, ,

​ক্রিকেটার নাঈম হেনস্তা ও নিরাপত্তার সংকট: রক্ষকের ভূমিকায় যখন প্রশ্ন, সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?

নিউজটি শেয়ার করুন

​একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্রিকেট তারকা, যিনি বিশ্বমঞ্চে দেশের গৌরব বহন করেন, তাকেই যদি প্রকাশ্য রাস্তায় লাঞ্ছনা, শারীরিক হেনস্তা ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হতে হয়, তবে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তার জায়গাটি ঠিক কোথায়?

গত শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামের লালখান বাজার ও খুলশী থানা এলাকায় জাতীয় দলের ডানহাতি স্পিনার নাঈম হাসানের ওপর পুলিশের একটি অংশের অপেশাদার আচরণ, লাঠিপেটা ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনায় পুরো দেশ আজ স্তব্ধ, ক্ষুব্ধ এবং গভীরভাবে আলোড়িত।

​ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ খেলে শুক্রবার রাত ১০:৩০ টায় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নামেন নাঈম হাসান। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে চাঁদগাঁওয়ের নিজ বাসায় ফেরার পথে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নিচে তাঁর গতি রোধ করে খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, কনস্টেবল রাসেল চৌধুরী এবং তাদের সাথে থাকা এক কথিত সোর্স সোহেল। শুরু হয় তল্লাশির নামে চরম হেনস্থা। নাঈম নিজের পরিচয় দেওয়ার পর এবং সেখানে জড়ো হওয়া শতাধিক সাধারণ মানুষ তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার পরও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের আচরণে বিন্দুমাত্র সংবেদনশীলতা দেখা যায়নি। উল্টো লাঠি দিয়ে আঘাত করে এবং জোরপূর্বক প্রথমে পুলিশের গাড়িতে এবং পরে আরেকটি অজ্ঞাত গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। সচেতন মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবলই একটি ভুল বোঝাবুঝি, নাকি কোনো পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপচেষ্টা?
​থানা যেন জবাবদিহিতাহীন এক কক্ষ: ওসির আচরণে গভীর উদ্বেগ
​রাস্তা থেকে তুলে নাঈমকে নিয়ে যাওয়া হয় খুলশী থানায়। সেখানে আইনের রক্ষক নামধারী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মানবিকতা বা পেশাদারত্বের ন্যূনতম কোনো রূপ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। উল্টো থানায় আরেক দফা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন এই ক্রিকেটার। খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুল ইসলাম রীতিমতো শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নাঈমকে ‘চোখ নামিয়ে’ কথা বলতে বাধ্য করেন। যে চেয়ারটিতে বসে নাগরিকের আইনি অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, সেখানে বসে একজন জাতীয় ক্রিকেটারকে এভাবে শাসিয়ে ওসি আরিফুল কি নিজের পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহার করলেন না? এই ধরনের দাম্ভিক আচরণ বাহিনীর ভাবমূর্তিকে জনসাধারণের কাছে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

​নাঈমের ওপর এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার খবর পেয়ে থানায় ছুটে যান তাঁর পরিবার ও এলাকাবাসী। কিন্তু নাঈমের বাবা, সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মাহবুবুল আলমকেও প্রথমে থানায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়। একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব এবং জাতীয় ক্রিকেটারের বাবার সাথেই যেখানে এমন অসহযোগিতামূলক আচরণ করা হয়, সেখানে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ কতটা কঠিন, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়।
​ভুল তথ্যের খেসারত ও বিসিবির জোরালো ভূমিকা
​শুরুতে পুলিশ চরম আগ্রাসী ও অসহযোগিতামূলক ভূমিকা দেখালেও পরবর্তীতে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল এবং পরিচালক ইসরাফিল খসরুসহ প্রভাবশালীদের ফোন আসার পর টনক নড়ে সিএমপি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিমানবন্দর হয়ে অবৈধ স্বর্ণের বার আসবে—সোর্সের এমন একটি ‘ভুল তথ্যের’ ভিত্তিতে ওত পেতে ছিল পুলিশ। কিন্তু ভুল তথ্যের কারণে আসল অপরাধী হাতছাড়া হওয়ায় নিজেদের সেই পেশাগত ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায়ভার ও ক্ষোভ গিয়ে পড়ে নিরীহ ক্রিকেটার নাঈমের ওপর। অপরাধী ধরতে না পারার ব্যর্থতার ঝাল কি এভাবেই একজন সম্মানিত নাগরিকের ওপর মেটানো সংগত?

​এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও পাশবিক নির্যাতনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এবং শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত নাঈমকে পরবর্তীতে প্রাথমিক চিকিৎসাও নিতে হয়েছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, নাঈমের বড় ভাই বাদী হয়ে মামলা করলেও এজাহারে ওসির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অজ্ঞাত কারণে ওসি আরিফুল ইসলামের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে! একজন জাতীয় ক্রিকেটার যেখানে আইনি নথিতে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে বাধার সম্মুখীন হন, সেখানে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কার করতলগত, সেই প্রশ্ন আজ সমাজকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
​সিএমপি কমিশনারের দুঃখ প্রকাশ ও তদন্তের প্রক্রিয়া
​ঘটনার পরদিন সকালে ক্রিকেটার নাঈমের বাসায় গিয়ে সিএমপি কমিশনার দুঃখ প্রকাশ করেন এবং অভিযুক্ত এসআই শফিকুল ও কনস্টেবল রাসেলকে সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস দেন। কিন্তু সচেতন মহলের প্রশ্ন—নাগরিকের সুরক্ষার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, অথচ ঘটনার পর কেন কেবল তদন্ত কমিটির আনুষ্ঠানিকতা? এই তদন্ত কি আসলেই নিরপেক্ষ হবে, নাকি এটি কেবলই দায় এড়ানোর একটি প্রচলিত প্রক্রিয়া—তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই যায়।

​নাঈমের বাবা অশ্রুভেজা চোখে ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশ করে বলেন, “ওরা ওর বডি টাচ করেছে, ওরে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে। একটা ন্যাশনাল প্লেয়ারের যদি এই অবস্থা হয়, তবে সাধারণ মানুষের কী হবে?” একজন পিতার এই আর্তনাদ আজ পুরো শাসনব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতার মুখে এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন।

​জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে আসন্ন টেস্ট সিরিজের জন্য সদ্য ঘোষিত জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন চট্টগ্রামের অহংকার, বাংলার গর্ব নাঈম হাসান। নাঈমকে রক্ষা করতে সেদিন কোনো তাৎক্ষণিক প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ও আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি এক বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—যে সাধারণ নাগরিকেরা সততা ও সম্মানের সাথে বাঁচতে চায়, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে? পুলিশ বাহিনীর ভেতরে যদি এই ঘটনার পর পেশাগত মর্যাদা ও লজ্জাবোধ জাগ্রত না হয়, তবে সমাজ কোনোদিনই এই ক্ষত ভুলে যাবে না। আইনের রক্ষকেরা যদি তাদের প্রকৃত দায়িত্ব ভুলে ক্ষমতার অপব্যবহারে লিপ্ত হন, তবে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া সময়ের ব্যবধান মাত্র!