বগুড়ায় বসেছিল তারকা মহাতারকার মিলনমেলা
ইমরান পরশ: ঐতিহাসিক শহর বগুড়া। প্রাচীন পুন্ড্র নগর হিসেবেও পরিচিত। ঐতিহ্যবাহী বগুড়ার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান মম ইন হোটেল পার্ক এন্ড রিসোর্ট-এর। এখানেই বসেছিল বাংলা গানের তারকা-মহাতারকাদের মিলনমেলা। উপলক্ষ টিএমএসএস চ্যানেল আই ২০তম মিউজিক অ্যাওয়ার্ড। মম ইন এর মনোরম পরিবেশে খোলা সবুজ চত্বরে তৈরি বিশাল মঞ্চ। মিউজিক অ্যাওয়ার্ড উপলক্ষে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সঙ্গীত তারকা কলা কুশলীরা এসেছেন বগুড়ার মম ইন-এ। নান্দনিক পার্ক হোটেল এন্ড রিসোর্ট মম ইন। আমরাও কয়েকজন সংবাদকর্মী গাড়ি বহর নিয়ে ছুটে চলেছি বগুড়ার উদ্দেশে। চ্যানেল আইয়ের তেজগাঁও কার্যালয় থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে সাঁই সাঁই করে গাড়ি ছুটে চলেছে গাজীপুর শহর পেরিয়ে টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে যমুনা সেতু। বাংলার চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে মনের অজান্তেই বেজে উঠলো দেশের গান। একী অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননীÑগুনগুন করে গাইতেই অন্য সাথীরাও ধরে ফেললেন গানটি। এমন সুরের আনন্দে ভাসতে ভাসতে পৌঁছে গেলাম ফুড ভিলেজে। সেখানে আগে থেকেই সবার জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। আপ্যায়ন শেষে আবার বগুড়া শহরের দিকে যাত্রা।
মম ইন পার্কে প্রবেশের পরই চোখে পড়লো চোখ ধাঁধানো বিশাল মঞ্চ। অনেকেই ছোটাছুটি করছেন শেষ প্রস্তুতি চলছে। ২০তম টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডের প্রকল্প পরিচালক রাজু আলীম স্বাগত জানালেন ঢাকা থেকে আগত সাংবাদিকদের। তিনি সবার সাথে কুশল বিনিময় শেষে জানালেন সন্ধ্যা সাতটায় অনুষ্ঠান শুরু হবে। এর ঘন্টা খানেক আগে ছিটেফোটা বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়া বয়ে গেছে। সূর্যের আলো ম্লান হতেই মঞ্চের আলোর ঝলকানি শুরু। এরপর আলো নিভে আবার জ্বলে উঠলো। মঞ্চে এলেন খ্যাতিমান শিল্পী রফিকুল আলম, মো. খুরশীদ আলম, অণিমা রায়, চ্যানেল আইয়ের সেরা কণ্ঠ এবং ক্ষুদে গানরাজ-এর শিল্পীরা। তারা একে একে পরিবেশন করলেন ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ এবং ‘আমার চ্যানেল আই গান’। দর্শক সারি থেকেও শিল্পীদের সাথে সুর মেলাচ্ছিলেন অনেকে। এই পরিবেশনা শেষে বিশাল এই মঞ্চের দুই প্রান্ত থেকে উঠে এলেন দুই উপস্থাপক অপু মাহফুজ এবং নীল হুরে জাহান। উপস্থিত হাজার হাজার দর্শকদের করতালিতে জেগে উঠলো মম ইন চত্বর। মঞ্চে ডেকে নেয়া হলো চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরকে। স্বগত বক্তব্যে তিনি বগুড়ার সন্তান হিসেবে গর্ববোধ করলেন। টিএমএসএসকে ধন্যবাদ দিলেন। ২০ তম টিএমএসএস-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আয়োজন সার্থক করার জন্য শিল্পী কলাকুশলী সহ সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। শুধুমাত্র সঙ্গীত নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এই আয়োজন। মঞ্চে এলেন টিএমএসএস এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম। তিনি চ্যানেল আইয়ের এই আয়োজনের সঙ্গে থাকতে পেরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতেও এমন আয়োজনের সঙ্গে থাকার আশা ব্যক্ত করেন। এর মাঝে দর্শক সারিতে এসে হাজির হলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তাকে মঞ্চে ডেকে তোলেন ফরিদুর রেজা সাগর। সঙ্গীতের এমন আয়োজনে মুগ্ধ মন্ত্রী বলেন এরকম আয়োজন বেশি বেশি হওয়া প্রয়োজন। আমাদের সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিতে হলে এধরনের আয়োজনের বিকল্প নেই। তার বক্তব্য শেষেই মাইক্রোফোন হাতে নেন ফরিদুর রেজা সাগর সাগর। চমক যে অপেক্ষা করছে সেটা কেউ বুঝতে পারিনি। মন্ত্রী মহোদয়কে সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য আহ্বান করতেই করতালিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন উপস্থিত দর্শকেরা। মন্ত্রী গাইলেন প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ…। দুটি লাইন। ফরিদুর রেজা সাগর মানেই যে চমৎকৃত করার মাস্টার সেটা তিনি আবারও বুঝিয়ে দিলেন।
এরপর মঞ্চে এলেন অভিনেত্রী এবং নির্মাতা আফসানা মিমি ঘোষণা করলেন চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আজীবন সম্মাননা প্রাপ্ত শিল্পী কনকচাঁপার নাম। চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ তুলে ধরলেন শিল্পীর পরিচিতি। তারপর মঞ্চ আলো করে এলেন শিল্পী কনকচাঁপা। শিল্পীকে উত্তরীয় পরিয়ে দিলেন ফরিদুর রেজা সাগর। ক্রেস্ট এবং সম্মাননা চেক তুলে দিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শাইখ সিরাজ, ইমপ্রেস গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুর রশিদ মজুমদার, পরিচালক জহিরউদ্দিন মাহমুদ মামুন, পরিচালক মুকিত মুজমদার বাবু এবং ড. হোসনে আরা বেগম। কনকচাঁপা তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে মঞ্চে ডেকে নেন তার স্বামী সঙ্গীত পরিচালক মঈনুল হোসেনকে। আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। অনুভূতি ব্যক্ত শেষে তিনি তার এই আজীবন সম্মাননা ক্রেস্টটি তুলে দেন তার সঙ্গীতগুরু এবং জীবনসঙ্গী মঈনুল হোসেনের হাতে। এসময় অনেকের চোখে আবেগে জল চলে আসে।
পরপরই মঞ্চে এলেন খায়রুল বাশার। আফসানা মিমি এবং খায়রুল বাশার ঘোষণা করলেন বিশেষ সম্মাননা প্রাপ্ত শিল্পী কাঙ্গালীনি সুফিয়ার নাম। শিল্পীকে উত্তরীয় পরিয়ে হাতে সম্মাননা স্মারক ও ক্রেস্ট তুলে দেন অতিথিগণ। কাঙ্গালীনি সুফিয়া আবেগভরা কণ্ঠে দুটি সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এসময় উপস্থিত দর্শকদের ভেতর তীব্র আনন্দ অনুভূতি দেখা যায়।
এরপর ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদানের ফাকে ফাকে শুরু হলো বিভিন্ন শিল্পীর পরিবেশনা। তানভীর আলম সজীবের দল যখন প্রাণবন্ত পারফরম্যান্স করলেন বগুড়ার ভাষায় নতুন একটি গান, দর্শকরা হাততালি দিয়ে তাদের শুভেচ্ছা জানালেন। ইমরান ও কোনালের গানে ছড়িয়ে পড়লো প্রেমের মাদক আবেশ। বিউটি পরিবেশন করেন লোকসঙ্গীত। গান পরিবেশন করেন, মো. খুরশীদ আলম, শওকত হায়াত খান, ঝিলিক, লিজা, লুইপা, মেহরীণ, মাহতিম সাকিব, বাপ্পি, লিজা, সাব্বির, লুইপা, আতিয়া আনিসা, শফিক তুহীন, কিশোর, শফিক তুহীনসহ আরও অনেকে। অনন্যা আচার্য গাইলো বগুড়ার ছল শিরোনামে আঞ্চলিক গান। সঙ্গীতের পাশাপাশি ছিল নৃত্য পরিবেশনা। নায়িকা অপু বিশ্বাস এবং চিত্রনায়ক আদর আজাদ পরিবেশন করলেন ঐতিহাসিক চরিত্র বেহুলা লক্ষ্মীন্দরকে নিয়ে গীতিনৃত্য। দর্শকদের করতালিতে তখন নেচে উঠছিল মম ইন চত্বর। মাঝে মাঝে প্রদান করা হচ্ছিল বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার। এরপর এলো এক অবিস্মরণীয় পর্ব। মঞ্চে এলেন কিংবদন্তী কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি একটি চলচ্চিত্রের গানের পাশাপাশি ভাওয়াইয়া পরিবেশন করলেন। সাবিনা ইয়াসমিনের পরই মঞ্চে এলেন আরেক কিংবদন্তী শিল্পী রুনা লায়লা। দর্শকরাও আড়মোড়া দিয়ে জেগে উঠলেন। তখন প্রায় মধ্যরাত। রুনা লায়লা একটি দেশের গান পরিবেশন করলেন। তারপর মঞ্চে তার সঙ্গে ডেকে নিলেন শিল্পী কোনাল ও ইমরানকে। গাইলেন জ্বালা জ্বালা গানটি। এরপরে সকলে মিলে গাইলেন সাধের লাউ বাইনাইলো মোরে বৈরাগী গানটি। রুনা লায়লার গানের সঙ্গে নৃত্যের তালে মঞ্চে উঠলেন শিল্পী খুরশীদ আলম। তিনি গানের তালে তালে দর্শকদের মুগ্ধ করলেন। এই গানের সাথে পর্দা নামলো ২০তম টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডের। দর্শকরা প্রাণভরে আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।
১৮টি ক্যাটাগরীতে অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তরা হলেন, আধুনিক গান শ্রেষ্ঠ শিল্পী লিজা (খুব প্রিয় আমার), ইউটিউব থেকে কমপক্ষে একলক্ষবার ভিউ এবং ১৫০০ লাইক প্রাপ্ত আধুনিক গানে এঞ্জেল নূর (যদি আবার), শ্রেষ্ঠ সুরকার আধুনিক গান বাপ্পা মজুমদার (অবশেষে), শ্রেষ্ঠ গীতিকার আধুনিক গানেÑতারেক আনন্দ (প্রেমবতী), এবং শাহনাজ কাজী (মা), শ্রেষ্ঠ ব্যান্ড মেট্রিক্যাল (গণতন্ত্রের ঘুড়ি), শ্রেষ্ঠ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার সেতু চৌধুরী (গণতন্ত্রের ঘুড়ি), শ্রেষ্ঠ দ্বৈত সঙ্গীত শিল্পী ইমরান ও সিঁথি সাহা (প্রেম বুঝি), শ্রেষ্ঠ লোকসঙ্গীত শিল্পী বিউটি ( চার চাঁদে দিচ্ছে ঝলক), ইউটিউবে ১ লক্ষবার ভিউ এবং ১৫০০ লাইক প্রপ্ত লোকসঙ্গীত লটারির মাধ্যমে বিজয়ী শরিফ উদ্দিন দেওয়ান সাগর (মা লো মা), শ্রেষ্ঠ ছায়াছবির গান আতিয়া আনিসা (ছোট্ট সোনা), ইউটিউবে কমপক্ষে একলক্ষবার ভিউ এবং ১৫০০ লাইক প্রাপ্ত ছায়াছবির গান লটারির মাধ্যমে বিজয়ী দিলশাদ নাহার কনা (দুষ্টু কোকিল), শ্রেষ্ঠ সুরকার ছায়াছবির গান শওকত আলী ইমন (ছোট্ট সোনা), শ্রেষ্ঠ গীতিকার ছায়াছবির গান রোহিত সাধুখাঁ (বেঁচে যাওয়া ভালোবাসা), শ্রেষ্ঠ মিউজিক ভিডিও নির্মাতা তানভীর তারেক (পাখি আমার নীড়ের পাখি), শ্রেষ্ঠ নজরুল সঙ্গীত শিল্পী শহিদ কবির পলাশ (সৃজন ছন্দে), শ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী স্বাতী সরকার, শ্রেষ্ঠ উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিল্পী নাশিদ কামাল (সব সখিয়া চলো), শ্রেষ্ঠ নবাগত শিল্পী সভ্যতা (অধিকার), শ্রেষ্ঠ অডিও কোম্পানী বেঙ্গল মিউজিক।
এই আয়োজনে পৃষ্ঠপোষক ছিল, টিএমএসএস, মমইন পাঁচ তারকা হোটেল এন্ড রিসোর্ট, এসআর গ্রুপ, এডভান্স ডেন্টাল ম্যাক্সিলোফেসিয়াল হাসপাতাল, পিউলি, কø্যাসিক্যাল হোম টেক্স, ইমপোরিয়াম প্রোপার্টিজ লি., ধ্রুব মিউজিক স্টেশন। ঢাকা থেকে আড়াইশ শিল্পী কলাকুশলী এবং বিশিষ্ঠজনেরা এই আয়োজনে অংশ নেন।







