” শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাষ্টমীতে কুমারী পূজা নারীশক্তির আরাধনার এক প্রাচীন শাক্তাচার। দেবীভাগবত পুরাণের তৃতীয় স্কন্ধের ছাব্বিশতম অধ্যায়ে রয়েছে এর শাস্ত্রীয় বিধান। ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কুমারী পূজা ইতিহাসেও উল্লেখযোগ্য।”
কুমারী পূজার মাহাত্ম্য, শাস্ত্র ও ইতিহাস
সোমা ঘোষ মণিকা
লেখক ও কলামিস্ট
ভোরের শিশিরের ছোঁয়ায় পদ্মফুল ফোটে ঢাকা, শঙ্খ আর কালারের ধ্বনিতে মুখরিত হয় চারদিকে এমনি এক শারদীয় মহাষ্টমীর তিথিতে এক দেবীতুল্য খুঁতহীন শিশুকন্যাকে দেবী রূপে পূজা করা হয় প্রতি দুর্গা পূজার মহাষ্টমীতে। এই পূজা পদ্ধতিকে বলা হয় কুমারী পূজা। আরো বিস্তারিত বলতে গেলে দুর্গাপূজার মণ্ডপে যখন একটি ছোট্ট কন্যাকে লাল পোশাকে সাজিয়ে, কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে, ফুলের আসনে বসানো হয়, তখন ভক্তির চোখে সে হয়ে ওঠে জগজ্জননী শক্তির প্রতীক। তার পায়ে ফুল দিয়ে প্রণাম করেন ভক্তেরা। শিশুটির মধ্যে তাঁরা উপলব্ধি করতে চান সেই আদিশক্তিকে, যাঁর আরাধনায় সৃষ্টির জন্ম, জীবনের বিকাশ এবং অশুভের বিনাশ কল্পনা করা হয়। এই উপাসনার নাম কুমারী পূজা।
কুমারী পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়। এর অন্তরে রয়েছে নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, মাতৃত্বের প্রতি ভক্তি এবং মানুষের মধ্যে দেবত্ব উপলব্ধি করার দর্শন। তবে এই পূজার প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে শাস্ত্রীয় বিধান, ঐতিহাসিক তথ্য এবং লোকাচারকে পৃথকভাবে বিচার করা আজ সময়ের প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন হলো কুমারী পূজা কী এবং কেন করা হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে আরো গভীরে। হিন্দুধর্মের শাক্তধারায় দেবীকে জগতের সৃষ্টিশীল ও পরিচালনাকারী শক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়। সেই শক্তি কখনো দুর্গা, কখনো কালী, কখনো জগদ্ধাত্রী, আবার কখনো কুমারীর রূপে পূজিত হন। কুমারী পূজায় একটি বয়ঃসন্ধিতে না পৌঁছানো কন্যাকে দেবীর প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে পূজা করা হয়। এখানে শিশুটির সামাজিক পরিচয় বা পারিবারিক সম্পদ মুখ্য নয়। তার মধ্যে মাতৃশক্তির প্রকাশ কল্পনা করাই এই উপাসনার মূল ভাবনা।
দেবীভাগবত পুরাণের তৃতীয় স্কন্ধের ছাব্বিশতম অধ্যায়ে কুমারী পূজার বিধান, কুমারীর বয়সভেদে নামকরণ এবং পূজার মাহাত্ম্য বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। ওই অধ্যায়ের ৩৭ থেকে ৪৪ নম্বর শ্লোকে কুমারী পূজার নিয়ম এবং দুই থেকে দশ বছর বয়সী কন্যাদের বিভিন্ন নামের উল্লেখ রয়েছে। ৪৫ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে, কুমারী পূজার মাধ্যমে দুঃখ ও দারিদ্র্য দূর হওয়া এবং ধন, আয়ু ও শক্তি বৃদ্ধির ফল লাভের বিশ্বাস প্রচলিত।
চণ্ডীতে দেবীর সর্বব্যাপী শক্তির বন্দনা
শাক্তধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগ্রন্থ মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্য, যা সাধারণভাবে চণ্ডী বা চণ্ডীপাঠ নামে পরিচিত। এই গ্রন্থে দেবীকে জগতের সর্বব্যাপী শক্তি হিসেবে বন্দনা করা হয়েছে।
দেবীমাহাত্ম্যের পঞ্চম অধ্যায়ের ১২ নম্বর শ্লোক থেকে দেবীর বিভিন্ন সর্বব্যাপী রূপের বন্দনা শুরু হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে:
“যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥”
এর বাংলা অর্থ, যিনি সমস্ত জীবের মধ্যে শক্তিরূপে অবস্থান করছেন, সেই দেবীকে বারবার প্রণাম।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। এই মন্ত্রকে কুমারী পূজার নির্দিষ্ট বিধান হিসেবে উল্লেখ করা ঠিক নয়। এটি দেবীর সর্বব্যাপী শক্তির বন্দনা, যার ভাবনার সঙ্গে কুমারী পূজার দর্শনের মিল রয়েছে।
তবে ষষ্ঠী, সপ্তমী বা নবমী নয় মহাষ্টমীতে কুমারী পূজা কেন?
দুর্গাপূজার মহাষ্টমী শাক্তধর্মে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনে দেবীর মহাপূজা, অঞ্জলি এবং বিভিন্ন স্থানে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। তবে কুমারী পূজা শুধু মহাষ্টমীতেই হয়, এমন নয়। পূজাপদ্ধতি ও আঞ্চলিক ঐতিহ্য অনুসারে অন্য তিথিতেও এই উপাসনা হতে পারে।
বেলুড় মঠের সরকারি বিবরণ অনুসারে, ১৯০১ সালে সেখানে প্রথম দুর্গাপূজার সময় স্বামী বিবেকানন্দ একাধিক কুমারীর পূজা করেছিলেন। বর্তমানে সেখানে একজন কুমারীকে পূজা করার রীতি প্রচলিত। বেলুড় মঠের ব্যাখ্যায় এই পূজার একটি উদ্দেশ্য ছিল নারীসত্তার মর্যাদা ও মাতৃত্বের পবিত্রতা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলা।
মহাষ্টমীতে দেবী দুর্গার আরাধনার সঙ্গে কুমারী পূজার সংযোগের মধ্যে একটি প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। দেবী দুর্গা যেমন অসুরবিনাশী শক্তির প্রতীক, তেমনি কুমারী জীবনের সম্ভাবনা, নিষ্কলুষতা ও সৃষ্টিশীল শক্তির প্রতীক। একটি শিশুর মধ্যে দেবীকে উপলব্ধি করার মধ্য দিয়ে ভক্তেরা জগতের প্রতিটি প্রাণের মধ্যে শক্তির উপস্থিতি অনুভব করতে চান।
তবে কুমারী পূজার সূচনা কোথায় ও কবে আজ খুঁজে বের করবো এই প্রশ্নের উত্তর –
কুমারী পূজা ঠিক কোন বছর, কোন স্থানে বা কোন ব্যক্তির উদ্যোগে প্রথম শুরু হয়েছিল, তার নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক কোন প্রমাণ নেই। তাই বেলুড় মঠকে এই পূজার আদি সূচনাস্থল বলা যায় না। তবে ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দের উদ্যোগে দুর্গাপূজা ও কুমারী পূজার আয়োজন একটি নথিভুক্ত ঐতিহাসিক ঘটনা।
অন্যদিকে, দেবীভাগবত পুরাণের তৃতীয় স্কন্ধের ছাব্বিশতম অধ্যায়ে কুমারী পূজার বিস্তারিত বিধান রয়েছে। এই বিবরণ থেকে বোঝা যায় যে কুমারী পূজা পুরাণসাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত একটি শাক্ত উপাসনা। তবে গ্রন্থটির এই অধ্যায়ের উল্লেখ থেকে পূজাটির প্রথম প্রচলনের নির্দিষ্ট সাল নির্ধারণ করা না গেলেও বলা যায় শাস্ত্রীয় মতেই এই পূজা হয়ে থাকে।
প্রচলিত রীতিতে পূজার আগে নির্বাচিত কন্যাকে পরিষ্কার পোশাক পরানো হয়। অনেক স্থানে তাকে লাল বা সাদা শাড়ি, ফুলের মালা, চন্দন ও আলতায় সাজানো হয়। এরপর সম্মানের সঙ্গে আসনে বসিয়ে পুরোহিত সংকল্প, ধ্যান, আবাহন ও উপচার নিবেদন করেন। ফুল, ধূপ, দীপ, ফল ও মিষ্টি নিবেদন করা হয়। পূজার শেষে আরতি, প্রণাম ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়। অঞ্চল ও সম্প্রদায়ভেদে আচারগুলির পার্থক্য থাকতে পারে।দেবীভাগবত পুরাণের তৃতীয় স্কন্ধের ছাব্বিশতম অধ্যায়ের ৪১ থেকে ৪৩ নম্বর শ্লোকে দুই থেকে দশ বছর বয়সী কন্যাদের বিভিন্ন নাম উল্লেখ করা হয়েছে। দুই বছরের কন্যাকে কুমারী, তিন বছরের কন্যাকে ত্রিমূর্তি, চার বছরের কন্যাকে কল্যাণী, পাঁচ বছরের কন্যাকে রোহিণী, ছয় বছরের কন্যাকে কালিকা, সাত বছরের কন্যাকে চণ্ডিকা, আট বছরের কন্যাকে শাম্ভবী, নয় বছরের কন্যাকে দুর্গা এবং দশ বছরের কন্যাকে সুভদ্রা বলা হয়েছে। এটি ওই পুরাণে বর্ণিত একটি বিধান; সব সম্প্রদায়ে একই বয়সের নিয়ম অনুসরণ করা হয় না।
কুমারী পূজায় ব্যবহৃত একটি ধ্যানমন্ত্রের পাঠ বিভিন্ন পূজাপদ্ধতিতে পাওয়া যায়:
“কুমারস্য চ তত্ত্বানি যা সৃজত্যপি লীলয়া।
কাদীনপি চ দেবাংস্তাং কুমারীং পূজয়াম্যহম্॥”
এর ভাবার্থ, যিনি লীলার মাধ্যমে দেবতাদের সৃষ্টির শক্তি ধারণ করেন, সেই কুমারী দেবীকে আমি পূজা করি। এই শ্লোকটি দেবীভাগবত পুরাণের তৃতীয় স্কন্ধের ছাব্বিশতম অধ্যায়ের ৫৩ নম্বর শ্লোকের বাংলা হরফে পাঠ। পূজার সময় মন্ত্রের শুদ্ধ পাঠ ও বিধান সংশ্লিষ্ট পুরোহিতের কাছ থেকে যাচাই করা উচিত।
আজ আমরা আরো জানবো কুমারী পূজার প্রকৃত মাহাত্ম্য
কুমারী পূজার সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো, নারীকে সম্মান করা এবং জীবনের মধ্যে দেবত্ব উপলব্ধি করা। যে সমাজ দেবীকে শক্তির আধার বলে পূজা করে, সেই সমাজের দায়িত্ব বাস্তবের কন্যাশিশুর শিক্ষা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
একটি শিশুকে দেবীর আসনে বসিয়ে পূজা করার পর বাস্তব জীবনে তাকে অবহেলা করা হলে সেই উপাসনার অন্তর্নিহিত শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। কুমারী পূজা তাই ভক্তির পাশাপাশি আত্মসমালোচনারও উপলক্ষ। আমরা যে মাতৃশক্তির কাছে আশীর্বাদ চাই, সেই শক্তির প্রতীক নারীদের প্রতিদিনের জীবনে কতটা সম্মান দিই, সে প্রশ্নও এই পূজা সামনে আনে।
মহাষ্টমীর ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ আর পুষ্পাঞ্জলির ভিড়ে কুমারী পূজা আমাদের মনে করিয়েিই দেয়, দেবীকে শ্রদ্ধা করার অর্থ তাঁর প্রতীককে সম্মান করা, তাঁর সৃষ্টিকে মর্যাদা দেওয়া এবং প্রতিটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা। এই উপলব্ধিই কুমারী পূজার ধর্মীয় মাহাত্ম্যকে মানবিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে।দেবীর আরাধনা পূর্ণতা পায় তখনই, যখন প্রতিটি কন্যার চোখে আমরা দেখি সম্ভাবনার আলো, হৃদয়ে অনুভব করি সৃষ্টির স্পন্দন। কুমারী পূজা তাই শাস্ত্রের সীমানা পেরিয়ে হয়ে উঠুক নারীশক্তির বন্দনা, মানবিকতার জাগরণ এবং সুন্দর পৃথিবী গড়ার পবিত্র অঙ্গীকার।







