শিব ব্রত চক্রবর্ত্তী: পরশুরামে কয়েক যুগ ধরে অবৈধভাবে বেদখল হয়ে আছে রেলের বিপুল পরিমাণ জায়গা। ইতোমধ্যে অনেক জায়গা পুরোপুরি বেদখল হয়ে গেছে। কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রসাশনের নাকের ডগায় বসেই প্রভাবশালীরা এ দখল চালিয়ে যাচ্ছে। রেল লাইনের কোল ঘেঁষে কাঁচা-পাকা স্থাপনা এবং অবৈধ দোকান ও বস্তি বসিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। বিভিন্ন সময়ে ছোটবড় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও কার্যত: কোন সফলতা আসেনি। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় প্রভাবশালী ও পুলিশের অসাধু সিন্ডিকেট মাসোয়ারা নিয়ে স্থায়ীভাবে এ দখল টিকিয়ে রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এতে রেলের জমি থেকে প্রাপ্ত বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। উপজেলা বাসীর দাবি, রেলের জায়গা দখলকারীদের বিরুদ্ধে অচিরেই শক্তিশালী ও জোড়ালো অভিযান শুরু করবে প্রশাসন।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রায় দুই যুগেরও বেশি সযয় ফেনী-পরশুরাম রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। তথ্য রয়েছে একটা প্রভাবশালী মহল এসব জায়গা দখল করে নিয়ে বাণিজ্য করছে।পরশুরামের চিথলিয়া থেকে শুরু করে বিলোনীয়া পর্যন্ত বেশিরভাগ জায়গা ঘুরে রেল লাইনের দু’ধারে বস্তি, দোকানপাট পাকা এবং আধা-পাকা স্থাপনা বানিয়ে দখলের চিত্র দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যায়। প্রভাবশালীদের বাইরে রেলওয়ের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজসে এ দখল চলে। যার কারণে কখনো উচ্ছেদে গেলে আগে দখলদারদের কল করে জানিয়ে দেয় তারা। কিন্তু স্হানীয়রা জানায়, পরশুরামে রেল কতৃপক্ষ কখনো অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেনি।
বিলোনীয়া রেলস্টেশন সংলগ্ন টিনের ঘরে থাকা মনির জানান “জায়গাটি বাবা একজনের কাছ থেকে কিনেছেন। ” দশ বছর ধরে এখানে আছেন তবে তাদের কাছে কোন কাগজপত্র নেই। এর আগে কয়েকবার বলা হলেও তারা এই জায়গায় ঘর তুলে বসবাস করে আসছে। সেতারা , আবুল কালাম ও আজাদ বলেন ,তারা টাকা দিয়ে এই জায়গা কিনে নিয়েছেন তাই এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। কিন্তু এটা যে রেলের জায়গা , এখানে বসবাস করা বেআইনি বা একসময় এখান থেকে উচ্ছেদ করা হবে এটা মানতে নারাজ তারা।
বিলোনীয়া রেলওয়ে স্টেশনের কাছে এক পান দোকানী বলেন, টাকার বিনিময়ে রেল লাইনের পাশে দোকান ঘর নির্মাণ করে দোকান করার সুযোগ পেয়েছেন। একই সুরে কথা বলেন রেলওয়ের জায়গায় দোকান করা মুদি দোকানীর আবুল মনসুর, চা স্টলের মালিক হাবিবুর রহমান সহ অনেকেই।
একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায় রাজনৈতিক নেতারা ছাড়াও পুলিশ ও রেলের কর্মীরা সব দোকানদার এবং বসবাস করা লোকদের কাছ থেকে উঠানো টাকার ভাগ নিয়ে থাকেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র বলছে, সারা দেশে রেলওয়ের মালিকানাধীন জমি রয়েছে । তবে অধিকাংশ জায়গা বানিজ্যিক লাইসেন্সের মাধ্যমে ইজারা দেয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফেনী রেলওয়ে স্টেশনের এক কর্মকর্তা জানান, ফেনী পরশুরাম রেললাইন সংলগ্ন কিছু কিছু রেলের জমি ইজারা দেয়া হয়েছে শুধু খাতাকলমে শক্ত ডকুমেন্ট ছাড়া। বাকী জায়গাগুলো চলছে মৌখিক সমঝোতার মাধ্যমে।
অন্য একটি সুত্র জানায়, ফেনী থেকে পরশুরাম পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার রেললাইনের দুই পাশের সিংহ ভাগ জমি দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এ পথে ছোট-বড় বাজার ও দোকানের সংখ্যা প্রায় হাজারখানেক । এছাড়া হাজার হাজার বসতঘর,পাকাঘর , আধাপাকা ও টিনের ঘর তো আছেই। কোথাও জাল দলিল ও কাগজপত্র তৈরি করে আবাসন কোম্পানির ভবনও তোলা হয়েছে।
এইভাবেই ফেনী-পরশুরাম রেললাইনের দুই পাশের অনেক জায়গা দখল হয়ে গেছে। লাখো কোটি টাকার এসব জমি উদ্ধারে রেল যেমন ব্যর্থ হচ্ছে তেমনি বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
রেলের ফেনী অফিস সুত্র জানায়,১৯৭৬ সালে রেলওয়েতে পৃথকভাবে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার কার্যালয় করা হলেও জনবল অনেক কম। যার কারণে রেলের সম্পদের ওপরে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ওই সুত্র জানায় অনেক সময় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু পরে আবারও দখল হয়ে যায়। আগে সরকারি জায়গা দখল করার এত প্রবণতা ছিল না। কিন্তু এখন সেই প্রবণতা বেড়েই চলছে।
পরশুরামের বিশিষ্ট নাগরিকরা মনে করেন, রেলের জায়গা অবৈধভাবে দখলদারদের বিরুদ্ধে জোড়ালো অভিযান চালানো উচিত। তবে উচ্ছেদের সাথে দখলদারদের স্থায়ীভাবে প্রতিহত করা দরকার।
তাহলে এগুলো আর বেদখল হওয়ার সুযোগ থাকবে না।
অন্যদিকে সরজমিনে দেখা যায় ফেনী -পরশুরাম রেললাইনের বিশেষ করে বন্ধুয়া থেকে চিথলিয়া পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার জায়গায় লোহার পাত এবং স্লিপার নেই।এসব লোহার পাত ও স্লিপার চুরি করে নিয়ে গেছে সংঘবদ্ধ মাদকাসক্ত চোরেরা বলে জানায় স্হানীয়রা।






