কোটি টাকার সম্পদের বিপরীতে বার্ষিক আয় দেখানো হচ্ছে কয়েক লাখ টাকা। পেশাগতভাবে উচ্চ আয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আয় দেখানো হচ্ছে এমন অঙ্কে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে খাপ খায় না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- এই তথ্যগুলো কতটা বাস্তবসম্মত?
আইনগতভাবে হলফনামার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, হলফনামায় মিথ্যা বা অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। একই সঙ্গে দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তির বিধানও রয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে ব্যবস্থা শক্ত। কিন্তু সমস্যা হলো প্রয়োগে। অতীতে খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, হলফনামায় দেওয়া তথ্যের অসত্যতার কারণে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, হলফনামা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। মনোনয়ন দাখিলের সঙ্গে সঙ্গে হলফনামা জমা দিতে হয়, নির্বাচন কমিশন তা প্রকাশ করে, কিছুদিন আলোচনা চলে, তারপর সবকিছু আগের মতোই থেমে যায়। যাচাই-বাছাইয়ের যে কথা বলা হয়, তা মূলত কাগজপত্রের পূর্ণতা দেখা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে।
এখানে একটি কাঠামোগত সমস্যাও আছে। মনোনয়ন দাখিলের পর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য যে সময় দেওয়া হয়, তা অত্যন্ত সীমিত। এই অল্প সময়ে আয়কর নথি, জমির দলিল, ব্যাংক হিসাব, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব, উপহার পাওয়া সম্পদের প্রকৃত মূল্য- এসব খুঁটিয়ে দেখা প্রায় অসম্ভব। প্রয়োজন হয় দক্ষ জনবল, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়। নির্বাচন কমিশনের বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে এটি কতটা সম্ভব, সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এর পাশাপাশি রাজনৈতিক বাস্তবতাও বড় একটি বিষয়। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের হলফনামা যাচাই করা মানে শুধু একটি প্রশাসনিক কাজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক চাপ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং নানা ধরনের অদৃশ্য প্রভাব। ফলে নির্বাচন কমিশন আইনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিতে দ্বিধায় পড়ে- এমন অভিযোগ নতুন নয়।
এই অবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভোটারের ওপর। ভোটার যদি মনে করেন, প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়, তাহলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপরই আস্থা কমে যায়। গণতন্ত্রে আস্থাই মূল পুঁজি। সেই আস্থা নষ্ট হলে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে ভোটার অংশ নেন ঠিকই, কিন্তু আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন।
হলফনামার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যখন একজন প্রার্থী জানেন যে, মিথ্যা তথ্য দিলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা কম, তখন তিনি কেন সঠিক তথ্য দিতে উৎসাহিত হবেন? বরং একটি ‘নূন্যতম নিরাপদ’ তথ্য দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়- যতটুকু দিলে আইনি ঝুঁকি কম থাকে। এই সংস্কৃতি বদলানো ছাড়া হলফনামাকে কার্যকর করা সম্ভব নয়।
তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, হলফনামা যাচাইকে নির্বাচনের সময়কেন্দ্রিক না রেখে একটি চলমান প্রক্রিয়ায় রূপ দিতে হবে। যারা সংসদ সদস্য হতে আগ্রহী বা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, তাদের আর্থিক ও আইনি তথ্যের একটি আপডেটেড ডাটাবেস থাকা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ভূমি রেকর্ড অফিস এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে যাচাইয়ের কাজ সহজ ও দ্রুত হবে।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। একজন প্রার্থীর হলফনামায় অসত্য তথ্য প্রমাণিত হলে যদি তার প্রার্থিতা বাতিল হয় বা আইন অনুযায়ী শাস্তি কার্যকর হয়, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় বার্তা। এতে ভবিষ্যতে অন্য প্রার্থীরা হলফনামা দিতে আরও সতর্ক হবেন।
সবশেষে বলতে হয়, হলফনামা কেবল প্রার্থীদের তথ্যের তালিকা নয়; এটি রাজনীতির নৈতিকতার একটি আয়না। এই আয়নায় যদি বারবার বিকৃত প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, তাহলে সমস্যাটি আয়নার নয়, ব্যবহারকারীর। নির্বাচন কমিশন যদি সত্যিই আগের অভিযোগগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তাহলে এই আয়নাকে পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রকাশিত হলফনামাগুলো আবারও আমাদের সেই পুরোনো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে- আমরা কি কেবল নিয়ম রক্ষা করেই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি সত্যিকারের স্বচ্ছতার পথে হাঁটব? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, হলফনামা ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের দর্পণ হয়ে উঠবে, নাকি থেকে যাবে কেবল আরেকটি আনুষ্ঠানিক কাগজ হিসেবে।
ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক সাংবাদিক কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী






