মোঃ আমজাদ হোসেন, ষ্টাফ রিপোর্টার: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি জমি এখন যেন প্রভাবশালী দখলদারদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে রেলের মূল্যবান জমি দখল করে অবৈধভাবে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষায় রেলওয়ের ভূমিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেলওয়ের বাণিজ্যিক লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোঃ সাইফুল ইসলাম রেলের জমিতে গোপনে ইট, রড ও সিমেন্ট দিয়ে একাধিক স্থায়ী কক্ষ নির্মাণ করছেন।
চারদিকে টিনের বেড়া দিয়ে আড়াল করে চালানো হচ্ছে নির্মাণকাজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে একটি বহুতল আবাসিক হোটেল গড়ে তোলার পরিকল্পনা চলছে, যার সঙ্গে আরও কয়েকজন অংশীদার জড়িত।
রেলওয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্সকৃত জমিতে কোনোভাবেই পাকা বা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি নেই। শুধুমাত্র অস্থায়ী কাঠ, বাঁশ বা টিনশেড স্থাপনা নির্মাণ করা যায়। অথচ সেই নিয়মকে প্রকাশ্যে অমান্য করেই চলছে এসব নির্মাণকাজ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ভবনে ব্যবহার করা হচ্ছে ইট, রড, সিমেন্টসহ স্থায়ী ভবন নির্মাণের সকল উপকরণ। একই স্থানে আগে থেকেই সাইফুল ইসলামের আরেকটি স্থায়ী বসতবাড়ি রয়েছে, যেখানে তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন বলেও জানা গেছে।
এ বিষয়ে স্টেশন মাস্টার নাজিমুদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, “রেলের জমিতে কে কী করছে, সেটা আমার আওতাধীন নয়।” পরে তিনি অভিযুক্ত সাইফুল ইসলামকে তার কক্ষে ডেকে আনেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে সাইফুল ইসলাম তার রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরে বলেন,
“আমাকে আওয়ামী লীগও কিছু করতে পারেনি, এখন তো অন্য হিসাব। আমি ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি, আমাকে এসব আইন দেখিয়ে লাভ নেই।”
তার এমন বক্তব্য স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন—রেলের জমিতে প্রকাশ্যে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ চললেও প্রশাসন কেন নীরব?
শুধু সাইফুল ইসলামই নন, একই এলাকায় আরও বেশ কয়েকজন ব্যক্তি রেলের জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এভারগ্রীন স্কুল সংলগ্ন এলাকায় জামাল নামের এক ব্যক্তি স্থায়ী ভবন নির্মাণ করছেন। এছাড়া কলেজ রোড গেইট ব্যারিয়ারের পাশে বাচ্চু নামের এক ব্যক্তি অবৈধ দোকান নির্মাণ করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই দোকানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে গোপনে মোটা অঙ্কের লেনদেন হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে রেলের জমি দখল এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পুরো এলাকা দখলমুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে রেলওয়ের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (পূর্বাঞ্চল) বলেন, “বাণিজ্যিক লাইসেন্সের নামে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ। অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ, লাইসেন্স বাতিল এবং জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় রেলের কোটি কোটি টাকার সম্পদ একের পর এক প্রভাবশালীদের হাতে চলে যাবে।







