, ,

উপসম্পাদকীয়

নিউজটি শেয়ার করুন

রাষ্ট্রের নৈতিক উচ্চতা পুনরুদ্ধার: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিপীড়িত সাংবাদিকদের মুক্তির প্রশ্ন

রাসেল আহমদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে যখন একটি সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ থাকে না, তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের ঘোষণা। বর্তমান সময় তেমনই এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এখন কেবল পেশাগত দাবি নয়, এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রের মৌলিক পরীক্ষা।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি কিংবা হামলার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাবলি দেখলে মনে হয় এই প্রবণতা আরও উদ্বেগজনক মাত্রা পেয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা দায়ের, হামলা, ভাঙচুর এবং ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত কয়েক শত সাংবাদিক মামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন।
এই পরিস্থিতি কেবল সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, এটি গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোর ওপর আঘাত। কারণ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না।

গণতন্ত্রের নৈতিক কাঠামো

গণতন্ত্রকে প্রায়ই নির্বাচন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে একাকার করে দেখা হয়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র একটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমালোচনার অধিকার এবং নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ অপরিহার্য উপাদান। নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি স্তম্ভ, কিন্তু একমাত্র স্তম্ভ নয়।
স্বাধীন সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর কাজ কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়; বরং ক্ষমতার ওপর নাগরিকের নৈতিক নজরদারি নিশ্চিত করা। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এসবই গণতান্ত্রিক জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
যখন সাংবাদিকরা ভয়ের মধ্যে কাজ করেন, তখন সংবাদ পরিবেশন বিকৃত হয়। আর যখন তথ্যপ্রবাহ বিকৃত হয়, তখন নাগরিকের সিদ্ধান্তও প্রভাবিত হয়। ফলে নির্বাচনসহ পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাস্তবে নানা ধরনের সরাসরি ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ এই সাংবিধানিক অঙ্গীকারকে প্রায়ই দুর্বল করে দেয়। কখনও মামলা, গ্রেপ্তার বা আইনি চাপ; কখনও বিজ্ঞাপন বণ্টনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ; আবার কখনও রাজনৈতিক প্রভাব, এসব মিলিয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক প্রতিশোধ নাকি ন্যায়বিচার?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিয়ে একটি জটিল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে রয়েছে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রশ্ন, অন্যদিকে রয়েছে কিছু সাংবাদিকের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ।
অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি অংশ সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে কাজ করেছে। কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দলীয় প্রচারণায় অংশ নেওয়া, রাজনৈতিক পদে থাকা কিংবা ক্ষমতার সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক আনুগত্য বা মত প্রকাশ করা অপরাধ নয়। সাংবাদিক যদি প্রকৃত অপরাধে জড়িত থাকেন, তাহলে তার বিচার আইনের মাধ্যমে হতে হবে। কিন্তু শুধুমাত্র মতামত, প্রতিবেদন বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এমনকি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের কারণে মামলা করা হলে তা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক নজির হয়ে দাঁড়ায়।
যখন রাষ্ট্র সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন পুরো গণমাধ্যম ব্যবস্থাই আতঙ্কের মধ্যে পড়ে যায়। ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা self-censorship জন্ম নেয়। সাংবাদিকরা তখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও নীরব থাকেন। এই নীরবতা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর।

ইতিহাসের শিক্ষা

বিশ্বের নানা দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, সংবাদমাধ্যমকে দমন করে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।
যেখানে গণমাধ্যম স্বাধীন থাকে না, সেখানে দুর্নীতি বাড়ে, প্রশাসনিক ব্যর্থতা আড়ালে থাকে এবং নাগরিক আস্থা কমে যায়। রাষ্ট্র যখন সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখে, তখন রাজনৈতিক মেরুকরণও বাড়ে।
অন্যদিকে যে রাষ্ট্র সমালোচনাকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করে, সেখানে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। কারণ সমালোচনা শেষ পর্যন্ত ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে।
সংবাদমাধ্যম আসলে আয়নার মতো। আয়না সুন্দর চেহারা যেমন দেখায়, তেমনি কুৎসিত দিকও দেখায়। কিন্তু আয়নাকে ভেঙে ফেললে বাস্তবতা বদলায় না; বরং নিজের মুখই অদৃশ্য হয়ে যায়।

দমননীতির বুমেরাং

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিয়েছে।
২০১৯ সালে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখকের নির্ধারিত বক্তৃতা অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে বাতিল করার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। যে বক্তৃতাটি হয়তো সীমিত পরিসরে হতো, সেটিই রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার কারণে জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছিল।
এই ঘটনাটি দেখায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রোধ করার চেষ্টা অনেক সময় বুমেরাং হয়ে যায়। কাউকে কথা বলতে দিলে তার বক্তব্য যতটুকু প্রভাব ফেলত, তাকে বাধা দিলে সেই ঘটনার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি হয়।
আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রবাহকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। কেউ যদি দেশে কথা বলতে না পারেন, তিনি বিদেশি গণমাধ্যমে বলবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তথ্য ছড়িয়ে পড়বে। ফলে দমননীতি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

মব সহিংসতা ও সাংবাদিক নিরাপত্তা

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনাও উদ্বেগজনক। কোনো সংবাদপত্র অফিসে হামলা মানে কেবল একটি ভবনের ক্ষতি নয়, এটি নাগরিকের জানার অধিকারকে আঘাত করা।
যখন সাংবাদিকদের হেনস্তা করা হয় বা সংবাদমাধ্যমে হামলা হয় এবং রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না, তখন এক ধরনের বিপজ্জনক বার্তা যায়, সমালোচনাকে সহিংসতার মাধ্যমে দমন করা যেতে পারে।
এটি গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কারণ তখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আইনের সুরক্ষার বদলে জনতার রোষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক প্রয়োজন
স্বাধীন সংবাদপ্রবাহ কেবল বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; সরকারের জন্যও অপরিহার্য।
যেখানে সমালোচনা নেই, সেখানে ভুল নীতি দীর্ঘদিন টিকে যায়। দুর্নীতি আড়ালে থাকে। প্রশাসনিক ব্যর্থতা সামনে আসে না।
গণমাধ্যমের সমালোচনা সরকারকে সতর্ক করে, নীতিনির্ধারণে সংশোধনের সুযোগ দেয় এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়ায়।
যে সরকার গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ নয় বরং অংশীদার হিসেবে দেখে, সেই সরকার দীর্ঘমেয়াদে বেশি স্থিতিশীল থাকে।

করণীয়: নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।
প্রথমত, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর নিরপেক্ষ পর্যালোচনা জরুরি। যেসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ভিত্তিহীন, সেগুলো প্রত্যাহার করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়বে।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন বণ্টন ও সম্প্রচার লাইসেন্স ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও নীতিনির্ভর করতে হবে, যাতে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে গণমাধ্যমকে পুরস্কৃত বা শাস্তি দেওয়া না হয়।
চতুর্থত, সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন।

গণতন্ত্রের পাঠ

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
গণতন্ত্রের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নয়, সহনশীলতার গভীরতায়। সমালোচনা শত্রুতা নয়, এটি আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া।
যে রাষ্ট্র সমালোচনাকে ভয় পায়, সে শেষ পর্যন্ত নিজেরই শক্তিকে দুর্বল করে। আর যে রাষ্ট্র সমালোচনাকে গ্রহণ করে, সে নৈতিক উচ্চতা অর্জন করে।
কারাবন্দী বা মামলার শিকার সাংবাদিকদের বিষয়ে ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত নেওয়া তাই শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে গণতন্ত্রের পথে নতুন আস্থা তৈরি হবে। অন্যথায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি রাষ্ট্রের কাঁধে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসবে।
রাষ্ট্রের শক্তি বন্দিত্বে নয়, মুক্তিতে। ভয় দেখিয়ে নয়, আস্থা তৈরি করে। সমালোচনাকে স্তব্ধ করে নয়, সংলাপের মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে- রাষ্ট্র এই সহজ কিন্তু গভীর সত্যটি কত দ্রুত উপলব্ধি করতে পারে তার ওপর।
#
লেখক: কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল : raselahmed1980bk@gmail.com
তারিখ: ২৮.০৪.২০২৬ ইং