বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবিকার মূল চালিকাশক্তি নদী ও পানিসম্পদ রক্ষায় কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘নোঙর ট্রাস্ট’।
সম্প্রতি সংস্থাটি আয়োজিত “জনসম্পৃক্ত নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: টেকসই ভবিষ্যৎ ও যৌথ দায়বদ্ধতা” শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নদী কূটনীতি জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
সংকটে দেশের নদী ও পানিসম্পদ
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, নাব্য সংকট, পলি ভরাট, অবৈধ দখল ও শিল্পবর্জ্যের দূষণে দেশের অধিকাংশ নদী আজ মৃতপ্রায়। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগের মতো নদীর পানি পানের পাশাপাশি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে পানির স্তর উদ্বেগজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনছে।
উপকূলে পানীয় জলের চরম সংকট
উপকূলীয় ১৯টি জেলায় সুপেয় পানির সংকট এক ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রে লবণাক্ততার আগ্রাসন ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে গভীর নলকূপেও সুপেয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানির জন্য গ্রামীণ নারীদের প্রতিদিন মাইল কে মাইল হাঁটতে হচ্ছে। বিষাক্ত ও লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে উপকূলীয় এলাকায় গর্ভবতী নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও ‘প্রিক্ল্যাম্পসিয়া’র হার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষিজমি উর্বরতা হারিয়ে অনুৎপাদিত হয়ে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও নদী কূটনীতি
বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টি ভারত এবং ৩টি মিয়ানমার থেকে এসেছে। উজানে একতরফা বাঁধ ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ পানিশূন্যতায় ভোগে এবং বর্ষায় আকস্মিক বন্যার সম্মুখীন হয়। বক্তারা উল্লেখ করেন, ১৯৯৭ সালের ‘জাতিসংঘ নদী কনভেনশন’ অনুস্বাক্ষর না করায় আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া তিস্তা চুক্তির দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এবং ভারতের ‘আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প’ বাংলাদেশকে চরম অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
উত্তরণের উপায় ও কৌশলগত সুপারিশ
নদী ও পানি সংকট থেকে উত্তরণে সেমিনারে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ উত্থাপন করা হয়:
পরিবেশবান্ধব খনন (Eco-dredging): নদীর গতিপথ ঠিক রেখে বৈজ্ঞানিক উপায়ে খনন করা এবং বালু নদীতে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে স্তূপীকৃত করা।
স্থানীয় প্রযুক্তি ও সমাধান: উপকূলীয় অঞ্চলে বড় আকারে রেইনওয়াটার হারভেস্টিং (বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ), পন্ড স্যান্ড ফিল্টার এবং সৌরশক্তি চালিত ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্লান্ট স্থাপন করা।
ম্যানগ্রোভ বনায়ন: নদী ভাঙন ও লবণাক্ততা প্রতিরোধে বেড়িবাঁধের পাশে কেওড়া, গোলপাতা ও সুন্দরীর মতো ম্যানগ্রোভ বন গড়ে তোলা।
আইনি কাঠামোর সংস্কার: নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে হাইকোর্টের রায় কার্যকর করা, ‘দূষণকারীকে জরিমানা’ (Polluter Pays Principle) ব্যবস্থা চালু করা এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে স্বাধীন নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি: ভারতের পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানকে যুক্ত করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকাভিত্তিক বহুপাক্ষিক আলোচনা শুরু করা এবং ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ নদী কনভেনশন অনুস্বাক্ষর করা।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধটি যৌথভাবে উপস্থাপন করেন নোঙর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সুমন শামস এবং মীর আকরাম। বক্তারা একমত প্রকাশ করে বলেন, “নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে”—তাই প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে ও সাধারণ মানুষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে রেখে জনসম্পৃক্ত টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।







