বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, স্ট্রোক হলো একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি (Medical Emergency) যা মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ ব্যাহত হওয়া বা রক্তনালী ফেটে যাওয়ার কারণে ঘটে থাকে। যখন মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তখন কোষগুলো প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি পায় না এবং মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে মারা যেতে শুরু করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে স্ট্রোকের প্রধান বিষয়গুলো নিচে সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো:
স্ট্রোকের প্রকারভেদ (Types of Stroke)
WHO এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে স্ট্রোক মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে:
1.ইস্কেমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke): এটি সবচেয়ে সাধারণ প্রকার (প্রায় ৮৫% ক্ষেত্রে এটি হয়)। মস্তিষ্কের রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে (Clot) রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে এটি ঘটে।
2.হেমোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke): এটি তুলনামূলক মারাত্মক। মস্তিষ্কের কোনো দুর্বল রক্তনালী ফেটে গিয়ে ভেতরে বা চারপাশে রক্তক্ষরণ হলে এই স্ট্রোক হয়।
স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণ (F.A.S.T Formula)
স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত চেনার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে FAST সূত্রটি ব্যবহার করা হয়:
F – Face Drooping (মুখ বেঁকে যাওয়া): হাসতে গেলে মুখের একপাশ বেঁকে যায় বা অবশ লাগে।
A – Arm Weakness (হাতে দুর্বলতা): হাত অবশ মনে হওয়া বা এক হাত সোজা করে তুলতে না পারা।
S – Speech Difficulty (কথা জড়িয়ে যাওয়া): কথা অস্পষ্ট হওয়া, কথা বলতে বা অন্যের কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া।
T – Time to Call (দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া): ওপরের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা মাত্রই সময় নষ্ট না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
স্ট্রোক রোগের চিকিৎসায় স্পিচ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপির ভূমিকা :
স্ট্রোক শুধু মানুষের চলাফেরার ক্ষমতাকেই প্রভাবিত করে না, অনেক ক্ষেত্রে কেড়ে নিতে পারে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা, অন্যের কথা বোঝা এবং খাবার গেলার ক্ষমতাও। ফলে একজন স্ট্রোক আক্রান্ত ব্যক্তিকে শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, স্ট্রোকের পর ভাষা ও কথা বলার সমস্যা, খাবার গিলতে অসুবিধা এবং স্মৃতিশক্তি ও অন্যান্য জ্ঞানীয় কার্যক্রমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্ট্রোক পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি এসব সমস্যার মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করে।
ভাষা ও যোগাযোগের সমস্যা :
স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর অ্যাফেসিয়া (Aphasia) দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় রোগী কথা বলতে, অন্যের কথা বুঝতে, পড়তে অথবা লিখতে সমস্যায় পড়েন। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট রোগীর সমস্যার ধরন ও সক্ষমতা মূল্যায়ন করে ভাষা ও যোগাযোগের দক্ষতা উন্নয়নে উপযুক্ত থেরাপি প্রদান করেন। এর মাধ্যমে রোগীর দৈনন্দিন যোগাযোগ ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়তে পারে।
মুখের পেশির নিয়ন্ত্রণ (Dysarthria & Apraxia Treatment): স্ট্রোকের কারণে জিহ্বা ঠোঁট ও মুখের পেশি দুর্বল হয়ে গেলে কথা অস্পষ্ট হয়। স্পিচ থেরাপি জিহ্বা ও ঠোঁটের থেরাপির মাধ্যমে উচ্চারণ স্পষ্ট করতে সাহায্য করে।
– খাবার গিলতে সাহায্য করা (Dysphagia Management): অনেক স্ট্রোক রোগীর খাবার বা পানি গিলতে কষ্ট হয়, যা ফুসফুসে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। থেরাপিস্ট নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কৌশল শিখিয়ে দেন।
জ্ঞানীয় বা কগনেটিভ থেরাপি (Cognitive-Linguistic Skills): মনোযোগ বাড়ানো, স্মৃতিশক্তি এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারেও এই থেরাপি কাজ করে।







