, ,

নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক ডা. বদরুল আলমের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী সিন্ডিকেটের অভিযোগ

নিউজটি শেয়ার করুন

রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের যুগ্ম পরিচালক ডা. বদরুল আলম মণ্ডলের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতির সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিপুল অংকের অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দায়িত্বশীল ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বিগত সরকারের একজন শীর্ষস্থানীয় জনপ্রতিনিধির পারিবারিক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি হাসপাতালে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী ২০১৬ সালে তার অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও, উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক যোগসাজশে বারবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাগিয়ে নিয়ে তিনি প্রায় ১১ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ও তার ঘনিষ্ঠরা মিলে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে অনিয়মের একটি অঘোষিত বলয় গড়ে তোলেন। বিশেষ করে হাসপাতালের আউটসোর্সিং জনবলের একটি বড় অংশই তার নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি পুরো হাসপাতালের প্রশাসনিক ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নিজের কুক্ষিগত করে রেখেছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

তার বিরুদ্ধে ওঠা রাজনৈতিক প্রভাব ও বৈষম্যমূলক আচরণের বিষয়ে হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র চিকিৎসক বলেন, ডা. বদরুল আলম কেবল প্রশাসনিক অনিয়মই করেননি, বরং তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে চিকিৎসকদের একটি বড় অংশকে পেশাগতভাবে কোণঠাসা করে রেখেছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের বিতর্কিত কর্মসূচিতেও তার সম্মুখ সারিতে থাকার প্রমাণ রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি নতুন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করে এবং বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা ও উপঢৌকন দেওয়ার চেষ্টা করে নিজের পদ টিকিয়ে রাখার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। সাধারণ চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে তার এই অবৈধ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল এবং সব অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগটি উঠেছে হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। ব্রেন এবং স্পাইনের চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল গামা নাইফ নামক একটি রেডিও সার্জারি মেশিন ক্রয়ের ক্ষেত্রে তিনি বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাজারমূল্য অনুযায়ী যে মেশিনের আনুমানিক দাম ৪৫ কোটি টাকা হওয়ার কথা, সেটির জন্য তিনি সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে ৬৫ কোটি টাকার কৃত্রিম বাজেট নির্ধারণ করে তা পাসের জন্য জোর তদবির চালাচ্ছেন। তবে এই মেশিনের প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে এই মেশিনটির জরুরি কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। সবচেয়ে বড় কথা, এই জটিল প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ বা প্রশিক্ষিত জনবলও সেখানে প্রস্তুত করা হয়নি। ফলে এই অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত মূল্যের মেশিনটি ক্রয় করা হলে রাষ্ট্রের অন্তত ২০ কোটি টাকার সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হবে, যা একটি বিশেষ মহলের পকেটে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ডা. বদরুল আলমের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা দেশের প্রচলিত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী জানান, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এই অভিযোগগুলো সরাসরি ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭’ এর ৫(২) ধারা এবং ‘দণ্ডবিধি, ১৮৬০’ এর ৪০৯ ও ৪২০ ধারার আওতাভুক্ত অপরাধ। একইসাথে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত মূল্যে সরঞ্জাম ক্রয় করার এই প্রক্রিয়াটি ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬’ (PPA-2006) এর উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নীতির পরিপন্থী।

দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশেষায়িত হাসপাতালের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে ডা. বদরুল আলম মণ্ডলের বিরুদ্ধে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা দরকার বলে মনে করছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। সচেতন মহলের দাবি, তার দীর্ঘদিনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আইনি বৈধতা যাচাই এবং গামা নাইফ মেশিন ক্রয়ের মেগা প্রজেক্টের নামে এই বিশাল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের চেষ্টা বন্ধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনতিবিলম্বে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় দেশের স্বাস্থ্যখাতের প্রতি জনগণের আস্থা ও স্বস্তি চিরতরে ক্ষুণ্ন হবে।

এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এসব অভিযোগের বিষয়ে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক ডা. বদরুল আলম মণ্ডলের বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।