নগর ভবন অডিটোরিয়াম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন
সম্মানিত সভাপতি, মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস; বিশেষ অতিথি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় প্রশাসক মোঃ আবুস সালাম; বিশেষ অতিথি পিটার জর্জ এল মাইস, ইউনিসেফ ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহামেদ; মোঃ হাবিবুর রহমান খান, মহাসচিব বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও ড. ফিরদউসী কাদরী আইসিডিডিআর’বি; উপস্থিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ; উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ-
আসসালামু আলাইকুম।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে উপস্থিত হতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে আজ আমরা “প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন pOCV ক্যাম্পেইন ২০২৬”-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করছি।
আজকের দিনটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক। কারণ, আমরা শুধু কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছি না; বরং রোগের ঝুঁকি চিহ্নিত করে আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
কলেরা প্রতিরোধে কেন এই উদ্যোগ
কলেরা একটি প্রতিরোধযোগ্য এবং চিকিৎসাযোগ্য রোগ। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হলে তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার কারণে এটি খুব দ্রুত জীবনহানির কারণ হতে পারে। নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন এবং কার্যকর রোগ নজরদারির পাশাপাশি Oral Cholera Vaccine বা OCV কলেরা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উপকরণ। WHO-ও স্পষ্টভাবে বলছে, টিকাদানের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন WASH ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অপরিহার্য।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে নগরায়ন, জনসংখ্যার ঘনত্ব, নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের সীমাবদ্ধতা, মানুষের চলাচল এবং কিছু এলাকার বিশেষ ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আমাদেরকে একটি targeted, evidence-based এবং preventive approach গ্রহণ করতে হচ্ছে।
এ কারণেই রোগের বোঝা, পূর্ববর্তী টিকাদানের ইতিহাস, জনসংখ্যার ঘনত্ব, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এবং সংক্রমণ বিস্তারের আশঙ্কাসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রস্তুতকৃত Multi-Year Plan of Action-এর আওতায় পর্যায়ক্রমে দেশের ১৪৪টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ও থানায় এই প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম বছরে ৫১ লাখের বেশি মানুষকে সুরক্ষা
২০২৬ সালের প্রথম পর্যায়ে ১৪টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ও থানার প্রায় ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে এই ক্যাম্পেইনের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই রাউন্ডের জন্য প্রয়োজন প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ৫০ হাজার ডোজ টিকা।
এই ১৪টি অগ্রাধিকার এলাকার মধ্যে রয়েছে—ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচর; ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের শের-ই-বাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও; মুন্সিগঞ্জ সদর; কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, হোসেনপুর ও তাড়াইল; নারায়ণগঞ্জ সদর; এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগর। এই এলাকাগুলো কোনো অনুমানের ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়নি। Priority Areas for Multisectoral Interventions PAMI এবং OCV prioritization-এর বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
দুই রাউন্ডে চলবে টিকাদান
আজ ২০ আগস্ট জাতীয় পর্যায়ে এই ক্যাম্পেইনের শুভ উদ্বোধনের পর প্রথম রাউন্ড ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় রাউন্ড ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত পরিচালিত হবে। দুই ডোজের মধ্যে ন্যূনতম ১৪ দিনের ব্যবধান থাকবে। এই কর্মসূচির অনুমোদিত জাতীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচিত এলাকার ১ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী জনগোষ্ঠীকে, নির্ধারিত eligibility criteria অনুসরণ করে টিকা প্রদান করা হবে।
আমি সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে অনুরোধ করব আপনারা নির্ধারিত সময়ে টিকা গ্রহণ করুন এবং দুই রাউন্ডেই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করুন।
Digital health ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ
এই কর্মসূচিতে আমরা প্রযুক্তিরও কার্যকর ব্যবহার করছি। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ VaxEPI প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধনের মাধ্যমে নিজস্ব e-Health Card পাবেন। এর মাধ্যমে টিকা গ্রহণের তথ্য সংরক্ষণ, coverage monitoring, programme supervision এবং পরবর্তী মূল্যায়ন আরও সহজ ও নির্ভুল হবে।
আমাদের লক্ষ্য শুধু টিকা দেওয়া নয় কে টিকা পেলেন, কোথায় coverage gap রয়েছে, কোথায় দ্রুত corrective action প্রয়োজন এসব তথ্য বাস্তব সময়ে ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক সুযোগ
আজকের এই উদ্যোগের আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। বিশ্বব্যাপী Oral Cholera Vaccine-এর সরবরাহ সংকটের কারণে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে preventive cholera vaccination কার্যক্রম মারাত্মকভাবে সীমিত ছিল। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির পর WHO, Gavi এবং UNICEF preventive campaign পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দেয়। সেই আন্তর্জাতিক উদ্যোগে বাংলাদেশকে প্রায় ১০.৩ মিলিয়ন ডোজ বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়—যা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
আমাদের জাতীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী ১ কোটি ৩ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ ডোজ OCV সরবরাহে Gavi সহায়তা দিচ্ছে। এই ভ্যাকসিন WHO pre-qualified এবং এর টিকা ও সংশ্লিষ্ট পরিচালন ব্যয়েও Gavi-এর গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে। আমি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে Gavi, WHO, UNICEF, IFRC, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, icddr,b এবং এই কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল উন্নয়ন সহযোগীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
টিকাই একমাত্র সমাধান নয়, আমি একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বলতে চাই কলেরা প্রতিরোধে টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু টিকা একা যথেষ্ট নয়।
আমাদের নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদ খাবার পানি, উন্নত স্যানিটেশন ও পয়ঃনিষ্কাশন, সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুত ও সংরক্ষণ, রোগের দ্রুত শনাক্তকরণ, সময়মতো ORS ও চিকিৎসা, এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
WHO-এর Global Roadmap to 2030-ও কলেরা নিয়ন্ত্রণে early detection and rapid response, hotspot-based multisectoral intervention এবং কার্যকর সমন্বয়- এই সমন্বিত পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বৈশ্বিক লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে কলেরাজনিত মৃত্যু ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা।
বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক অঙ্গীকারের অংশীদার।
স্থানীয় সরকার ও মাঠ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান
আমি সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, EPI টিম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানাচ্ছি কোনো যোগ্য ব্যক্তি যেন টিকাদানের আওতার বাইরে না থাকে।
মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল, কমিউনিটি সভা, মাইকিং এবং স্থানীয় পর্যায়ের সব যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আমাদের প্রস্তুতি পরিকল্পনায় vaccination site, team registration, cascade training, vaccine distribution, IEC materials, social mobilisation, AEFI preparedness এবং daily monitoring-এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আমি বিশেষভাবে নির্দেশনা দিতে চাই এই ক্যাম্পেইন পরিচালনার কারণে নিয়মিত EPI কার্যক্রম যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়।
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান
সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ,
জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির সফলতায় আপনাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভ্যাকসিন সম্পর্কে ভুল তথ্য, গুজব বা বিভ্রান্তি যেন মানুষের মধ্যে অনীহা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য সঠিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে আমি গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাই।
মানুষকে জানাতে হবে কলেরা প্রতিরোধযোগ্য। টিকা গ্রহণ একটি কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। পরিষ্কার পানি ও স্যানিটেশন অপরিহার্য। ডায়রিয়া হলে দ্রুত ORS শুরু করতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে হবে।
স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি
এই ক্যাম্পেইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হচ্ছেন আমাদের মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী, টিকাদানকারী ও স্বেচ্ছাসেবকবৃন্দ। আপনারাই বাড়ির কাছে, স্কুলে, কমিউনিটিতে এবং টিকাদান কেন্দ্রে মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করবেন। আপনাদের আন্তরিকতা, দক্ষতা এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতাই এই কর্মসূচিকে সফল করবে।
আমি প্রত্যাশা করি vaccine safety, cold chain, accurate record keeping, AEFI management এবং respectful service delivery প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্ধারিত guideline কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।
আমাদের লক্ষ্য প্রতিরোধভিত্তিক শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা
আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই যেখানে মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর শুধু চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করবে না; বরং রোগ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত হবে, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনীয় সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে।
আজকের pOCV Campaign সেই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ। আমাদের লক্ষ্য শুধু ২০২৬ সালে ৫১ লাখের বেশি মানুষকে কলেরা থেকে সুরক্ষা দেওয়া নয়; আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো দেশের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পর্যায়ক্রমে একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই cholera prevention system গড়ে তোলা। বর্তমান Multi-Year Plan of Action পর্যায়ক্রমে দেশের ১৪৪টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছে।
আমি বিশ্বাস করি সরকারের নেতৃত্ব, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিষ্ঠা, স্থানীয় সরকারের অংশগ্রহণ, উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং সর্বোপরি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা কলেরার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারব।
আসুন আমরা একটি স্পষ্ট বার্তা নিয়ে আজকের অনুষ্ঠান থেকে বের হই
“কলেরা প্রতিরোধযোগ্য সঠিক সময়ে টিকা নিন, নিরাপদ পানি পান করুন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন এবং সুস্থ থাকুন।”
আমি “প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬”-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।
এই কর্মসূচির সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করছি




