, ,

গানে গানে পদ্মাপাড়ের আর্তনাদ: পদ্মার ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধের দাবি, নির্বাচন বয়কটের হুঁশিয়ারি চরবাসীর

নিউজটি শেয়ার করুন

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি: পদ্মার ভাঙনে হারাচ্ছে ঘর, বসতভিটা ও ফসলি জমি। বছরের পর বছর নদীর সঙ্গে লড়াই করেও মিলছে না স্থায়ী সমাধান। নির্বাচনের আগে বাঁধ নির্মাণসহ নানা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি মিললেও পরে তার বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে চরবাসীর মধ্যে। সেই ক্ষোভ, কষ্ট ও আকুতি এবার উঠে এসেছে গানের সুরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই গানে পদ্মার ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও সরকারের কাছে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও নদীভাঙনের চিত্র তুলে ধরে তৈরি করা গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও ফেসবুক পেজ থেকে গানটি শেয়ার করে চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ ও দীর্ঘদিনের ক্ষোভ তুলে ধরা হচ্ছে।
লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের জয়পুর, কবিরপুর ও বিশরাশি গ্রামসহ সুতালড়ী ও আজিমনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরাঞ্চলে বর্তমানে পদ্মার ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দুই মাস ধরে ভাঙন চলছে। গত ১০ থেকে ১২ দিনে পানি বৃদ্ধি ও প্রবল স্রোতের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো কোনো এলাকায় প্রতিদিনই ১০ থেকে ২০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। গত কয়েক দিনে শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে বলে তাদের দাবি। ভাঙনের আতঙ্কে অনেকে আগেই ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর বর্ষা ও বন্যার সময় পদ্মার ভাঙনে শত শত বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে যায়। কখনো কখনো হাজার হাজার মানুষ ভাঙনের শিকার হন। দীর্ঘদিনের ভাঙনে অনেক পরিবার একাধিকবার বসতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে চরবাসীর কাছে বর্ষা মানেই নতুন করে ঘর হারানোর আতঙ্ক।
চরবাসীর অভিযোগ, নির্বাচনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা এলাকায় এসে পদ্মার ভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণ, রাস্তা-ঘাটসহ নানা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখা যায় না। ভাঙন শুরু হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর ও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়েও তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে। কয়েকজন চরবাসী তাদের পোস্টে আগামী নির্বাচনে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলকে সমর্থনের বিষয়ে নতুন করে ভাবার কথা জানিয়েছেন। কেউ কেউ সরাসরি নির্বাচন বয়কটের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য-নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবে পদ্মার ভাঙন রোধে কাজ দেখতে চান তারা।
চরবাসীর দাবির কেন্দ্রে রয়েছেন মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা এবং মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে তাদের দাবি-দুর্গম চরাঞ্চলকে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা।
লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, প্রতিবছরই নদীভাঙনে এ এলাকার ফসলি জমি ও মানুষের বসতভিটা বিলীন হচ্ছে। ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে অনেকেই ভিটেমাটি হারিয়েছেন। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে।
মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত বলেন, দুর্গম চরাঞ্চলের ভাঙনকবলিত এলাকার জন্য আপৎকালীন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান বলেন, ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হলেও এতে স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। নদীর গতিপথ ও স্রোতের পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। ফলে প্রতিবছরই বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।
চরবাসীর দাবি, শুধু জিওব্যাগ ফেলে সাময়িক প্রতিরোধ নয়, পদ্মার ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আরও বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গানের সুরে তাই তাদের প্রশ্ন-নির্বাচনের আগে যে বাঁধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, নির্বাচন শেষ হলে সেই বাঁধের দেখা মেলে না কেন?
পদ্মাপাড়ের মানুষের আকুতি এখন আর শুধু নদীর তীরে সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাদের দাবি স্পষ্ট-প্রতিশ্রুতি নয়, এবার বাস্তব কাজ চাই। ঘর বাঁচাতে বাঁধ চাই, জমি বাঁচাতে স্থায়ী নদীভাঙন প্রতিরোধ চাই।