শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা ও মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দায়
শিক্ষককে সম্মান করা শুধু ভদ্রতা নয়, এটি একটি সভ্য জাতির ফরজ দায়িত্ব। যে সমাজ শিক্ষককে মাথায় তুলে রাখে, সেই সমাজই বিজ্ঞান, সাহিত্য, নৈতিকতায় এগিয়ে যায়। অথচ আজ আমরা দেখছি, সামান্য গুজব বা ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে শিক্ষককে রাস্তায় অপমান, লাঞ্ছনা ও শারীরিক হামলার শিকার হতে হচ্ছে। এই ঘটনা একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চক্রান্ত।
“মব” বা দলবদ্ধ উচ্ছৃঙ্খলতা কোনো প্রতিবাদ নয়। এটি সংবিধান, আইন ও আদালতকে পাশ কাটিয়ে নিজ হাতে বিচার তুলে নেওয়ার নাম। যখন ৫০-১০ জনের দল একজন শিক্ষককে জুতা পরিয়ে রাস্তায় হাঁটায়, ভিডিও করে ভাইরাল করে, তখন তারা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকেই চ্যালেঞ্জ করে। ভিড়ের আড়ালে অপরাধী লুকাতে পারে না। প্রত্যেকের আলাদা ফৌজদারি দায় থাকে।
এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে দুটি কাজ জরুরি।
প্রথমত, প্রতিরোধ। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে শিক্ষা বোর্ড, পুলিশ ও প্রশাসন ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যৌথ তদন্ত শুরু করবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত গণবিচার, অবরোধ বা হামলার সুযোগ দেওয়া যাবে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় উস্কানিমূলক কনটেন্ট ১ ঘণ্টার মধ্যে সরাতে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দৃষ্টান্তমূলক বিচার। যারা মব সংগঠিত করে, নেতৃত্ব দেয়, ভিডিও করে উস্কানি দেয়, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হবে। জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা এবং ৯০ দিনের মধ্যে রায় নিষ্পত্তির বিধান রাখতে হবে। শাস্তি এমন হতে হবে যেন পরবর্তীতে কেউ শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার আগে দশবার ভাবে।
অভিভাবক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক—সবার দায় আছে। অভিভাবক সন্তানকে শেখাবেন, মতের অমিল হলেও শিক্ষকের সঙ্গে বেয়াদবি করা যায় না। শিক্ষার্থী অভিযোগ লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানাবে, রাস্তায় নয়। সাংবাদিক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা সত্য যাচাই না করে কোনো ভিডিও ভাইরাল করবেন না।
আজ যদি আমরা শিক্ষকের অপমান চুপচাপ দেখি, কাল আমাদের সন্তানকে শেখানোর মতো কেউ থাকবে না। মব সৃষ্টি করে বিচার হাতে নেওয়া বীরত্ব নয়, কাপুরুষতা। শিক্ষককে রক্ষা করা, অপরাধীকে কাঠগড়ায় তোলা—এটাই সভ্য জাতির প্রধান কর্তব্য। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে: শিক্ষকের গায়ে হাত মানে রাষ্ট্রের গায়ে হাত। এর শাস্তি অনিবার্য।
লেখক:
মোঃ মাহবুবুল আলম







