, ,

মহালয়ার আগমনী সুর থেকে দুর্গোৎসবের মহামিলন: বাঙালির প্রাণের উৎসব

নিউজটি শেয়ার করুন

শরৎ এলেই বাংলার প্রকৃতি যেন নতুন করে সেজে ওঠে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীর চরে কাশফুলের দোলা,

ভোরের শিশিরভেজা শিউলি আর বাতাসে উৎসবের মৃদু গন্ধ—সব মিলিয়ে বাঙালির মনে জেগে ওঠে এক চিরচেনা আনন্দ। এই আনন্দের সূচনা মহালয়ার আগমনী সুরে, আর তার পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটে শারদোৎসবের দিনগুলিতে। মহালয়া ও দুর্গোৎসব তাই শুধু একটি ধর্মীয় পরম্পরার নাম নয়; এ হলো বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও সম্মিলিত আবেগের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
মহালয়ার ভোর বাঙালির কাছে এক বিশেষ অনুভূতির নাম। চারপাশ যখন অন্ধকারে আচ্ছন্ন, তখন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গম্ভীর কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ ও ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সুর ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। সেই পরিচিত কণ্ঠ, স্তোত্রের ধ্বনি এবং আগমনী গানের আবেশে মনে হয়, মা দুর্গার আগমনবার্তা পৌঁছে গেছে বাংলার প্রতিটি প্রান্তে। বয়সের ব্যবধান ভুলে অসংখ্য মানুষ একই আবেগে এই প্রভাতকে বরণ করে নেন। এ যেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে চলা বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
মহালয়া আমাদের শুধু উৎসবের কথা বলে না, স্মরণ করিয়ে দেয় অতীতের প্রতিও দায়িত্বের কথা। পিতৃপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ, প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ এবং শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা—এই দিনের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে জীবনের গভীর উপলব্ধি। মানুষ একা নয়; তার বর্তমানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের শ্রম, ত্যাগ ও ভালোবাসা। মহালয়া সেই ঋণ স্বীকারের পাশাপাশি নতুন দিনের জন্য মনকে প্রস্তুত করারও উপলক্ষ।
এরপর আসে দুর্গোৎসবের বহুমাত্রিক আনন্দ। ষষ্ঠীর বোধনে উৎসবের দ্বার উন্মুক্ত হয়, সপ্তমী ও অষ্টমীর পূজায় মণ্ডপে মণ্ডপে জমে ওঠে ভক্তি ও উৎসাহ, নবমীর আনন্দে মুখরিত হয় চারপাশ, আর বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আসে বিদায় ও পুনরাগমনের প্রতিশ্রুতি। ঢাকের তালে, কাঁসর-ঘণ্টার ধ্বনিতে, ধূপের সুবাসে এবং আলোকসজ্জার বর্ণিলতায় বাংলার জনপদ যেন এক বিশাল আনন্দমঞ্চে পরিণত হয়।
দুর্গাপূজার পৌরাণিক কাহিনি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের কথা বলে। দেবী দুর্গার আবির্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মানবজীবনের চিরন্তন কর্তব্য। এই তাৎপর্যকে কেবল পৌরাণিক আখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বর্তমান সমাজেও হিংসা, বৈষম্য, দুর্নীতি ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে মানবিক বিবেককে জাগ্রত করা জরুরি। উৎসবের অন্তর্নিহিত শিক্ষা তখনই সার্থক হবে, যখন তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও ন্যায় ও কল্যাণের চর্চায় অনুপ্রাণিত করবে।
বাঙালির শারদোৎসবের আরেকটি বড় পরিচয় তার সামাজিক ব্যাপ্তি। পূজামণ্ডপ হয়ে ওঠে মানুষের মিলনক্ষেত্র। ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে বন্ধু, প্রতিবেশী ও স্বজনেরা একে অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন। নতুন পোশাক, মণ্ডপ পরিদর্শন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিল্পের নান্দনিক প্রকাশ এবং শুভেচ্ছা বিনিময়—সবকিছু মিলিয়ে দুর্গোৎসব বাঙালির সামাজিক জীবনে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে। উৎসবের এই সম্মিলিত চরিত্রই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয়ের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো তার মানবিকতা।
তাই মহালয়া ও শারদোৎসবের আনন্দকে সম্প্রীতির বন্ধনে আরও দৃঢ় করা প্রয়োজন। ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিক মূল্যবোধ সবার—এই বোধ আমাদের সমাজকে আরও উদার ও সহনশীল করে তুলতে পারে। কোনো মানুষ যেন ধর্ম, পরিচয় কিংবা আর্থিক অবস্থার কারণে উৎসবের আনন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন না থাকেন। অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলার মধ্য দিয়েই উৎসব হয়ে উঠতে পারে সত্যিকার অর্থে মানুষের উৎসব।
আজকের ব্যস্ত ও পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে উৎসবের বাহ্যিক আয়োজন ক্রমশ বর্ণিল হচ্ছে। কিন্তু জাঁকজমকের পাশাপাশি প্রয়োজন অন্তরের আলো। পরিবেশবান্ধব আয়োজন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের চর্চা উৎসবকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে। ঐতিহ্যকে ধারণ করার অর্থ শুধু পুরোনো রীতিকে অনুসরণ করা নয়; তার মানবিক ও কল্যাণকর চেতনাকে সময়ের উপযোগী করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
মহালয়ার আগমনী সুর আমাদের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে স্মৃতি, শ্রদ্ধা ও প্রত্যাশা। আর শারদোৎসব সেই প্রত্যাশাকে রূপ দেয় আনন্দ, মিলন ও সম্প্রীতির উৎসবে। একদিকে অতীতের প্রতি কৃতজ্ঞতা, অন্যদিকে বর্তমানের আনন্দ এবং ভবিষ্যতের জন্য শুভকামনা—এই তিনের মেলবন্ধনেই মহালয়া থেকে দুর্গোৎসবের যাত্রা বাঙালির কাছে এত আপন, এত আবেগময়।
আসুন, মহালয়ার পবিত্র প্রভাতে আমরা শুভবুদ্ধি ও মানবিকতার চর্চায় নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হই। শারদোৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি ঘরে, সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হোক মানুষের সঙ্গে মানুষের, আর অশুভ ও অমানবিকতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হোক সত্য, ন্যায়, ভালোবাসা ও শান্তি।
শুভ মহালয়া। সবাইকে শারদোৎসবের আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সম্পাদক)