, ,

বিসিআইসিতে ফ্যাসিবাদের ছায়া: বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ

নিউজটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) দেশের শিল্প ও সার খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।

দেশের অর্থনীতি, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা, যোগ্যতা ও কর্মনিষ্ঠার ভিত্তিতে কাজ করার পরিবেশ থাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় আনুগত্য এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নানা অভিযোগ বিসিআইসির অভ্যন্তরে আলোচিত হয়ে আসছে।

ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলেতো বটেই বর্তমান সরকারের সময়ও বিএনপি তথা জিয়ার মতাদর্শের কর্মকর্তাদের ছত্রভঙ্গ করতে প্রধান কার্যালয় থেকে বিএনপি মতাদর্শের কর্মকর্তাদের প্রধান কার্যালয় থেকে বদলী করার নীল নকশা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে। আর এই নীল নকশার পেছনে প্রত্যক্ষ কাজ করে যাচ্ছেন ফ্যাসিবাদের দোষর সংস্থাটির কর্মচারী প্রধান (সিওপি) আ.ন.ম শরীফুল আলম। ইতোমধ্যে ‘বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরামের’ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে প্রধান কার্যালয় হতে বদলী করে দেয়া হয়েছে। দাপ্তরিক কর্মকান্ডে তার কোন অন্যায় পাওয়া যায়নি। বিএনপি তথা জিয়ার আদর্শ ধারণই তার একমাত্র অপরাধ।

‘বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরাম’ গঠনের বৈধতা তদন্তের নামে সংগঠনটির নেতাদের হেনস্তা করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন ফোরামের নেতারা। তাদের দাবি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। এদের নেতৃত্বে রয়েছেন বিসিআইসির কর্মচারী প্রধান (সিওপি) আ ন ম শরীফুল আলম।

জানা গেছে, সংস্থাটির বিএনপিপন্থী কর্মীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরাম’ গঠনসংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বিসিআইসির যুগ্মসচিব ও পরিচালক (বাণিজ্যিক) মো. মনিরুজ্জামানকে। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন আইন উপবিভাগের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. সাজেদুল আলম। সদস্যসচিব হিসেবে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান হিসাবরক্ষক আবদুল্লাহ আল মামুন। খোঁজ নিয়ে জানা যায় এরা প্রত্যেক্যে সরকার বিরোধী মতাদর্শের কর্মকর্তা।

বিসিআইসির সিওপি আ ন ম শরীফুল আলমের ইন্ধনে এই কমিটি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন ফোরামের নেতারা। তাদের অভিযোগ, আওয়ামীপন্থী হয়েও কৌশলে জাতীয়তাবাদী এই ফোরামে যুক্ত হয়েছেন শরীফুল। এখন সেই ফোরামকেই তিনি ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছেন।

জানা গেছে, গত ২৩ জুন জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী বিসিআইসির কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই দিনই ‘বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরাম’-এর একটি প্রাথমিক কমিটি গঠন ও প্রকাশ করা হয়।

পরবর্তীতে ৩০ জুন বৃহৎ পরিসরে ওই কমিটির অফলাইন ও অনলাইনে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে প্রকাশিত কমিটির তালিকা যাচাই শেষে চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তাদের কার্যক্রম শেষে স্বাক্ষরিত মতামত উপস্থাপন করে। ওই মতামতের ভিত্তিতে গত ১ জুলাই বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরামের ৩৬ সদস্যের কমিটি চূড়ান্ত করা হয়।

ওই কমিটিতে জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরামের সহসভাপতি হিসেবে আ ন ম শরীফুল আলমের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই শরীফুল আলমই এই ফোরাম গঠনের বৈধতা রয়েছে কি না সে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উড়োচিঠি দেওয়ার নেপথ্যের কারিগর।

বিসিআইসির কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বিসিআইসির সিওপি শরীফুল আলম আওয়ামীপন্থী এবং সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও শিল্পমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সুপারিশে চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন।

তাদের দাবি, বিগত সরকারের আমলে ১৫ আগস্ট উপলক্ষে বিসিআইসির ‘হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ছিলেন শরীফুল আলম। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এরই অংশ হিসেবে তিনি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরামের প্রথম কমিটিতে স্থান না পাওয়ার পর কৌশলে কমিটির পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেন এবং পরবর্তী সময়ে ওই কমিটিতে সহসভাপতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।

ফোরামের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে বলেন, দীর্ঘদিন বিসিআইসিতে কাজ করার সুবাদে শরীফুল আলমসহ আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তা এখনো প্রভাব ধরে রাখতে বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দাবি, এবার জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরামের ভেতরে থেকেই সংগঠনটির গঠনপ্রক্রিয়াকে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, শরীফুল আলমের প্রভাবের কারণেই সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিয়ে ‘বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরাম’ গঠনের বৈধতা নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরামের নেতারা দাবি করেন, শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে, ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া একটি আবেদনে সংগঠনটির নেতারা অভিযোগ করেন, বিসিআইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিচয়বিহীন চিঠি এবং ভিত্তিহীন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অহেতুক হয়রানিমূলক তদন্ত কমিটি গঠন ও দাপ্তরিক আদেশ জারির মাধ্যমে সরকারি অফিসের ভাবমূর্তি ও কর্মপরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে।

এসব ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের কারণে সৎ, দক্ষ ও কর্মনিষ্ঠ কর্মকর্তারা অকারণে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন এবং মানসিক চাপের মুখে পড়ছেন, যা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলেও লিখিত আবেদনে উল্লেখ করেন ফোরামের নেতারা।

বেনামি অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত
জানা গেছে, ১৯৯৩ সালের ৫ আগস্ট জারি করা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক পরিপত্র অনুযায়ী—সুনির্দিষ্ট বিষয়, ঘটনা, সময়, স্থান, ব্যক্তির পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ বা দলিল ছাড়া কোনো বেনামি, নামবিহীন বা ঠিকানাবিহীন আবেদনপত্রের ভিত্তিতে তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।

ফোরামের নেতাদের অভিযোগ, ওই নির্দেশনা উপেক্ষা করে একটি উড়ো চিঠির ভিত্তিতে ‘বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরাম’ গঠনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিব্রত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল মতিন স্বাক্ষরিত এক পত্রে বিসিআইসির চেয়ারম্যানের কাছে এর প্রতিবাদ জানানো হয়। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

সরকারি পরিপত্রের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি বিধি-বিধান মেনে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কর্মবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। অজ্ঞাতনামা ও ভুয়া অভিযোগের ভিত্তিতে গঠিত যেকোন তদন্ত কমিটির দপ্তরাদেশ প্রত্যাহারেরও দাবি জানান তিনি।

অভিযোগের পরও শরীফুলের বিরুদ্ধে তদন্ত নেই
জাতীয়তাবাদী ফোরামের নেতারা আরও অভিযোগ করেন, বিসিআইসির কর্মচারী প্রধান শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, বিগত সরকারের আমলে অবৈধ নিয়োগ ও বদলি-বাণিজ্য এবং ভুয়া ভ্রমণ দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে তিনি নিজ জেলা কুড়িগ্রামে একটি বিলাসবহুল বাণিজ্যিক রিসোর্ট নির্মাণ করেছেন।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরাম।
সংগঠনটির অভিযোগ, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শরীফুল আলমের সম্পৃক্ততা ও অর্থসহায়তার বিষয় নিয়েও বিসিআইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। ফোরামের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে নিয়োগ ও বদলি, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী নিয়োগসংক্রান্ত আরও কিছু অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সংগঠনটির নেতাদের দাবি, তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব বিস্তার ও সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। রাজধানীর মিরপুরে একাধিক ফ্ল্যাট এবং ঢাকার গ্রিন মডেল টাউনে একাধিক প্লটের অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।শুধু নিজের নামে নয়, পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ স্বজনদের নামেও বিভিন্ন স্থানে জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন ফোরামের নেতারা। এসব সম্পদের উৎস, মালিকানা ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে শরীফুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব এবং বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন তদন্তেরও দাবি উঠেছে।

বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরামের পক্ষ থেকে বিসিআইসি চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে এসব দাবি জানানো হয়েছে। বিশেষ করে কেপিএমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ-বদলি নিয়ে ওঠা অভিযোগের নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে শরীফুল আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাতে সাড়া দেননি। আলোচনার বিষয় লিখে এসএমএস করলেও তার কোনো জবাব দেননি।