, ,

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারিজুরের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা চলমান থাকলেও স্বপদে বহাল

নিউজটি শেয়ার করুন

জমি দখল, আর্থিক অনিয়ম ও ছাত্র আন্দোলন দমনে অর্থ সহায়তার অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) মো. হারিজুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও মামলা চলমান থাকলেও তিনি এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। এ নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতার দাবি উঠেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি জমি দখল ও আর্থিক অনিয়ম, প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার প্রভাব, ফ্ল্যাট বরাদ্দে স্বজনপ্রীতি এবং ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার আন্দোলন দমনে অর্থ সহায়তার অভিযোগ।

পল্লবীর ঝিলপাড় সরকারি জমি দখল ও ভাড়া আত্মসাতের মামলায় ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এ মামলা দায়ের করে। মামলা নং ২৯, তারিখ ১৮ জুলাই ২০২৫। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী ঝিলপাড় এলাকার প্রায় সাত একর সরকারি জমি অবৈধভাবে দখলে রাখা হয়। সেখানে ৬৫০ থেকে ৭০০ টিনের ঘর তুলে ভাড়া আদায় করা হয়। ২০০৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত আনুমানিক ৩৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ভাড়া আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে মো. হারিজুর রহমানসহ চারজন এনএইচএ কর্মকর্তা এবং ঢাকা ১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা আসামি। ২১ জানুয়ারি ২০২৫ সালে জমি উদ্ধার করা হয়। মামলা দণ্ডবিধির ৪০৯, ২১৭ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় চলমান। দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন সংবাদ সম্মেলনে জানান, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে সরকারি জমি দখলে রেখে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ভাড়া আদায় করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং সরকারি কর্মকর্তারা এতে সহযোগিতা করেছেন।

২০২৪ ছাত্র আন্দোলন সংশ্লিষ্ট মামলায় ২০২৫ সালের ১২ মে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় মামলা রুজু হয়। অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের ওভারব্রিজের নিচে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও দমনে অর্থ সহায়তা এবং ষড়যন্ত্র। এ মামলায় মো. হারিজুর রহমানকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার অন্যতম মূল অর্থদাতা হিসেবে আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মামলায় দাঙ্গা, হাঙ্গামা এবং হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা: ফেরদৌসী বেগম সাংবাদিকদের বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। মামলা থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মিরপুর সেকশন ৯ আবাসিক ফ্ল্যাট প্রকল্প ও অন্যান্য প্রকল্প সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে মিরপুর ৯ নম্বর সেকশনে বাস্তবায়নাধীন স্বপ্ননগর দ্বিতীয় পর্যায় প্রকল্পের ১৫টি ১৪ তলা ভবনে ১ হাজার ৫৬০টি ফ্ল্যাট নির্মাণকে কেন্দ্র করে জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পে অকেজো ও অব্যবহৃত মালামালের প্রকৃত বাজারমূল্য প্রায় ৭৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা হলেও টেন্ডার প্রক্রিয়ার আগেই গোপনে তা বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি ঢাকতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মাত্র ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা মূল্য দেখিয়ে ভুয়া নথিপত্র অনুমোদন করানো হয়।

মোহাম্মদপুরের কনকচাঁপা ও দোলনচাঁপা প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে মো. হারিজুর রহমান প্রকল্প পরিচালক এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মূল বরাদ্দ পরিকল্পনা পরিবর্তন করে প্রকল্পের বাজেট ৪৬৯ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৪১ কোটি ১১ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। ১৯৬০ সাল থেকে বসবাসকারী মূল ক্ষতিগ্রস্ত কলোনির বাসিন্দাদের জন্য সংরক্ষিত ২৫৩টি ফ্ল্যাট কমিয়ে ১১৮টিতে নামিয়ে আনা হয়। বাকি ১৬৬টি ফ্ল্যাট লটারি ও নীতিমালা লঙ্ঘন করে সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ আমলা, মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীর পিএস, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এখানে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওসার মোর্শেদের নামও উঠে এসেছে।

দীর্ঘদিন ঢাকায় পোস্টিং ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগে প্রায় দুই দশক ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় টেন্ডার, জমি ও বরাদ্দ নিয়ে প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের ঢাকায় বদলি হয়ে আসতে দিচ্ছেন না। দালাল নির্ভরতা ও সেবায় হয়রানির অভিযোগও আছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না এবং কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী প্রতিবাদ করলে তাৎক্ষণিক বদলি বা বরখাস্তের হুমকি দেওয়া হয়।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে (আপডেট মার্চ ২০২৬) মো. হারিজুর রহমান এখনো তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল), ঢাকা সার্কেল হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন। তাঁর কার্যালয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দপ্তর, ঢাকা সার্কেল, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, ৮২ সেগুনবাগিচা, ঢাকা ১০০০।

গুরুতর অভিযোগ ও মামলা চলাকালীন সংবেদনশীল পদে যেখানে প্রকল্প, টেন্ডার, জমি ও বরাদ্দ সংশ্লিষ্ট কাজ পরিচালিত হয়, সেখানে বহাল রাখা নিয়ে স্বার্থের সংঘাত ও প্রমাণ সংরক্ষণের প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞ ও অভিযোগকারীরা বলছেন, স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজনীয় নথিগুলো হলো পোস্টিং ও ট্রান্সফার ইতিহাস, আয়কর ও সম্পদ বিবরণী, জমির রেকর্ড, ই জিপি ও টেন্ডার ডকুমেন্টস, পরিমাপ বই, বোর্ড মিটিং মিনিটস, ফ্ল্যাট বরাদ্দ তালিকা এবং দুদক ও পুলিশ মামলার নথি।

এনএইচএ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং দুদকের কাছে এখন স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্তের দাবি জোরালো। সরকারি জমি, পাবলিক মানি ও আবাসন অধিকার সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানের নিজ কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। তদন্ত ও বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংবেদনশীল পদ থেকে সাময়িক বিরত রাখা নীতিগতভাবে যৌক্তিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল), মো. হারিজুর রহমানের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।