, ,

রেসিপ্রোকাল বাণিজ্য চুক্তি: সমঝোতায় বন্দী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব

নিউজটি শেয়ার করুন

রাসেল আহমদ: বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ (এআরটি) এখন আর কেবল একটি বাণিজ্যচুক্তি নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, নীতিনির্ধারণী সার্বভৌমত্ব এবং রাজনৈতিক সততার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টা আগে ওয়াশিংটন ডিসিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা হলেও সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো- বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর রহস্যজনক নীরবতা।

যে চুক্তিকে ঘিরে দেশের কৃষি, শিল্প, ওষুধ খাত, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নীতি এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য কাঠামো নিয়ে এত বড় প্রশ্ন উঠেছে, সেখানে ক্ষমতাসীনদের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর অবস্থানও অস্পষ্ট। কেউ সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে না, আবার কেউ দৃঢ়ভাবে বিরোধিতাও করছে না। ফলে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে- দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে কি এ নিয়ে কোনো নীরব সমঝোতা রয়েছে?

চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর ১৩১টি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা মাত্র ৬টি। ৩২ পৃষ্ঠার দলিলে “Bangladesh shall” শব্দযুগল এসেছে ১৩১ বার, আর “US shall” মাত্র ৬ বার। আন্তর্জাতিক চুক্তির ভাষায় “shall” মানে বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি। অর্থাৎ কাঠামোগতভাবেই এটি একটি অসম চুক্তি- এমন অভিযোগ এখন কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, আইনি প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে এই চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সরকার ও সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট নয়, বরং পরস্পরবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দাবি, চুক্তির আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে অবহিত করা হয়েছিল। যদিও শুরুতে জামায়াত তা অস্বীকার করলেও পরে দলীয় আমির ডা. শফিকুর রহমান বিষয়টিকে একাধিক চুক্তির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং বাস্তবতার আলোকে দেখার কথা বলেন। অন্যদিকে জামায়াতের নির্বাচনী শরিক এনসিপিও এ বিষয়ে কার্যত নীরব।

অপরদিকে সরকারের ভেতর থেকেও বক্তব্যে অসঙ্গতি দেখা গেছে। উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার দাবি করেছেন, বিএনপি-জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়েই চুক্তিটি করা হয়েছে এবং এ কারণেই তারা প্রকাশ্যে বিরোধিতা করছে না। কিন্তু এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছিলেন, চুক্তিটি সংসদ ও সংসদের বাইরে আলোচনা করে বাস্তবায়ন করা হবে। আবার আরেক উপদেষ্টা বলেছেন, চুক্তিটি বাতিল নয়, বরং পর্যালোচনার মাধ্যমে দেখা হবে- যা নীতিগত অনিশ্চয়তাকেই স্পষ্ট করে।

এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ইঙ্গিত করেছেন, বিষয়টি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার চাপ ও কৌশলগত সমঝোতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে বিরোধী দলগুলো প্রকাশ্য বিরোধিতায় যাচ্ছে না।

ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠছে- রাষ্ট্রের সার্বভৌম স্বার্থ ও ১৮ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো কি বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই ধরনের নতজানু অবস্থানেই একমত, নাকি এটি কেবল দায় এড়ানোর কৌশলগত নীরবতা?
তবে বিএনপি সরকার সংসদে চুক্তি নিয়ে আলোচনা করবে, এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।

ফলে প্রশ্ন উঠছে- ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধিতায়, বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো কি একই নীতিতে একমত?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে “জাতীয় স্বার্থ” শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাস্তবে যখন এমন একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে দেশের অর্থনৈতিক নীতির বড় অংশ ভবিষ্যতের জন্য প্রভাবিত হতে পারে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা হয়ে ওঠে অস্পষ্ট। অথচ অতীতে তুলনামূলক অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়েও দেশের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়েছে।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি’ নিয়ে দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছিল। বিরোধী দলগুলো তখন সেটিকে “গোলামির চুক্তি” আখ্যা দিয়ে মাঠে নেমেছিল। অথচ বর্তমান চুক্তি নিয়ে সেই মাত্রার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নেই। কারণ কি কেবল ক্ষমতার সমীকরণ, নাকি আন্তর্জাতিক বাস্তবতার কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিগত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে?

রেসিপ্রোকাল বানিজ্যচুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত প্রায় সাড়ে চার হাজার পণ্যের ওপর কাস্টমস শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক শূন্যে নামাতে সম্মত হয়েছে। আরও দুই হাজারের বেশি পণ্যের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে শুল্ক প্রত্যাহারের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, জ্বালানি পণ্য, মোটরযান, তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, কৃষিপণ্য, দুগ্ধজাত খাদ্য, গরুর মাংস, পোল্ট্রি, বাদাম, ফল ও পুনর্নির্মিত শিল্পপণ্য।

বাংলাদেশ আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা মার্কিন নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান অনুযায়ী তৈরি গাড়ি সহজে গ্রহণ করবে, মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অনুমোদিত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রবেশ সহজ করবে এবং সীমান্তপারের তথ্য প্রবাহের অনুমতি দেবে।

বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পেয়েছে? যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে সীমিত কিছু সুবিধার কথা বলা হলেও সেটি শর্তসাপেক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক শূন্য শুল্ক সুবিধা পেতে পারে। অর্থাৎ সুবিধাটিও যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামালের সঙ্গে বাঁধা।
প্রশ্ন হলো- এটি কি প্রকৃত রপ্তানি সুবিধা, নাকি নতুন ধরনের নির্ভরতা?

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো বড় অংশে আমদানি শুল্কনির্ভর। বিপুলসংখ্যক পণ্যে শুল্ক শূন্যে নামালে রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। সরকার তখন হয় অভ্যন্তরীণ কর বাড়াবে, নয়তো ঋণনির্ভর হবে। দুই ক্ষেত্রেই চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর কেউই জনগণকে স্পষ্ট করে বলছে না- এই ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে।

সবচেয়ে বড় আঘাত আসতে পারে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে বিপুল পরিমাণ গম, সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতার কথা আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষক এখনো প্রযুক্তি, ভর্তুকি ও বাজারসুবিধায় পিছিয়ে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাত উচ্চ ভর্তুকিনির্ভর। ফলে স্থানীয় কৃষক ও খামারিরা সরাসরি প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারার ঝুঁকিতে পড়বেন।

ওষুধ শিল্প নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যদি মার্কিন পেটেন্ট সুরক্ষার কারণে বাংলাদেশের জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা আসে, তাহলে দেশের সাধারণ মানুষকে কয়েক গুণ বেশি দামে ওষুধ কিনতে হতে পারে। বাংলাদেশের শক্তিশালী ওষুধ রপ্তানি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিচ্ছে না।

চুক্তির আরেকটি দিক হলো দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় প্রতিশ্রুতি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য আমদানি, বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা এবং কৃষিপণ্য আমদানির বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারও ইঙ্গিত দেয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস বলে, বাণিজ্যচুক্তি অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

এখানেই বড় প্রশ্ন- বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে গিয়ে একমুখী নির্ভরতার দিকে যাচ্ছে?

চুক্তির সমর্থকেরা বলছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতায় বড় বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আপস করতেই হয়। কিন্তু আপসেরও সীমা আছে। কোনো রাষ্ট্র যখন নিজের কৃষি, ওষুধ, শিল্প ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়, তখন সেটি কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকে না; সেটি সার্বভৌম নীতিনির্ধারণের প্রশ্নে পরিণত হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো স্বচ্ছতার অভাব। এত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনায় আনা হয়নি। জনগণের কাছেও পূর্ণাঙ্গ দলিল প্রকাশ করা হয়নি। সংবিধানের ১৪৫-ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপনের কথা থাকলেও সেই সাংবিধানিক চেতনা এখানে কতটা অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থের কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে যখন দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে এমন একটি চুক্তি হয়, তখন তাদের নীরবতা উদ্বেগ তৈরি করে। জনগণের মনে তাই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক- ক্ষমতার পালাবদল হলেও কি নীতিগত জায়গায় সবাই একই কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অস্পষ্টতা ও গোপনীয়তার ভেতর করা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বহু সময় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বোঝা হয়ে চাপে। আবার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে করা চুক্তি উন্নয়নের নতুন দুয়ারও খুলে দেয়।

রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট বাংলাদেশের জন্য কোন পথে যাবে, তা এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট- এটি শুধু অর্থনৈতিক দলিল নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতারও পরীক্ষা।

এখন প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ চুক্তিপত্র জনসম্মুখে প্রকাশ, সংসদীয় পর্যালোচনা এবং বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে জাতীয় বিতর্ক। কারণ রাষ্ট্রের নীতি কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের সম্মিলিত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা যেন সাময়িক ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বা ক্ষমতার নীরব সমঝোতার কাছে জিম্মি না হয়ে পড়ে- এই সতর্কতাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ই-মেইল: raselahmed1980bk@gmail.com
তারিখ: ১৪ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ