, ,

বিআরটিসি ডিপো ব্যবস্থাপক শাহরিয়ার বুলবুলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি ও লাভজনক পদে বসার অভিযোগ

নিউজটি শেয়ার করুন

আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের দায়বদ্ধতা থাকলেও নেওয়া হচ্ছে না ব্যবস্থা

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের কল্যাণপুর বাস ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. শাহরিয়ার বুলবুলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক লাভজনক পদে দায়িত্ব পালনের অভিযোগ উঠেছে। তার অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী পদে থাকা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিআরটিসির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যেখানে প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত নির্ভরশীল, সেখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জাতীয় স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে নারায়ণগঞ্জ, জোয়ারশাহারা, মতিঝিল বাস ডিপোতে দায়িত্ব পালনকালে শাহরিয়ার বুলবুল প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় তিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সুসম্পর্কের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা সরকারি নথি এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করার কোনো স্বাধীন উৎস এখনো সামনে আসেনি বলে জানান বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা।

পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আমলে শাহরিয়ার বুলবুল নিজেকে প্রয়াত রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নাতি জামাই হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এইচ টি ইমাম ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা। তার রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে শাহরিয়ার বুলবুল ভালো ভালো ডিপোগুলোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন। উল্লেখ্য, এইচ টি ইমামের পুত্র তানভীর ইমাম সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন তানভীর ইমাম, তার পুত্র মাহিন ইমাম এবং কন্যা মানিজে ইসমত ইমামের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎস বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগে পৃথক মামলা দায়ের করে। তানভীর ইমামের নামে ৩০ কোটি ৬৩ লাখ ৩ হাজার ৮৩৬ টাকা, পুত্র মাহিন ইমামের নামে ৩ কোটি ৭ লাখ ৪৯ হাজার ৫৪৮ টাকা এবং কন্যার নামেও অবৈধ সম্পত্তির অভিযোগ আনা হয়েছে।

সম্প্রতি কল্যাণপুর বাস ডিপোর দায়িত্বে রাখার কারণে তাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা ও সমালোচনা। একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ ডিপো ও ইউনিটের দায়িত্বের ক্ষেত্রে সবসময় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না, ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। অভিযোগ রয়েছে, কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে শাহরিয়ার বুলবুল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সমালোচকদের মতে, এসব দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে শুধুই প্রশাসনিক বিবেচনা কাজ করেছে, নাকি রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব ছিল তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। তবে তার ব্যক্তিগত তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রের বিস্তারিত প্রকাশ না করে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে ব্যক্তিগতভাবে হেনস্থা না করে আইনের মাধ্যমে দায়বদ্ধ করাই উচিত।

বিআরটিসিতে দুর্নীতি ও অনিয়ম নতুন কিছু নয়। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিআরটিসির ২১টি ডিপোকে দুর্নীতির কেন্দ্রস্থল বলে অভিহিত করেছিলেন এবং ডিপো ম্যানেজারদের দুর্নীতির কারণে ২৫ কোটি টাকার ৫০টি ভলভো বাস অচল হয়ে গেছে বলে জানান। তিনি সব ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং তদন্ত প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে দুদক দিয়ে তদন্ত করানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন। মন্ত্রী কমলাপুর ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে আনিত একটি অভিযোগ পাঠ করে শুনান যেখানে বসে থাকা গাড়িকে চলাচল দেখিয়ে বিল করা, পুরাতন মবিল দেখিয়ে নতুন মবিলের বিল, নিম্নমানের টায়ার সংগ্রহ করে বেশি দামের বিল করে অর্থ আদায় করার অভিযোগ ছিল। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী বিআরটিসির দুই শীর্ষ কর্মকর্তা গোলাম ফারুক ও নূর-ই আলম ১২ বছরে প্রায় ৬ কোটি টাকা লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গোলাম ফারুক এখন উপমহাব্যবস্থাপক (এস্টেট) পদে এবং নূর-ই আলম ব্যবস্থাপক (অপারেশনস) পদে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া বিআরটিসির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি, অনিয়ম ও নারী কেলেংকারির অভিযোগে দুদকে লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। চলতি বছরের ২৫ অক্টোবর বিআরটিসির জেনারেল ম্যানেজার, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সহ ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতি দমন কমিশনে তাজুল ইসলামের দুর্নীতি, সম্পদ ও নারী কেলেংকারীর বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা সম্পর্কে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা গুজব বা অভিযোগের পর্যায়ে ফেলে না রেখে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের মুখোমুখি ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করাও গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।

এ বিষয়ে শাহরিয়ার বুলবুলের বক্তব্য জানার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে। উল্লেখ্য, শাহরিয়ার বুলবুল ইতোপূর্বে কল্যাণপুর বাস ডিপোর ম্যানেজার হিসেবে সাইবার ট্রাইবুনাল আদালতে একটি মামলা করেছিলেন বলে জানা গেছে। সরকারি তথ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী তিনি বর্তমানে কল্যাণপুর বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ইউনিট প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ফলে বিআরটিসিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো এখন কেবল ব্যক্তি-নির্ভর বিতর্ক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নকেও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা সম্পর্কে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা গুজব বা অভিযোগের পর্যায়ে ফেলে না রেখে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের মুখোমুখি ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করাও গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন বিআরটিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।