বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক দেশের ৩১ টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয় । এ উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী জনাব অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং সভাপতিত্ব করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড মামুন আহমেদ । এটি বর্তমান সরকারের গ্রিন এনার্জি নীতির একটি ইতিবাচক প্রতিফলন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং কার্বন নিঃসরণ (Carbon Emission) কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উদ্যোগটির যথাযথ বাস্তবায়ন হলে নিঃসন্দেহে দেশের জ্বালানি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, পরিবেশগত প্রভাব ও দায়বদ্ধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণের সময় শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না; এর দীর্ঘ মেয়াদী পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। সোলার প্যানেল তৈরিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ, প্যানেলের কার্যকালে বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেগুলোর পুনর্ব্যবহার এবং চূড়ান্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার (waste management) বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা বা আইন থাকা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে পলিথিনের সহজলভ্যতা ও সুবিধা এবং পরবর্তী সময়ে মাটি, কৃষি ও পরিবেশের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব লক্ষণীয়। একই ধরনের পরিস্থিতি যেন ভবিষ্যতে সোলার প্যানেলের ক্ষেত্রেও তৈরি না হয়, সে বিষয়ে এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
যেসব প্রতিষ্ঠান সোলার প্যানেল স্থাপন করবে, তাদের সঙ্গে চুক্তির সময়ই প্যানেলের মেয়াদ শেষে পুনর্ব্যবহার, মেরামত, প্রতিস্থাপন ও পরিবেশসম্মত বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে হবে। শুধুমাত্র ২০-২৫ বছর ধরে কিস্তিতে অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা করলেই হবে না; এই দীর্ঘ সময় এবং পরবর্তী সময়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা নিতে হবে।
সম্প্রতি দিনাজপুরের একটি প্রত্যন্ত এলাকায় কৃষিজমিতে স্থাপিত একটি ছোট সোলার প্যানেল নষ্ট হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি। সম্ভবত কোনো এনজিওর উদ্যোগে এটি স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু নষ্ট হওয়ার পর সেটির যথাযথ মেরামত বা অপসারণের (disposal) কোনো ব্যবস্থা দৃশ্যমান ছিল না।
একটি ছোট ড্রাই সেল ব্যাটারির ক্ষেত্রেও উন্নত দেশগুলোতে নির্দিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ আমাদের দেশে একটি ব্যাটারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও এখনো যথাযথভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ প্রতিনিয়ত পরিবেশে মিশছে। এই বাস্তবতায় সারাদেশে হাজার হাজার সোলার প্যানেল স্থাপনের আগে এর ভবিষ্যৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা আরও বেশি জরুরি।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ও স্থাপনার নিরাপত্তা।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যেসব ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হবে, সেসব স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তবতা সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি অবগত। বিভিন্ন সময় হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিংবা এক বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতার ঘটনা ঘটে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব ঘটনা প্রাণহানির মতো ভয়াবহ পরিণতিও ডেকে আনে।
এ ধরনের সংঘর্ষের সময় শিক্ষার্থীরা এক ভবনের ছাদ থেকে অন্য ভবনের ছাদে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। রাত ৮/৯ পর হলের ছাদগুলো ছাএদের দখলে চলে যায় । এমন পরিস্থিতিতে ভবনের ছাদে স্থাপিত মূল্যবান সোলার প্যানেল কতটুকু নিরাপদ থাকবে, তা বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনই তাঁদের ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালো জানেন। অনেক সময় সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক ভবন, উপাচার্যের কার্যালয় কিংবা বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় সোলার প্যানেলের মতো ব্যয়বহুল অবকাঠামো স্থাপনের আগে সেগুলোর সুরক্ষা, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সর্বোপরি, গ্রিন এনার্জির দিকে এগিয়ে যাওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন এবং যা বতর্মান সরকারের অগ্রাধিকার প্রাপ্ত প্রকল্প বটে । কিন্তু শুধু খরচ কমানো কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহ বা সাশ্রয়ের হিসাব করে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা যথেষ্ট নয়। প্রকল্পটির অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাব, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত নিরাপত্তা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
আমরা চাই না, আজকের জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ আগামী দিনে পরিবেশের জন্য নতুন কোনো সংকট তৈরি করুক। সরকারের অর্থ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ—সবই শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ। তাই বাস্তবতার নিরিখে যথাযথ সমীক্ষা, সুস্পষ্ট নীতিমালা, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেই এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত।
প্রয়োজনে, কিছুটা সময় বেশি লাগুক – তাতে কোনো সমস্যা নেই। তাড়াহুড়ো করে কোন প্রকল্প বাস্তবায়নের চেয়ে সময় নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং যা দেশের সার্বিক টেকসই উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে ।







