, ,

মরমি গানের উৎসমুখ গোলাম হুসনের গান

নিউজটি শেয়ার করুন

মরমি গান বাংলা সংঙ্গীতের একটি স্বতন্ত্র ধারা। এর উৎপত্তিকাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে এতদিন মতভেদ ছিল। সাম্প্রতিক এক আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে তা সুরাহা হয়েছে।

১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার লস্করপুর গ্রামের গোলাম হুসন লেখেন মরমি গানের আদি পাণ্ডুলিপি ‘তালিব হুসন’। সে বছর জন্ম হয় আরেক মরমি সাধক লালন শাহের। দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার পর তা ইংল্যান্ড ভ্রমণ কালে উদ্ধার করেন সিলেটি নাগরীবিদ ও গবেষক মোস্তফা সেলিম।
তালিব হুসন গ্রন্থটি সরাসরি এখানে উপস্থাপিত হয়নি। পাণ্ডুলিপি থেকে ৪১ টি গান মোস্তফা সেলিম উপস্থাপন করেছেন মরমি গানের উৎসব মুখ গোলাম হোসেনের গান গ্রন্থে। তিনি বিস্তারিত টিকাভাষ্য প্রণয়ন করে এটি যে মরমি গানের আদি পাণ্ডুলিপি সেটা প্রমাণ করেছেন।
সম্প্রতি মোস্তফা সেলিম প্রণীত গ্রন্থ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আদি পাণ্ডুলিপি সিলেটি নাগরীলিপিতে লেখা। আলোচ্য গ্রন্থে বাংলায় গানের উচ্চারণ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সংযুক্ত করা হয়েছে। সিলেটি নাগরীলিপির উৎপত্তিকাল নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। তবে প্রচলিত ও প্রামাণ্য মতগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি মোটামুটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়। যেমন ;

১. সিলেটি নাগরী লিপির উৎপত্তি ও কারণ:

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, চতুর্দশ শতকের প্রথম দিকে সিলেটি নাগরী লিপির উদ্ভব ঘটে। আরবি, কাইথি, বাংলা ও দেবনাগরী লিপির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণে এটি গড়ে ওঠে।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় চতুর্দশ শতককে নাগরী লিপির প্রচলনের সময় বলে মত দিয়েছেন।

আরেকটি মত অনুযায়ী, আফগান-পাঠানদের মাধ্যমে বা তাঁদের প্রভাবে এর বিকাশ ঘটে।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, স্থানীয় মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার প্রয়োজন থেকেই সহজতর এই লিপির বিকাশ ঘটে।

অর্থাৎ, চতুর্দশ শতককে সম্ভাব্য সূচনাকাল হিসেবে ধরা যায়, কিন্তু লিপিটির বর্তমান রূপ একদিনে সৃষ্টি হয়নি—দীর্ঘ সময় ধরে বিবর্তিত হয়েছে।

২. পুথিসাহিত্যের বিকাশ:

নাগরী লিপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার ছিল পুঁথি রচনায়। ধর্মীয় কাহিনি, নবী-রাসুলের জীবন, কারবালার ইতিহাস, সুফিবাদ, প্রেমকাহিনি, নীতিশিক্ষা ও লোকজ আধ্যাত্মিকতার বিষয় নিয়ে অসংখ্য পুথি লেখা হয়। এ লিপিতে মানুষ বিক্রয়ের দলিলও আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্য ও ভূ-রাজনৈতিক বর্ণনা তাতে অনুপস্থিত। তাই এটাকে পুরো সিলেটের মাটি ও মানুষের লিপি দাবি করা যায় না। সুফি এবং স্বল্পশিক্ষিত মুসলমানদের জন্য এ লিপি তৈরি করা হয়। যা আড়াই দিনে শিখা যেতো। সিলেটি উপভাষাকে সিলেটি নাগরীলিপির গ্রন্থে ব্যবহার করা হলেও এটা সর্বজনীন নয়।

প্রাচীনতম সংরক্ষিত নিদর্শন হিসেবে গোলাম হুসনের ‘তালিব হুসন’ (১৭৭৪)-কে উল্লেখ করা হয়। সিলেটি
নাগরীলিপিতে কালক্রমে পুথির একটি সমৃদ্ধ ধারার সৃষ্টি হয়। উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ফাজিল নাসিম মুহাম্মদ — রাগনামা, সৈয়দ শাহ নূর — নূর নসিহত, সাত কন্যার বাখান, শাহ হুসন আলম — ভেদসার, শীতালং শাহ — মুশকিল তরাণ, হাশর তরাণ, রাগবাউল প্রভৃতি।
নসিম আলী — হরুফুল খাসলত, মুন্সী সাদেক আলী — হালতুন্নবী, মহব্বতনামা, হাশর মিছিল, রদ্দে কুফর, মুন্সী আসিদ আলী(জুড়ী) – মহিউসসুন্নত আলামতে কিয়ামত প্রভৃতি।

৩. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মরমি গানের পুঁথিকার:

গোলাম হুসন রচিত পাণ্ডুলিপি তালিব হুসন আবিষ্কারের পর প্রমাণিত হয়েছে বাংলা লোকসংস্কৃতির অঙ্গনে তাই সেরা। তবে
নাগরী পুঁথিসাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ কবি মুন্সী সাদেক আলী। তিনিও কুলাউড়ার সাহিত্যিক বা পুথিকার। তাঁর হালতুন্নবী নাগরী পুথির সবচেয়ে প্রসিদ্ধ রচনাগুলোর একটি। উনিশ শতকে এটি সিলেট অঞ্চলের মুসলিম পরিবারগুলোতে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাগরী পুঁথির অন্তত ৫৬ জন রচয়িতার পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে মুন্সী ইরপান আলী, দৈখুরা মুন্সী, আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী, আমান উল্যা, ওয়াজি উল্যা, শাহ হরমুজ আলী ও হাজী ইয়াছিন উল্লেখযোগ্য।

৪. উনিশ শতকে নাগরী সাহিত্যের নবজাগরণ:

নাগরী পুথির ইতিহাসে মুন্সী আবদুল করিম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি লন্ডনে গিয়ে মুদ্রণবিদ্যা শিখে দেশে ফিরে আনুমানিক ১৮৬০ সালে সিলেটে ইসলামিয়া ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং নাগরী হরফের কাঠের টাইপ তৈরি করেন। এর ফলে হাতে লেখা পুঁথির পাশাপাশি নাগরী পুঁথি ব্যাপকভাবে মুদ্রিত ও প্রচারিত হতে থাকে।
এই পর্যায়কে নাগরী সাহিত্যের মুদ্রণযুগের সূচনা বলা যায়।

৫. নাগরী পুথির ভাষা:

নাগরী পুথির ভাষা মূলত দোভাষী বাংলা বা মুসলমানি বাংলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। এতে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার ছিল প্রচুর এবং সংস্কৃতঘেঁষা তৎসম শব্দ তুলনামূলকভাবে কম। পুঁথিগুলো সাধারণত পদ্যরীতিতে লেখা হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে গান বা সুর করে পাঠের উপযোগী ছিল।

সংক্ষেপে সময়রেখা:
নাগরীলিপির প্রচলন হয় চতুর্দশ শতকে। গোলাম হুসনের তালিব হুসন—প্রাচীনতম সংরক্ষিত নিদর্শন হিসেবে উল্লেখযোগ্য। নাগরী ছাপাখানার সূচনা উনিশ শতকের শেষভাগে হলেও নাগরী পুথির মুদ্রণ ও জনপ্রিয়তার শীর্ষকাল হলো বিশ শতক। তবে
বাংলা লিপির প্রসারের সঙ্গে নাগরী লিপির ব্যবহার দ্রুত কমে যায়।
সুতরাং বলা যায়, সিলেটি নাগরী শুধু একটি লিপি নয়—বরং এটি একসময় ছিল সিলেটের মুসলমান সমাজের ধর্মীয়, লোকজ ও আধ্যাত্মিক সাহিত্যচর্চাকে ধারণ করে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র সাহিত্য-সংস্কৃতি। এর পুথিকারদের মধ্যে সাদেক আলী সর্বাধিক খ্যাতিমান। তবে আগেই বলেছি গোলাম হুসনের তালিব হুসন প্রাচীনতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর আদিতম সৃজন। গানগুলোর ধরণ ২ভাগে ভাগ করা যায়। তার একভাগে রয়েছে গীতিকা এবং অন্য ভাগে নিরেট গান। প্রাচীন কাল থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত গীতিকাগুলো গান হিসেবেই গাওয়া হতো। বিজ্ঞান যুগে এসেও বড় বড় কবিদের কবিতাকে গানে রূপান্তর হতে আমরা দেখতে পাই। নাগরীলিপিতে বই পুস্তক রচনা শুরুর ৮৬ বছর আগে রচিত এ পাণ্ডুলিপি তখন ছাপার অক্ষর পায়নি। তবে পরবর্তীকালে খণ্ডিত ভাবে তালিব হুসন প্রকাশিত হয়। গবেষক মোস্তফা সেলিম ইংল্যান্ড থেকে আদি পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করলেও তালিব হুসনের অন্য একটি খণ্ড বৃটিশ মিউজিয়ামে রয়েছে। এই খণ্ডের জেরক্স ছাড়াও আরেকটি খণ্ড তার হাতে আসে। উল্লেখিত দু’টি খণ্ড এবং পাণ্ডুলিপি এই তিনটিকে সমন্বয় করে নিজস্ব গবেষণা ও মতামত যুক্ত করে তিনি লেখেন ‘মরমি গানের উৎসমুখ গোলাম হুসনের গান।’ তাঁর গবেষণা পাশে বসে অবলোকন ও মতামত দেওয়ার সুযোগ আমার এবং গবেষক হাসান রাউাফুনের জীবনে ঘটে। ভূমিকায় যা স্বীকার করেছেন গ্রন্থকার মোস্তফা সেলিম।

গোলাম হুসনের গানের মাহাত্ম্যে ভিন্নতা রয়েছে ; তিনি দেহতত্ত্বকে এভাবে লেখেন :’আবের ত ঘর খাকের বন্ধন /তার মাঝে করে খেলা শাম নিরঞ্জন ‘অর্থাৎ মাটি দিয়ে ওয়াল দিয়ে পানিতে বাধি ঘর/ তার মধ্যেই শ্যাম নিরঞ্জনের খেলা ঘর। এর মাহাত্ম্য রয়েছে।
গোলাম হুসনের এই পঙ্‌ক্তিদ্বয়ের মাহাত্ম্য মূলত দেহতত্ত্ব, মরমিবাদ ও সৃষ্টিতত্ত্বের এক অসাধারণ সমন্বয়ে নিহিত।
“এই যে মাটি দিয়ে ওয়াল দিয়ে পানিতে বাঁধি ঘর,
তার মধ্যেই শ্যাম নিরঞ্জনের খেলা ঘর।”
এখানে ‘ঘর’ শুধু বসতবাড়ি নয়—এটি মানুষের দেহের রূপক। মাটি দিয়ে তৈরি দেহ, চারদিকে পানির মতো অনিত্যতার পরিবেশ—এই ক্ষণস্থায়ী দেহের মধ্যেই অবস্থান করছে বা লীলারত আছেন ‘শ্যাম নিরঞ্জন’, অর্থাৎ নিরাকার পরমসত্তা।
মাহাত্ম্যের কয়েকটি দিক:

১. মাটির ঘর = মানবদেহ:

মানবদেহ পঞ্চভূতের সমন্বয়ে গঠিত এবং শেষ পর্যন্ত মাটিতেই ফিরে যায়। তাই ‘মাটি দিয়ে ওয়াল দিয়ে’ কথাটি দেহের ক্ষণস্থায়িত্বের গভীর ইঙ্গিত বহন করে।

২. পানির মধ্যে ঘর = অনিত্য সংসার:

পানি এখানে পরিবর্তনশীলতা ও অনিশ্চয়তার প্রতীক। মানুষের জীবনও যেন পানির ওপর নির্মিত ঘর—কখন ভেঙে যায়, তার নিশ্চয়তা নেই।

৩. ঘরের ভেতরেই ‘শ্যাম নিরঞ্জন’:

এটাই পঙ্‌ক্তিটির সবচেয়ে গভীর দর্শন। মানুষ বাইরে ঈশ্বর, পরমসত্তা বা সত্যকে খুঁজে বেড়ায়; অথচ মরমি সাধনার বক্তব্য—যাকে বাইরে খুঁজছ, সে তোমার নিজের দেহ-ঘরের মধ্যেই।

৪. ‘শ্যাম’ ও ‘নিরঞ্জন’-এর অসাম্প্রদায়িকতা:

‘শ্যাম’ শব্দটি কৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত হলেও ‘নিরঞ্জন’ অর্থ কলঙ্কহীন, নিরাকার পরমসত্তা। ফলে এখানে বৈষ্ণব ভাবধারা, সুফি-মরমি দর্শন এবং লোকায়ত দেহতত্ত্বের মধ্যে এক ধরনের ভাবগত সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে।

৫. অসীমের বাস ক্ষুদ্রের মধ্যে:

একটি ক্ষুদ্র মানবদেহকে ‘খেলা ঘর’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ অসীম সত্তা সীমিত দেহে লীলারত—এই ভাবনাই গানটিকে সাধারণ লোকগানের সীমা ছাড়িয়ে দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে যায়।
সারকথা কথা হল; গোলাম হুসনের এই দুটি পঙ্‌ক্তির মাহাত্ম্য হলো—মাটির ক্ষণস্থায়ী দেহ-ঘরকে কেন্দ্র করে তিনি অনন্তের সন্ধান করেছেন। বাহিরের জগৎ নয়, মানুষের নিজের অস্তিত্বের মধ্যেই পরম সত্যের অবস্থান—এই উপলব্ধিই পঙ্‌ক্তিদ্বয়ের মরমি সৌন্দর্য। এ সৌন্দর্য মানুষকে তার স্বরূপ অন্বেষণে সাহায্য করে থাকে।এভাবে বাংলা মরমি গানের আদি ভূমি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া এবং আদি পাণ্ডুলিপি ‘ তালিব হুসন’ বাংলাদেশকে পথ দেখিয়ে চলেছে।