আরো একটি সাধনায় নিজেকে দাড়া করালাম। মানবজীবন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এই সুন্দর ভূখণ্ডের রূপ ও বৈচিত্র্য তুলে ধরার চেষ্টা কজনই বা করে? কে খোঁজে মানুষের ভেতরের রূপ?
অধিকাংশ মানুষ বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়েই ব্যস্ত থাকে। অথচ রাতের আঁধারের কাছে সৌন্দর্যের কোনো মূল্য নেই।
আমি শিল্পী হওয়ার সাধনায় একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। মায়ের পায়ে হাত রেখে ছুটে এসেছিলাম শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সেই সাধনার পথে যত বাধা এসেছে, ততবারই থমকে গেছে মিলনের জীবন। সেখান থেকে পড়াশোনার জীবন ইতি টেনে শুধুমাত্র শিল্পচর্চার সাধনা করে থাকি। আর এই শিল্পচর্চা করতে গিয়ে আমার দৃষ্টি থেকে পড়াশোনা না করলেও শিল্পচর্চা করা যায়। বাবা-মায়ের চরণধূলি মাথায় নিয়ে শিল্পসাধনা চালিয়ে গেছি। কলেজ জীবনে এসে পেয়েছি একজন আদর্শ গুরু এবং কিছু ভালোবাসার বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের স্নেহ ও আশীর্বাদ। সেই আশীর্বাদ নিয়েই পথচলা।
৬জুন রাত ১১টার দিকে বাসায় ফিরছিলাম। একজন রোগীর জন্য রক্ত সংগ্রহ করে দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে একটু দেরি হয়ে যায়। অনেক দূর থেকে দেখতে পেলাম বাসার সামনে একটি বিশেষ ধরনের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।সাদা গাড়ির উপর লাল অক্ষরে লেখা দেখে বুঝতে পারলাম এটি সাধারণ কোনো গাড়ি নয়; এটি একটি ফ্রিজিং সংযুক্ত মরদেহবাহী গাড়ি। দেখে মনটা খুব চমকে উঠলো। না জানি কার কি হয়েছে।
কাছে গিয়ে ড্রাইভার ও আশপাশের মানুষের কাছে জানতে পারলাম, একজন মানুষ মারা গেছেন। তার বাড়ি নড়াইলে।এটি তার শ্বশুরবাড়ির সামনে রাখা হয়েছে। তার একমাত্র মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। তিনি দেশে ফিরে না আসা পর্যন্ত মরদেহটি এই ফ্রিজিং গাড়ির মধ্যেই সংরক্ষণ করা হবে। ড্রাইভার এবং মৃত ব্যক্তির শ্যালকের কাছ থেকে জানা গেল, অন্তত ৭ তারিখ বিকেল ৩টা পর্যন্ত এভাবেই থাকতে হবে। বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলল। আমার জানার কৌতুহল দেখে ড্রাইভার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বাড়ি কোথায়?” আমি বললাম, “আমার জন্মস্থান ঝালকাঠি।” তিনি হাসিমুখে বললেন, “আমার বাড়িও ঝালকাঠির রাজাপুরে।” তার নাম তন্ময়। বয়সে ছোট হলেও অত্যন্ত আন্তরিক একজন মানুষ।
আমি বাসায় গিয়ে মোবাইল চার্জে দিয়ে ভাত খেয়ে সোপায় বসেছিলাম।রাত তখন ১টা। হঠাৎ মনে পড়ল ঘরের সামনে গাড়িটির কথা তারপর প্যান্ট পরে আবারও বাইরে বের হলাম। ভেবেছিলাম, দেশের মানুষ, একটু গল্প করি। কিন্তু গল্প করতে করতেই রাত গভীর হতে লাগল। আমরা বসেছিলাম তিন রাস্তার মোড়ে। চারপাশ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আর আমার মনে একের পর এক প্রশ্ন জন্ম নিতে লাগল।
আমার মন বলছিল, “ভোর না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকি।” কারণ যিনি গাড়ির ভেতরে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন, তার প্রিয় মানুষগুলো কোথায়? কেউ কাঁদছে না, কেউ পাশে বসে নেই, কেউ তার জন্য রাত জাগছে না। অথচ দুদিন আগেও হয়তো তিনি ছিলেন স্বপ্ন, পরিকল্পনা আর ব্যস্ততায় ভরা একজন মানুষ।
আজ তিনি প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকা ভাড়ার একটি ফ্রিজিং গাড়ির ভেতরে শেষ সময় কাটাচ্ছেন। মৃত্যুর পরও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। জীবনের সমস্ত সংগ্রাম, সঞ্চয়, পরিশ্রম সবকিছুর শেষ পরিণতি যেন নীরব একটি গাড়ির ভেতরে শুয়ে থাকা। গাড়ির ড্রাইভার তন্ময় আমাকে কয়েকবার বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তখন আমি অন্যভাবে ওই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য তন্ময়কে বিভিন্ন প্রশ্ন করা শুরু করি যাতে প্রসঙ্গ পরিবর্তন হয়। কিছু সময় পর পর অত্র মহল্লার নাইট গার্ড আলমগীর বাঁশির হুইসেল দিতে দিতে আমাদের কাছে আসে। এবং আলমগীর গাড়ির ভিতরে থাকা ব্যক্তির সম্পর্কে মনের ভাব প্রকাশ করে।কি হলো এতো কাজ করে।বাসায় যাওয়াটা তো আমার মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত দেয়নি তাই তন্ময়ের ভালোবাসার অনুরোধের দাবি রাখতে পারিনি বাসায় গেলে আমার শিল্প সাধনা ব্যাহত হবে তাই মন সাড়া দেয়নি। নানা প্রশ্নের ভেতর দিয়ে রাত পার হতে লাগল। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। মানুষ জীবিকার সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। পরিবারকে ভালো রাখার সংগ্রামে পুরুষেরা রাস্তায় নামল। আর সেই গাড়ির ভেতরে শুয়ে থাকা মানুষটিও তো একজন পুরুষ ছিলেন। তিনিও হয়তো সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। কষ্ট করে তার একমাত্র কন্যাকে শিক্ষিত করেছেন, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছেন। কিন্তু নির্মম পরিহাস, মৃত্যুর মুহূর্তে সেই কন্যা তার পাশে নেই। তবুও আমি প্রার্থনা করি, তার কন্যার যাত্রা শুভ হোক। তিনি যেন দেশে ফিরে তার পিতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন এবং দাফনের কাজ সম্পন্ন করতে পারেন।
আমি এই অপরিচিত মানুষটির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।হে পিতা, আপনি ভালো থাকবেন। আপনাকে আমি স্যালুট জানাই। একটি রাত এভাবেই কেটে গেল। শিল্পসাধনা করতে এসে আজ আরেকটি রাত কাটালাম এক অপরিচিত মানুষের শেষ যাত্রার নীরব সাক্ষী হয়ে। সেই রাত আমাকে জীবনের আরেকটি শিক্ষা দিল মানুষের পরিচয় তার সম্পদে নয়, মানবতায়।
বিঃদ্রঃ এই লেখাটি বাস্তব যারা পড়বেন, সবাই এই পিতার জন্য শুভকামনা করবেন। সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে জান্নাতবাসী করেন এই প্রত্যাশা করি।
বাসায় ঢুকি ভোর ৫টায় তারপর লেখা শুরু করে ৬: ৩০ শে শেষ করি।
আমি আমার বাবার মৃত্যুর আগে কথা দিয়েছিলাম, সব সময় ভালো কাজের মাধ্যমে ভালো কিছু করার চেষ্টা করব। আজ বাবা নেই কিন্তু বাবাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মনে করে পথ চলি। আমি কাউকে ঠকিয়ে বড় হওয়ার পরিকল্পনা যেন কখনো না করি।
আজও সেই কথাই স্মরণ করে শিল্পসাধনা করি, মানুষের জন্য ভাবি।
আমি প্রকৃতি এবং পরিবেশ এবং মানুষের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি আমি বই পড়ে শিক্ষাগ্রহণ করতে অভ্যস্ত নই। বাস্তবতা আমাকে সঠিক শিক্ষা দিয়ে থাকে
৬ জুন রাতে বড় শিক্ষা অর্জন করলাম আমার বলে কিছু নেই।
মানবতাই হোক মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম- মিলন।






