রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এর চার খলিফা একজন হলেন মোহাম্মদ নূর-ই খোদা, নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শাখার চলতি (দায়িত্বে) নিয়োজিত আছেন।
রাজউকের এ খলিফা নূর-ই খোদার কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন কয়েক বছরের ব্যবধানে। বাড়ী, গাড়ী, ফ্ল্যাট, নালজমি, কারখানা, দোকান কোন কিছুরই কোন অভাব নেই এই কর্মকর্তার। এ যেন আলাদীনের চেরাগ পাওয়ার মতো। জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানা গঙ্গাপাড়া গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান নূর ই খোদা। এখন থানার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। এলাকায় বসবাসের জন্য কয়েকটি ভবন, একাধিক রাইস মিল প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। ২০০৪ সালের ৩ নভেম্বর সহকারী নগর পরিকল্পনাবিধ হিসেবে রাজউকের যোগদান করেন তিনি। দীর্ঘ ২১ বছর চাকুরী করে তিনি কামিয়েছেন কয়েকশ কোটি টাকা। রাজউক কর্মকর্তা কর্মচারীরা তাকে রাজউকের প্রধান খলিফা হিসেবে চিনেন। ড্যাবের প্ল্যানপাস ছাড়পত্র প্রদানের একমাত্র ক্ষমতা তার হাতে। তার স্বাক্ষর ছাড়া ড্যাবের কোন প্ল্যান পাস করা সম্ভব না। ভবনের তালার মাপ অনুসারে তার ঘুষের মত্রাও ওঠা নামা করে। ১ থেকে ৬ তলা ভবনের প্ল্যান পাস করতে তাকে ঘুষ দিতে হয় ১০ লাখ টাকা। ৬ থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ভবনের ঘুষ দিতে হয় ২০ লাখ টাকা। তার উর্ধ্বে ২০ তলা ভবন পর্যন্ত প্ল্যান পাস করতে দিতে হয় ৪০-৫০ লাখ টাকা। এটা অবিশ্বাস হলেও সত্য। বর্তমান রাজউকের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম রিজু কে ম্যানেজ করে তিনি এই অবৈধ কর্মকান্ড করে আসছেন। ঢাকা শহর সহ আশ পাশের সাভার আশুলিয়া কেরানীগঞ্জসহ অন্যান্য হাউজিং কোম্পানীর ভবনের ছাড়পত্র তার স্বাক্ষর ছাড়া হয় না। ঢাকা সাভার এলাকার যতগুলো হাউজিং কোম্পানী আছে সবগুলোই নূর-ই খোদার সাথে সম্পর্ক রেখে তারা কাজ করছে। বছরে শত শত কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা নূর-ই খোদা। তার নানা অপকর্ম একাধিক পত্রিকায় সচিত্র প্রতিবেদন হওয়ার পরও চেয়ারম্যানের আর্শিবাদে তিনি এত বড় বড় অপকর্ম করতে সাহস পেয়েছেন। সূত্র জানায় এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা নূর-ই খোদার ঢাকা উত্তরা এলাকায় রয়েছে ৮ তলা বিশিষ্ট ৬ ইউনিটের একটি বিলাশবহুল ফ্ল্যাট বাড়ী রয়েছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য ৫০ কোটি টাকার উপরে। ঢাকা জেলা সাভার আশুলিয়ায় এলাকায় রয়েছে শত শত বিঘা জমি। কমপক্ষে ২০টি ফ্ল্যাট ১৫টি প্লোট এছাড়াও স্ত্রী সন্তানের নামে রয়েছে অঢেল সম্পত্তি। গত ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ইং ধানমন্ডি হাজারীবাগ এলাকার বাসিন্দা জাবেদ শেখ নামে এক ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবর এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ নূরু-ই খোদার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রিয়াজুল ইসলাম তার অপরাধগুলো আমলে আনছেন না। রহস্যজনক কারণে এই কর্মকর্তা কোন না কোন ভাবে রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন। বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলেও তিনি দাপটের সাথে দুর্নীতি করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের এক কর্মকর্তা জানান, নগর পরিকল্পনাবিদ নূর-ই খোদার সম্পদের পাহাড় রয়েছে। রাইস মিল, বাড়ি গাড়ী, প্লট, দোকানসহ শত শত কোটি টাকার মালিক।
অফিসের আরেক কর্মকর্তা জানান, নূর-ই খোদা একটি সিন্ডিকেট গড়ে অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন ঘুষ বাণিজ্য। ফাইল আটকে রেখে নকশার অনুমোদন না দিয়ে ঘুষের দর কষাকষি করে থাকেন। হাউজিং কোম্পানীগুলোর থেকে নকশা অনুমোদনের নামে প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। রাজউকে তাকে খলিফা নামেই চিনেন।
রাজউকের আরো কর্মকর্তা জানান, রাজউকের কয়েকজন দুর্নীতিবাজদের কারণে গোটা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। যারা বড় বড় দুর্নীতি করে কোটি হাতিয়ে নিচ্ছেন, তাদের অন্যতম নূর-ই খোদা। তিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় যেভাবে সুবিধা নিয়েছেন, বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও তিনি একইভাবে সুবিধা ভোগ করতেছেন। এই কর্মকর্তার কাছে কোন রাজনৈতিক দল নেই। তিনি যেভাবে পারছেন, সেভাবেই লুটেপুটে খাচ্ছেন।
এই বিষয়ে নূর-ই-খোদার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি উত্তেজিত হয়ে জানান, “আমার সম্পদ থাকলে তা আপনি নিয়ে নেন। আর হাউজিং কোম্পানির সাথে ঘুষ বাণিজ্যের কথা তিনি অস্বীকার করেন”।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ নূর ই খোদা একজন সরকারী কর্মকর্তা হয়ে আইন বহির্ভূত অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন করেছেন। নামে বেনামে এসব সম্পদ আত্মীয়-স্বজন ও পরিবার পরিজনদের মাধ্যমে পরিচালনা করে আসছেন। কোটি কোটি টাকার এসব প্রতিষ্ঠান ও সম্পদ থেকে ব্যাট ট্যাক্স থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং চাকরিবি ধি অমান্য করে সরকারের চোখে ফাঁকি দিয়ে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হোল্ডার, আত্মীয়স্বজনের নামে নগদ টাকা ও জমি। তার আত্মীয় আলমগীর, শাকিল ও জামিল এসব সম্পদ অর্থের রক্ষণাবেক্ষণের সহযোগী বলে জানা গেছে। স্ত্রীর নামে রয়েছে একটি ইটের ভাটা। সাভারে আছে দুধের কারখানা, ইসলামপুরে ফুট প্রসেসিং এবং নারায়ণগঞ্জে ওয়াশিং প্ল্যান্ট, দেওয়ানগঞ্জ রাইস ফ্যাক্টরি সহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। এছাড়াও রাজধানী সহ বিভিন্ন স্থানে তার রয়েছে প্লট ফ্ল্যাট ও ফসলি জমি।
তার গোপন রাখা অবৈধ সম্পদের পুরো গল্প জানেন এ্যাকাউন্ট অফিসার রাজিব। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে তার মুঠোফোনের একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি মুঠোফোনে খোদ খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোন উত্তর দেননি।
প্রসঙ্গত, রাজউকের দুর্নীতি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রাজউকের নকশা অনুমোদনে ঘুষের পরিমাণ ২ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত হয়। ভবন পরিদর্শকদের কাছে অননুমোদিত পেমেন্টের পরিমাণ ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা এবং জমি পরিষ্কারকরণে অননুমোদিত পেমেন্টের পরিমাণ ব্যক্তিগত পরিষেবাগ্রাহীদের জন্য ১৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর জন্য ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত। এই গবেষণা ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়।
এছাড়াও রাজউকের দুর্নীতি নিয়ে দুদক ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি গণশুনানি করে। দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) নাসিরউদ্দীন আহমেদ বলেন, সরকারি সেবা পাওয়া নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সরকারি সেবা ও সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই দুদক এ উদ্যোগ নিয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনিয়মের মাধ্যমে প্লট পরিবর্তন, প্লটের আয়তন বৃদ্ধি, একই ব্যক্তিকে একাধিক প্লট দেওয়া, প্লট বাতিল করা প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত চিত্র। অধিগ্রহণ করা প্রকল্পে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তকে প্লট না দিয়ে আত্মসাৎ, গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করে দেওয়ার মতো ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। ঘুষ ছাড়া নকশা পাস না করা, আমমোক্তার, সেল পারমিশন, লিজ ডিড সম্পাদন ও দখল বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম, বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে রাজউকের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সম্পৃক্ততার বিশদ তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
সম্প্রতি রাজউকের দুর্নীতি নিয়ে দুদক আরও কঠোর হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রুপায়ন হাউজিং এস্টেট লিমিটেড এবং রাজউকের ৪৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, রাজউকের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী জমির মালিকানা, খতিয়ান রেকর্ড, প্লটের বিবরণ বা আদালতের নিষেধাজ্ঞা যাচাই না করেই অবৈধভাবে অনুমোদন দিয়েছেন। এছাড়াও ২০২৫ সালের আগস্টে রাজউকের প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, তুলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক সহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
রাজউকের দুর্নীতি নিয়ে গণমাধ্যমে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজউকের সেবা অনলাইন করা হলেও ঘুষ, দুর্নীতি ও জনদুর্ভোগ কমেনি। নকশা অনুমোদনে ৫ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। রাজউক ২০২২ সালে ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটিং সিস্টেম (ইসিপিএস) চালু করলেও তা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অনলাইনে নকশা জমা দিলে তা ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়, কিন্তু কারণ জানানো হয় না। পরে সংশ্লিষ্ট অফিসে গেলে ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়।
এই প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, রাজউকের সেবা খুবই জটিল। রাজউকের নাম শুনলেই মানুষ আতঙ্কিত হয়। এখানে একটি সেবার জন্য অসংখ্য জায়গায় অসংখ্য প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। যা চাইলেই সহজ করা যেত।
রাজউকের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) বলেন, তিনি গত সেপ্টেম্বরে এখানে আসেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন। তার আসার পর ৪৮ জন কর্মকর্তাকে দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়েছে। আরও অনেক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। ১৮ জনকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। এটি একটি বড় পদক্ষেপ। রাজউকের সম্পূর্ণ সেবা অনলাইনে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। নকশা অনুমোদন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ আছে। শিগগিরই তা চালু হবে। একবার অনলাইনে চলে গেলে সেবাও সহজ হবে। এবং এখন কোনো অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।







