বাংলাদেশ সচিবালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর অপব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ক্ষমতার নির্লজ্জ প্রদর্শনের এক নজিরবিহীন অধ্যায় রচিত হয়েছে বর্তমান কৃষি সচিব ডক্টর মোহাম্মদ এমদাদুল্লাহ মিয়ানের হাত ধরে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২০ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময় পর্যন্ত তিনি কীভাবে দুর্নীতির জাল বিস্তার করেছেন।
মুজিব শতবার্ষিকী:
শতকোটি টাকার লুটপাট (২০২০-২০২২):
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে এমদাদুল্লাহ মিয়ান ছিলেন এই প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের মূল নিয়ন্ত্রক।
ম্যুরাল কেলেঙ্কারী:
২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সারাদেশে ১০ হাজার মুজিব ম্যুরাল নির্মাণের জন্য প্রায় ৫০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিটি ম্যুরালে বাজারমূল্যের চেয়ে ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি দরপত্র গৃহীত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে ম্যুরাল দেখানো হলেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব মেলেনি।
সাংস্কৃতিক লুটতরাজ:
শিল্পীদের সম্মানী প্রদানের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি, অপ্রয়োজনীয় বিলাসবহুল ভেন্যু ভাড়া এবং নিম্নমানের বই ছাপিয়ে কয়েকশ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। প্রতিটি চুক্তিতে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ কমিশন গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
৪ আগস্টের ‘শান্তি মিছিল’ ও অবৈধ পদায়ন (২০২৪):
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্তে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে রাজপথে আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘শান্তি মিছিল’ করেন।
পুরস্কার হিসেবে পদোন্নতি:
ছাত্র হত্যার মদদদাতা ও স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও, ৫ আগস্টের পর এমদাদুল্লাহ মিয়ান ওই মিছিলে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের শাস্তির বদলে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও পদোন্নতি দিয়েছেন।
প্রতিহিংসার তাণ্ডব:
বিপরীত দিকে, যারা ওই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেননি বা নিরপেক্ষ ছিলেন, এমন প্রায় ৫০-১০০ জন দক্ষ কর্মকর্তাকে কোনো কারণ ছাড়াই সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড), প্রতিহিংসামূলক বদলি এবং পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও সার আমদানিতে দুর্নীতি (২০২৫):
২০২৫ সালের শেষার্ধ পর্যন্ত কৃষি সচিব হিসেবে তার ক্ষমতা অপব্যবহারের নতুন মাত্রা যোগ হয় সার ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে।
সার কেলেঙ্কারী:
মিশর ও চীন থেকে একই মানের ডিএপি ও টিএসপি সার ভিন্ন ভিন্ন উচ্চমূল্যে আমদানির কার্যাদেশ দিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যাপক অপচয় করা হয়েছে। সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে উচ্চমূল্যের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার মাধ্যমে বড় অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
যন্ত্রপাতি জালিয়াতি:
প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়ায় ২০২৫ সালের নভেম্বরে ৬০০ কোটি টাকার বরাদ্দ স্থগিত করতে হয়। প্রকল্পের ২৫ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলেও মূল হোতা হিসেবে মিয়ানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সহযোগীদের নেটওয়ার্ক ও প্রশাসনিক সিন্ডিকেট:
এমদাদুল্লাহ মিয়ান একা নন, বরং একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অপকর্ম চালিয়েছেন:
ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী: সাবেক প্রধান সচিব এবং শতবার্ষিকী কমিটির প্রধান সমন্বয়ক। মিয়ানের সকল দুর্নীতির মূল পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তাকে চিহ্নিত করা হয়।
আবু নাসের: শতবার্ষিকী কমিটির সাবেক আহ্বায়ক। বর্তমানে তিনি কারাগারে থাকলেও তার প্রধান সহযোগী এমদাদুল্লাহ মিয়ান এখনো সচিবালয়ে দাপট দেখাচ্ছেন।
লিয়াকত আলী লাকী ও আসাদুজ্জামান নূর:
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে অর্থ লোপাটের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক আচ্ছাদন প্রদান করেছেন।
গোপালগঞ্জ ও ঢাকা কেন্দ্রিক প্রটোকল:
টুঙ্গিপাড়া সফর ও স্থানীয় রাজনৈতিক আয়োজনের নামে সরকারি গেস্টহাউস ও যানবাহন ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা অপচয় করা হয়েছে।
আসন্ন নির্বাচন ও ২০ হাজার কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণ:
কৃষি সচিব হিসেবে এমদাদুল্লাহ মিয়ানের অধীনে বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ৪ হাজার বিসিএস ক্যাডারসহ প্রায় ২০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত।
নির্বাচনী হুমকি: আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই বিশাল বাহিনী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। একজন চিহ্নিত রাজনৈতিক অনুসারী সচিবের নিয়ন্ত্রণে এই বাহিনী থাকলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা রক্ষা করা অসম্ভব বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।
আইনি বিশ্লেষণ ও জনদাবি:
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমদাদুল্লাহ মিয়ানের কর্মকাণ্ড সরকারি চাকরি আচরণবিধি, দুর্নীতি দমন আইন এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ৪২০ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
দুদকের তদন্ত: ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি গাজীপুরে তার নিজ নামে একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি তহবিল থেকে ৫০ লক্ষ টাকা অবৈধভাবে বরাদ্দ নিয়েছেন।
এমদাদুল্লাহ মিয়ান শুধু একজন সচিব নন, বরং তিনি একটি পচনশীল প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতীক। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে তাকে অবিলম্বে অপসারণ করে বিচারের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।







