কৃষি ও কৃষিভিত্তিক খাতে ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিকেবি অর্ডার ১৯৭৩ এর অধীনে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কৃষকের উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশের কৃষি উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কৃষকের আর্থিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। দেশের মোট কৃষিঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ এই ব্যাংক বিতরণ করে থাকে এবং ১,০৩৮টি শাখা ও ৪টি উপশাখার মাধ্যমে সারাদেশের মানুষের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। বর্তমানে এর মোট গ্রাহক সংখ্যা ১,৪৫,০৮,৯২২ জন।
কৃষিঋণ বিতরণের সাফল্য
সাম্প্রতিক অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। সরকারি এই বিশেষায়িত ব্যাংক দেশের কৃষিখাতে ঋণ বিতরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ২০২৪ সালের জুনে কৃষিঋণের পরিমাণ ছিল ৮,৮৯৫ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের জুন মাসে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৯,০৫৬ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্তই ইতোমধ্যে ১,৭৫৬ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যা কৃষিঋণ বিতরণের ধারাবাহিক সাফল্যের প্রমাণ বহন করছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক কৃষক, প্রান্তিক কৃষক, অতি দরিদ্র, বর্গাচাষি এবং সাধারণ জনগণের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান করে আসছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে। বিকেবি শুধুমাত্র ঋণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে এবং টেকসই কৃষি উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও কাজ করছে। কৃষি (শস্য, মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ) খাতে সর্বাধিক ঋণ বিতরণ ব্যাংকটি বহুমুখী কৃষি উৎপাদনকে উৎসাহিত করছে। আমদানি বিকল্প (ডাল, তৈলবীজ, মশলা এবং ভুট্টা চাষে) শস্য উৎপাদন ও পুনঃঅর্থায়ন ঋণ বিতরণ করে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোকে আরও দৃঢ় করে তুলছে।
সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (CMSME) খাতে ঋণ বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ৩০ জুন ২০২৪ সমাপ্ত অর্থবছরে এসএমই খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৪,৭৩৩.৬৮ কোটি টাকা, যা এক বছরে বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ জুন ২০২৫-এ ৫,৫৩৫.১৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তিন মাসে ৮৯৫.৪২ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে, যা ব্যাংকের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও ঋণ বিতরণের গতিশীলতা প্রতিফলিত করছে। কৃষিভিত্তিক শিল্প, কৃষি যন্ত্রপাতি, উৎপাদন শিল্প, মৎস্য, পশুসম্পদ, তাঁত, হস্তশিল্প, পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য শিল্প, জুয়েলারি শিল্প, আগর ও মোমবাতি শিল্প, টেইলারিং ইত্যাদি ছোট ব্যবসায় নিয়োজিত উদ্যোক্তাদের এই ঋণ বিতরণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, উদ্যোক্তাদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে। পাশাপাশি ক্লাস্টারভিত্তিক বিভিন্ন খাতেও ঋণ বিতরণ করছে। ব্যাংকের এই কার্যক্রম দেশের CMSME খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে এক সুস্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
SDG বাস্তবায়নে বিকেবির অবদান
একই সঙ্গে বিকেবির কৃষিঋণ বিতরণ কার্যক্রম জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা Sustainable Development Goal (SDG) বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রান্তিক কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ঋণ সুবিধার আওতায় এনে দারিদ্রদ্র্য বিমোচনে (SDG 1) সহায়তা করছে ব্যাংকটি। শস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারের পক্ষে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বিতরণের মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত দেশ গঠন ও খাদ্য নিরাপত্তা (SDG 2) নিশ্চিত করছে। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার মাধ্যমে শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (SDG ৪) অর্জনে অবদান রাখছে। এ ছাড়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion) বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈষম্য হ্রাসে (SDG 10) এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব কৃষিকাজে সহায়তার মাধ্যমে টেকসই উৎপাদন ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় (SDG 12 ও 13) ভূমিকা রাখছে। ফলে কৃষিঋণ বিতরণের ধারাবাহিক অগ্রগতি শুধু কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নেই নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের বৃহত্তর জাতীয় লক্ষ্য পূরণেও কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ে সাফল্য
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণ আদায় গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের কৃষি খাতে ব্যাংকের কার্যক্রমের স্থিতিশীলতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। ৩০ জন ২০২৪ সালে ব্যাংকের শ্রেণীকৃত ঋণ আদায় ছিল ৬৯২.৪১ কোটি টাকা, যা ৩০ জুন ২০২৫-এ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,০৯১.৯৭ কোটি টাকায় এবং চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও বৃদ্ধি পেয়ে পৌঁছেছে ১,১২১ কোটি টাকায়। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধির ফলে বোঝা যায় যে ব্যাংক খেলাপি ঋণ মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং ঋণ আদায়ে কার্যক্রমকে আরও দক্ষ করছে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক কৃষক যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলেও ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রেখে আর্থিক ভিত্তি স্থিতিশীল রাখছে। শ্রেণীকৃত ঋণ আদায়ের এই বৃদ্ধি ব্যাংকের কর্মী ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ঋণ আদায় মনিটরিং প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে শাখা কার্যক্রমের কার্যকারিতা বৃদ্ধিকে প্রতিফলিত করছে।
রেমিট্যান্স অর্জনে নতুন মাইলফলক
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক রেমিট্যান্স আহরণেও নতুন রেকর্ড গড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্য ছিল ১৫,৭৫০ কোটি টাকা, যেখানে অর্জিত হয়েছে ২৫,৭১৪ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১৬৩ শতাংশ। মার্কিন ডলারে এর পরিমাণ ২.১১ বিলিয়ন। এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যাংক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত ‘রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৪’ অর্জন করেছে। দেশের সব ব্যাংকের মধ্যে রেমিট্যান্স আহরণে বর্তমানে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে অগ্রগতি
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবায়ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতকে আধুনিক ও গ্রাহকবান্ধব হিসেবে নতুন মাত্রা দিয়েছে। গ্রাহকবান্ধব My BKB App ই-গভর্ন্যান্স ও উদ্ভাবন কর্মপরিকল্পনা ২০২৪-২৫-এর শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবনী উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া ১৬ জুন ২০২৩ থেকে ব্যাংক সম্পূর্ণভাবে Online Banking সুবিধা চালু করেছে, যা গ্রাহকদের সময় ও খরচ বাঁচাতে সহায়তা করছে এবং নিরাপদ, স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করছে। এই ডিজিটাল উদ্যোগের মাধ্যমে বিকেবি শুধু ব্যাংকিং সুবিধা প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গ্রামীণ জনগণকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের বর্তমান ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩৮,৪৮৮ কোটি টাকা, আর আমানত স্থিতি ৫১,৮৮৩ কোটি টাকারও বেশি, যা দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংকের অবদানকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত করছে।
কর্মী কল্যাণ উদ্যোগ
কর্মী কল্যাণ এবং যথাযথ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক কর্মী সন্তুষ্টি (Employee Satisfaction) বৃদ্ধি করেছে, যার ফলশ্রুতিতে ব্যাংকের অপারেশনাল কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব সঞ্চিয়া বিনতে আলী ব্যাংকে যোগদানের পর থেকেই কর্মী কল্যাণে একাধিক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।’ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-গৃহনির্মাণ অগ্রিম নীতিমালা সহজীকরণ, লাঞ্চ ভাতা বৃদ্ধি, হিসাব সমাপনী ভাতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ, ভবিষ্য তহবিলে চাঁদার হার বৃদ্ধি, কর্মকর্তা-কর্মচারীর অর্গানোগ্রাম পুনর্বিন্যাস এবং চাকরি প্রবিধানমালা হালনাগাদকরণ। এছাড়া, দীর্ঘদিনের পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মীদের যথাযথ বিধি অনুসরণ করে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে, যা কর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করেছে। এই উদ্যোগসমূহ ব্যাংকের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং কর্মক্ষমতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
চ্যালেঞ্জ ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকরা প্রায়ই সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। তবু আমানতকারীদের জমাকৃত টাকার ওপর লভ্যাংশ ব্যাংককে নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়, ফলে ব্যাংক লাভ করতে পারছে না। একদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ খেলাপি হওয়ার কারণে আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ব্যাংক, অন্যদিকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হচ্ছে-যাকে বলা হয় “শাকের উপর আটির বোঝা”। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষি খাতের ঋণ পরিশোধের সময়সীমা প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। তা না হলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। কৃষি হলো দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। এ খাত টিকিয়ে না রাখতে পারলে দেশের অর্থনীতি টিকে থাকবে না। বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বড় অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক অনন্য অবদান রাখছে। অর্থনীতিবিদদের মতে: “বাংলাদেশের মতো কৃষি নির্ভর একটি দেশের কৃষিক্ষেত্রে টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে না পারলে খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি ঝুঁকির সম্মুখীন হবে।







