আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে গড়িমসি, একটি স্বজনপ্রীতির প্রমান
তথ্য অধিকার আইন লঙ্ঘন এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অমান্য করার অভিযোগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার দাবি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন এবং সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলাম।
সাপ্তাহিক আলো পত্রিকার চিফ রিপোর্টার মো. মিরাজ ভূঁইয়ার দায়ের করা অভিযোগ থেকে জানা যায়, দীর্ঘ আট মাস ধরে আইনি প্রক্রিয়ায় তথ্য চেয়েও তিনি তা পাননি, যা সরকারি চাকরি আইন ও তথ্য অধিকার আইনের পরিপন্থী।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আইনি লঙ্ঘন
গত ৯ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেনের কাছে তার সম্পদের বিবরণী, নিয়োগপত্র ও বিভাগীয় মামলার নথিপত্র চেয়ে আবেদন করা হয়। আইনের ধারা ৯(১) অনুযায়ী ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরবর্তীতে আপিল কর্তৃপক্ষ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলামের কাছে আবেদন করা হলেও তিনি নির্ধারিত ১৫ দিনের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।
উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ উপেক্ষা:
অভিযোগের প্রেক্ষিতে এলজিইডি প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে গত ২১ সেপ্টেম্বর জরুরি ভিত্তিতে আপিল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী গত ২৮ সেপ্টেম্বর নির্বাহী প্রকৌশলীকে ৭ দিনের মধ্যে তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দেন। তবে ৫ অক্টোবর এক চিঠির মাধ্যমে নির্বাহী প্রকৌশলী তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি তথ্য অধিকার আইনের ধারা ৭(ঘ), ৭(জ) এবং ৭(দ)-এর দোহাই দিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তদন্তাধীন বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন।
আইনের অপব্যাখ্যা ও বিশেষজ্ঞদের মত:
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী কোনোভাবেই ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’র আওতায় পড়ে না। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ১৩ বিধি অনুযায়ী সম্পদ বিবরণী দাখিল করা একটি বিধিবদ্ধ দায়িত্ব।
এছাড়া উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নজির (যেমন: বেলা বনাম সরকার, রিট নং ৬৭৮৫/২০১৫) অনুযায়ী, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য গোপন করার সুযোগ নেই।
অভিযোগকারী মিরাজ ভূঁইয়া জানান, “তথ্য গোপন করা এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করা সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী গুরুতর অসদাচরণ। এটি সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত তথ্যের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।”
প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা:
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত ১২ অক্টোবর পুনরায় প্রধান প্রকৌশলী বরাবর বিস্তারিত অভিযোগ জমা দেওয়া হলেও অদ্যাবধি কোনো বিভাগীয় মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আইন অনুযায়ী, তথ্য প্রদানে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে জরিমানা করার বিধান রয়েছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ:
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে সুরাহা না হলে বিষয়টি তথ্য কমিশনে গড়াবে। এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েও অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করার কথা জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) সহ বিভিন্ন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এই ধরনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তথ্য গোপন করার প্রবণতা প্রকারান্তরে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়ে সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন এবং সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলামের নিকট জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।







