২৩ কোটির ‘কাগুজে’ হরিলুটের তদন্তের বদলে প্রমোশন এ যেন শুটকি মাছের গোডাউনে কালো বিড়াল
সরকারি চাকুরিতে তিনি একজন সদ্য সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী, যার বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণ সহ অভিযোগ পড়লেও অভিযোগ অনুসন্ধান কিংবা তদন্ত না করেই দেয়া হয়েছে রিএওয়ার্ড পোস্টিং । যার পেছনে রয়েছে সওজ অধিদপ্তরের দুই বড় কালো বিড়াল খ্যাত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। তাঁর জীবনযাত্রা, রাজকীয় বিলাসিতা আর বেনামী সম্পদের সাম্রাজ্য দেখলে মনে হতে পারে—তিনি যেন রূপকথার কোনো অঘোষিত রাজপুত্রের মতো জীবনযাপন করছেন! সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহর কর্মস্থল সুনামগঞ্জ হলেও সেখানে তিনি স্রেফ এক ‘খণ্ডকালীন অতিথি’। সপ্তাহে মাত্র দুই-তিন দিন দায়সারাভাবে অফিস করে বাকিটা সময় কাটান রাজধানীর রাজকীয় মেজাজে। কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার জন্য সড়কপথ নয়, সিলেট-ঢাকা রুটের আকাশপথই তাঁর প্রধান ভরসা। বিমানে চড়ে অফিস করা এবং বিপুল এই বিলাস ব্যয়ের অংক একজন সরকারি কর্মকর্তার সীমিত বেতনের সঙ্গে কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর চিত্র: কেবল সুনামগঞ্জেই নয়, চাকরিজীবনের শুরু থেকেই তিনি যেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই বুনেছেন দুর্নীতির জাল। সেই সিন্ডিকেটের বদৌলতে আজ তিনি শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়ের ওপর বসে আছেন।
অংশ ১: রাজধানীতে বিলাসিতা ও অঢেল ‘ভূমি সাম্রাজ্য’
অনুসন্ধানে সওজের এই প্রকৌশলীর যেসব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হদিস মিলেছে, তা রীতিমতো পিলে চমকে দেওয়ার মতো। নিজের অবৈধ অর্থ আড়াল করতে তিনি স্ত্রী স্মরণী হক, শ্বশুর নুরুল হক প্রধান, শাশুড়ি নিলুফার হক এবং মামা শ্বশুর মোক্তার হোসেন গাজীকে ‘বিকল্প ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
[আহাদ উল্লাহর অবৈধ অর্থ প্রবাহ]
│
┌──────────────┼──────────────┐
▼ ▼ ▼
[স্ত্রী: স্মরণী] [শ্বশুরকুল/মামা] [কাঞ্চন ফাউন্ডেশন]
– বিলাস ফ্ল্যাট – প্লট/একর জমি – অবৈধ অর্থ বৈধ করার
– প্লট ও জমি – হেবা দলিল ‘সেফ হ্যাভেন’
১. রাজধানীর অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট
এলিফ্যান্ট রোড: ১৬৯/১ নম্বর ঠিকানায় অবস্থিত ‘সপ্তক হক হেরিটেজ’ ভবনের সি-৭ নম্বর বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটি কেনা হয়েছে স্ত্রী স্মরণী হকের নামে।
লালমাটিয়া: বি-ব্লকের ২/৪ নম্বর ঠিকানায় ‘বিটিআই ফেয়ার ভিউ’ প্রকল্পে স্ত্রী স্মরণী হকের নামেই কেনা হয়েছে প্রায় ২২০০ বর্গফুটের আরও একটি বিশালাকার ফ্ল্যাট। শুধুমাত্র এই দুই ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্যই কয়েক কোটি টাকা।
২. পূর্বাচলে কাঠায় কাঠায় প্লট
রাজউকের ‘পূর্বাচল নতুন শহর’ প্রকল্পেও আহাদ উল্লাহর সম্পদের বিস্তৃতি চোখ ধাঁধানো:
১৭ নম্বর সেক্টরে ৫ কাঠা এবং ৯ নম্বর সেক্টরে ৩ কাঠার দুটি বিশাল প্লট রয়েছে স্ত্রীর নামে, যার বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ১০ কোটি টাকা।
পূর্বাচলে স্ত্রীর নামে আরও একটি ৫ কাঠার প্লট ক্রয় ও হস্তান্তরের স্পষ্ট তথ্য মিলেছে।
শাশুড়ি নিলুফার হকের (পেশায় গৃহিণী) নামে ১৭ নং সেক্টরের ৩০৩ নং রোডের ৩৪ নং প্লটটি ক্রয় করে ২০২০ সালের শুরুর দিকে ‘হেবা দলিল’-এর মাধ্যমে স্ত্রী স্মরণী হকের নামে নামজারি করা হয়।
৩. খিলক্ষেত ও নারায়ণগঞ্জে বিশাল ভূমি সাম্রাজ্য
খিলক্ষেত (জোয়ার সাহারা): ৮.২৫ শতাংশ জমির ওপর তাঁর একটি বহুতল ভবন বর্তমানে নির্মাণাধীন, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা।
নারায়ণগঞ্জ (কুতুবপুর মৌজা): গত কয়েক বছরে স্ত্রী স্মরণী হকের নামে ১৫টি পৃথক দলিলে প্রায় ১৬২ শতাংশ জমি কিনেছেন তিনি, যার বাজারদর ১০ কোটি টাকারও বেশি।
শ্রীনগর ও রূপগঞ্জ: ট্যাক্স ফাইলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে স্ত্রী স্মরণী হক তাঁর স্বামী আহাদ উল্লাহর কাছ থেকে কাগজে-কলমে শ্রীনগরে ২৭ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ জমি এবং রূপগঞ্জের গুতিয়াব মৌজায় ৮.২৫ শতাংশ জমি পেয়েছেন।
নিজ নামে সম্পত্তি: আহাদ উল্লাহর নিজ নামে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের দোকাছি মৌজায় ৫৪ শতাংশ, সমষপুর মৌজায় ৭৪ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ জমি এবং রূপগঞ্জের গুতিয়াব মৌজায় ৮.২৫ শতাংশ জমি রয়েছে।
বিশাল জমি দান: রূপগঞ্জের পূবেরগাঁও আতলাপুর এলাকায় স্ত্রী স্মরণী হকের নামে কেনা ৩২৮ শতাংশ জমি তিনি ‘কাঞ্চন ফাউন্ডেশন’-কে দান করে অঢেল বিত্তের প্রদর্শন করেছেন।
৪. শাশুড়ির নামে ৬৫০ শতাংশের বেশি জমি!
স্বচ্ছতার আবরণে নিজের কালো টাকা ঢাকতে আহাদ উল্লাহ শাশুড়ি নিলুফার হকের নাম ব্যবহার করে নারায়ণগঞ্জের কুতুবপুর মৌজায় ১০টিরও বেশি দলিলে সাড়ে ৬শ’ শতাংশেরও বেশি (৬৫০+ শতাংশ) জমি কিনেছেন (খতিয়ান নং: ২৭৬৩, ৪২০৭, ৪৬৫৪, ৪৮৮৪, ৪৯৯৩, ৫১৫১, ৫২৭৮, ৫৪২৭, ৫৬৯৫ ইত্যাদি)। একইভাবে শ্বশুর নুরুল হক প্রধানের নামে কুতুবপুর মৌজায় ৭৮.৫ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে।
অংশ ২: কাঞ্চন ফাউন্ডেশন, দামি গাড়ি ও কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স
২০০৬ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে যোগ দেওয়ার মাত্র ৪-৫ বছরের মাথায় (২০১০-১১ সালে) শ্বশুর নুরুল হক প্রধানকে সামনে রেখে ‘কাঞ্চন ফাউন্ডেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নেন আহাদ উল্লাহ। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার আড়ালে এই ফাউন্ডেশনটি ছিল মূলত ঘুষ, কমিশন ও দুর্নীতির কোটি কোটি টাকা নিরাপদে গচ্ছিত রাখা ও বৈধ করার এক সুরক্ষিত ‘মানি লন্ডারিং চ্যানেল’।
সম্পদের ধরন
বিস্তারিত বিবরণ / নম্বর
আনুমানিক অবস্থান / মান
ব্যক্তিগত গাড়ি
ঢাকা মেট্রো-ঘ-১২-৯৬৩১
মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহর নিজ নামে
স্ত্রীর গাড়ি
ঢাকা মেট্রো-ঘ-১১-৮৯৭৩
স্ত্রী স্মরণী হকের নামে
শেয়ার ও বিমা
কোটি টাকার জীবন বিমা ও স্টক মার্কেট
পরিবারের সদস্যদের নামে বড় অঙ্কের শেয়ার
ব্যাংক স্থিতি
একাধিক ব্যাংকে গচ্ছিত নগদ টাকা
কোটি কোটি টাকার এফডিআর ও জমা সঞ্চয়
অংশ ৩: সুনামগঞ্জে ২৩ কোটির ‘কাগুজে’ হরিলুট ও ডিজিটাল ডাকাতি
আহাদ উল্লাহর এই কুবেরের ধন অর্জনের নেপথ্য কৌশল উন্মোচিত হয় সুনামগঞ্জে তাঁর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে। ২০২৪-২০২৬ মেয়াদের দুই বছর মেয়াদী একটি মহাসড়ক সংস্কার প্রকল্পের কাজ শেষ না হতেই এবং ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়েই তুলে নেওয়া হয়েছে শতভাগ ‘চূড়ান্ত বিল’ (Final Bill)! ২৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পের নেপথ্যে রয়েছে নিজস্ব হট মিক্সড প্ল্যান্ট জালিয়াতি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং সরকারি ফাইলের ভেতর প্রকাশ্য সিন্ডিকেটের তালিকা।
প্রকল্পের সারসংক্ষেপ ও দুর্নীতির ৪ মূল স্তম্ভ
প্রকল্প: সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক (R-280) এর ২৩তম কিলোমিটার (গোবیندগঞ্জ) থেকে ৪৬তম কিলোমিটার (ডাবর পয়েন্ট) পর্যন্ত আংশিক শক্তিশালীকরণ ও পিচ ঢালাই (DBS Base & Wearing Course)।
আইডি ও বাজেট: e-GP ID: 1174457; অনুমোদিত বাজেট: ২৩ কোটি ২৭ লাখ ৩৪ হাজার ৭৫৫ টাকা।
ভাগ্যবান ঠিকাদার: মেসার্স সালেহ আহমেদ অ্যান্ড ব্রাদার্স (M/S Saleh Ahmed & Brothers)।
১. কাজ না করেই চূড়ান্ত বিল (IPC-02) গায়েব!
মে ২০২৬-এর ফাইলে দেখা যায়, অর্ধেকের বেশি কাজ বাকি রেখেই কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ১ম অন্তর্বর্তীকালীন বিলের বদলে সরাসরি ‘IPC No. 02 & Final’ অর্থাৎ চূড়ান্ত বিল পাস করিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি সওজের ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ‘ডিজিটাল তছরুপ’।
২. সরকারি ফাইলে ‘সিন্ডিকেট মেম্বার’-এর নাম
সরকারি নথির ২ নম্বর পৃষ্ঠায় প্রকাশ্যেই “Syndicate Members” শিরোনামে পল্লব কুমার ঘোষ নামের এক বহিরাগত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের ভেরিফিকেশন অনুলিপি যুক্ত করা হয়েছে—যা প্রশাসনিক দেউলিয়াত্ব ও যোগসাজশের স্পষ্ট প্রমাণ।
৩. ‘হট মিক্সড প্ল্যান্ট’ জালিয়াতি ও হাতে লেখা গোপন নোট
চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প এলাকায় আধুনিক ‘হট মিক্সড প্ল্যান্ট’ বসানোর কথা থাকলেও তা করা হয়নি। নিম্নমানের কাজের বিরুদ্ধে সওজের মাঠ কর্মকর্তারা আপত্তি তুললেও নথির ৮ নম্বর পৃষ্ঠায় হাতে লিখে নির্দেশ দেওয়া হয়: “উক্ত Batching Plant বা Hot mixed Plant যেখানেই করা হোক না কেন তা Unqualified করার কোনো সুযোগ নাই…”।
৪. কুড়াল-হাতুড়ির ‘আধুনিক’ সংস্কার
কোটি কোটি টাকার আধুনিক ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বদলে সস্তা শ্রমিকদের দিয়ে কুড়াল ও ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে সড়কের পিচ উপড়ে ফেলে তড়িঘড়ি করে নামমাত্র প্রলেপ দিয়ে সরকারি টাকা পকেটে ভরা হয়েছে।
শীর্ষ কর্মকর্তার শাস্তিমূলক ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’
মে ২০২৬-এ যখন ২৩ কোটি টাকার চূড়ান্ত বিল পাসের ফাইল দ্রুত অনুমোদনের টেবিলে যায়, ঠিক তখনই নড়েচড়ে বসে মন্ত্রণালয়। অনিয়মের গন্ধ পেয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সিলেট সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো: হাফিজুর রহমানকে (পরিচিতি নং: ০০৫০৭২) ঢাকায় বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করে।
১৬ মে ২০২৬-এর আদেশে তাঁকে বদলি করা হলেও তিনি পদ আঁকড়ে থাকার জোর তদবির চালান। তবে মন্ত্রণালয়ের অনড় অবস্থানে ২০ মে’র নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর ২৩ মে ২০২৬ তারিখে তাঁকে চূড়ান্তভাবে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ (Stand Release) বা অবমুক্ত করা হয়।
জনমনে ক্ষোভ: তদন্তের মুখোমুখি ‘কুবেরের ধন’
একজন সরকারি কর্মকর্তার সীমিত আয়ের বিপরীতে এই পাহাড়সম ‘কুবেরের ধন’ অর্জিত হওয়া দেশের প্রশাসনিক জবাবদিহিতার জন্য এক চড় মারার মতো। প্রতিটি কর্মস্থলে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে তিনি যে কমিশন বাণিজ্য গড়ে তুলেছেন, সুনামগঞ্জের ২৩ কোটি টাকার কাগুজে লুটপাট তার একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ মাত্র।
ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (CPTU) সমন্বয়ে গঠিত যৌথ দল সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের বাস্তব অবস্থা সরজমিনে পরিমাপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সচেতন নাগরিকদের দাবি—কেবল বদলি বা স্ট্যান্ড রিলিজের নাটক নয়; সওজ প্রকৌশলী আহাদ উল্লাহর অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত চালিয়ে পুরো সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনতে হবে।







