শিব ব্রত চক্রবর্ত্তী: পরশুরাম উপজেলা পৌর ভূমি অফিসে দালালের রাজত্বের দৌরাত্ম্য কায়েম চরমে পৌঁছেছে। আর এতে উপ-সহকারী ভুমি কর্মকর্তা জিয়া উদ্দিনের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।ভূমিসংক্রান্ত সেবা নিতে এসে দালালের মাধ্যমে কাজ করাতে হচ্ছে-এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে সেবাপ্রার্থীরদের কাছ থেকে। সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সরকারি ফি ও নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত টাকা না দিলে ফাইলে হাত দেন না সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাই বাধ্য হয়ে চড়া দামে দালাল ধরতে হয় তাদের। দালালের মাধ্যমে দরদাম করে টাকা বুঝিয়ে দিলেই দ্রুত কাজ হয় যায় বলে জানান তারা।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরশুরাম পৌর ভূমি অফিস ঘিরে প্রায় এক ডজন ব্যক্তি নিয়মিত দালালি করে। ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, নামজারি, খারিজ, খতিয়ান, দাখিলা, জমির বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহসহ নানা কাজে এসব দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় সেবাপ্রত্যাশীদের।
জানা গেছে, উপজেলার পৌর ভুমি অফিসের আওতায় বেশকিছু খাস জমি রয়েছে। ওই খাস জমি ঘিরে ও রমরমা বাণিজ্য ভূমি অফিসে। খাস জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়া ও রশিদ কাটার নামে বেপরোয়া বাণিজ্য চলছে এ অফিসে। ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের জন্য সেবাপ্রার্থীরা এলে তাদের ২০ থেকে ৩০ বছরের বকেয়ার হিসাব দেওয়া হয়। পরে তাদের সঙ্গে দরদাম (চুক্তি) করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, টাকা নিয়ে দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার একটি খাজনার দাখিলা ধরিয়ে দেওয়া হয়- এমন অভিযোগ বিশ্বস্থ সুত্রের ।
এছাড়া জমিজমা বিরোধ নিয়ে আদালতের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দুই পক্ষ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই অফিসের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী দাবি করা কয়েকজনের ভাষ্যমতে সরাসরি ভূমি অফিসে গিয়ে সেবা নিতে গেলে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়। অথচ পরিচিত দালালের মাধ্যমে গেলে দ্রুত কাজ হওয়ার আশ্বাস মেলে। এ কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে দালালের শরণাপন্ন হন।
ভূমি অফিসে দালালনির্ভরতার অন্যতম কারণ হিসেবে স্থানীয় ভূমি-প্রক্রিয়া, সাধারণ মানুষের ভূমি আইন সম্পর্কে সীমিত ধারণা এবং অফিসে তথ্যপ্রাপ্তির অসুবিধার কথা বলছেন অনেকে। ফলে একটি শ্রেণি সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন।
একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে জানা যায় ,এই পৌর ভুমি অফিসসহ উপজেলা ভুমি অফিসে দালালিতে একচেটিয়া ক্ষমতা কায়েম করছে শহীদুল ইসলাম ভুট্টো,দলিল লিখক ইলিয়াস, পারভেজ , সেটেলমেন্ট অফিসের নকল নবীশ সাদ্দাম সহ আরো কয়েকজন।এরা নিয়মিত পৌর ভুমি অফিসে উপ-সহকারী ভুমি কর্মকর্তাসহ নিয়মিত আড্ডা দেয় এবং জমিসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে দালালি করে থাকে। এছাড়াও সেটেলমেন্ট অফিসের নকল নবিশ সাদ্দাম নিজে দালালি কাজে অংশগ্রহণ না করে এব্যাপারে তার ছোট ভাই কে নিয়োজিত করেছে। সাদ্দাম তার ছোট ভাইয়ের মারফতে ব্যাগে করে একবারে ২০/২৫, টি নথি অনুমোদনের জন্য ভুমি উপ-সহকারী অফিসে পাঠায়। ওই সাদ্দামের ছোট ভাই সেগুলো নিয়ে পৌর ভুমি অফিসের বাইরে অপেক্ষা করে। অফিসের লোকজন তার থেকে সেসব নথি বুঝে নিয়ে ভিতরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাইন সিল দিয়ে বাইরে এনে আবার বুঝিয়ে দেয় বলে জানায় ওই সুত্র।
এদিকে অন্য একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়,পরশুরাম ছয়ঘরিয়ায় টিএন্ডটি অফিসের পিছনে একটি খাস জমিতে সরকারী সম্পত্তি সাইনবোর্ড লাগানোর পর ও উপ-সহকারী ভুমি কর্মকর্তার যোগসাজশে সেখানে ব্যক্তিগত ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।
গুথুমা গ্রামের সেবাপ্রার্থী আরিফ বলেন, ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দালাল নিয়োগ করা হয়েছে। তারা দালালদের কাজ আগে করেন। এজন্য মানুষ দালাল ধরে। তিনিও ১১৭০ টাকার একটি জমাখারিজ ১০ হাজার টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে সম্পন্ন করেন বলে জানান। ওইসব
দালালদের দৌরাত্ম্য ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরশুরাম পৌর ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা জিয়া উদ্দিন বলেন, তিনি ব্যাপার টা দেখবেন।
পরশুরাম সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ শাফায়েত নুর বলেন, ওই ভূমি অফিসের অনিয়ম সম্পর্কে আমিও বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভুমি অফিসে দালালদের সীমাহীন দৌরাত্ম্য
দুর্নীতি, অনিয়ম আর ভোগান্তির সীমা নেই পরশুরাম উপজেলার সহকারী ভূমি কমিশনারের অফিস, তহশিল অফিস। ভুক্তভোগীরা সেবার পরিবর্তে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এসব অফিসে দালাল, উমেদার, টাউট-বাটপার আর তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে অনেকেই। এসব দালালরা এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে আঁতাত করেই টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না। টাকা না দিয়ে মাস এমনকি বছরের পর বছর ঘুরতে হচ্ছে ভুক্তভোগীদের। বিভিন্ন জরিপ, সংশোধন, তদন্তের নামেও মোটা অংকের টাকার দুর্নীতি হচ্ছে। জমা-খারিজ, নামজারি (মিউটেশন), নামজারি সংক্রান্ত বিভিন্ন সংশোধন, মূল দলিল, ভায়া দলিলের সার্টিফায়েড কপি, মিস কেস দায়ের, ভূমি কর পরিশোধ, রেকর্ড সংশোধন, আরএস, এসআর ও পর্চা কপি, এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ভুলভ্রান্তি সংশোধন, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি ওয়ারশিদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে দেয়া মূলত এসি (ল্যান্ড) অফিস ও স্থানীয় তহশিল অফিসের কাজ। উল্লিখিত কাজের সরকারি অফিসগুলোতে গড়ে উঠেছে কয়েক স্তরের দালাল আর টাউটচক্র।
এসব দালাল অনেক সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে আবার তাদের পরিচয় দিয়েও মাঝে মধ্যে প্রতারণা ও অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। যা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকতারাও জানেন না।
প্রসঙ্গত: দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছেন বর্তমান পরশুরাম উপজেলা সহকারী কমিশনার শাফায়েত নুর। তিনি যখন বাইরে অফিসিয়াল কাজে ব্যস্ত থাকেন সেই সময় দালালরা তাদের পরিকল্পনা মাফিক কাজ সেরে নেয়।সবাইকে এব্যাপারে উপজেলা ভূমি সহকারী কমিশনার শাফায়েত নুর কে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান উপস্থিত ভুমি সেবা প্রত্যাশীরা।







