সাম্প্রতিক সময়ে পরশুরামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে।পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দারা রয়েছেন চরম আতঙ্কে।চুরি, ডাকাতি , দখল বানিজ্য, অপহরণ, কিশোর গ্যাং, মাদক, বখাটেদের উৎপাত, নারী হেনস্থা, রাজনীতিক অস্থিরতায় সংঘাত, আত্মহত্যার মত অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় উপজেলার সাধারন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রশাসনেরর ভূমিকার সমালোচনা করেছেন অনেকেই। স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে না পারায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ও প্রশ্ন তুলেছেন স্হানীয়রা। গত মাসে পরশুরাম উপজেলা রোডে কাদের টাওয়ারে এক শিক্ষিকার বাসায় গৃহকর্মীর আত্মহত্যার ঘটনার একমাসের অধিক সময় পার হলেও জড়িতদের এখনো আইনের আওতায় আনতে পারেনি থানা পুলিশ।তবে পুলিশের দাবি, এবিষয়ে জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে পরশুরাম বাজার ও তার আশেপাশে চুরি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এই চুরির ঘটনা থেকে বাসাবাড়ি, দোকান, ঔষধের ফার্মেসি কিছুই রেহাই পাচ্ছেনা। গত কয়েক মাস ধরে প্রতিরাতে উপজেলায় কোথাও না কোথাও চুরির ঘটনা তো ঘটছেই সেই ধারাবাহিকতায় গত কয়েকদিনে পরশুরাম দক্ষিণ বাজারে সাহাব মিয়ার দোকান, পরশুরাম গার্লস স্কুল সংলগ্ন বাসা,গুথুমা চৌমুড়িতে মেঘনাদ বাবুর ফার্মেসী এবং অলকা কালীরবাজারের দোকানে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটেছে।ধারাবাহিক এসব চুরির ঘটনায় ব্যবসায়ীসহ স্হানীয় দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও গ্রামে কৃষকের গরু ছাগল চুরিও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। পৌর এলাকা সহ বিভিন্ন এলাকায় ওইসব চুরির ঘটনা বেড়েছে।
এদিকে পুরো উপজেলা জুড়ে বেড়েছে মাদকবিক্রি,মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এর উপদ্রব সহ ইভটিজিং।
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য ক্রাইসিস চলছে।এ সুযোগে একটি পক্ষ চাঁদাবাজি, দাখল বানিজ্যসহ সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে। এসব অপরাধমূলক কাজে তারা উঠতি বয়সি তরুণদের ব্যবহার করছে। তবে এবিষয়ে অনেকেই মানতে নারাজ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের সিনিয়র কয়েকজন নেতা বলেন, “আগামীর দেশ নায়ক তারেক রহমান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বিএনপির কোনো নেতাকর্মী কোনো রকম দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকতে পারবে না। যদি জড়িত থাকে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। তারপরেও পরশুরামে যারা দলের নাম ভাঙিয়ে অপরাধ করছেন তারা দলের কেউ না। তারা দলের শত্রু হিসেবে চিহিৃত। দলীয় এমন বিশৃঙ্খলার কারণ ইঙ্গিত করে ওইসব নেতা বলেন, পরশুরামে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির পূর্নাঙ্গ কমিটি নেই। তিন বছর ধরে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে দলীয় কর্মকাণ্ড চলছে। এ আহ্বায়ক কমিটিও তিনভাগে বিভক্ত। যার কারণে দলীয় শৃঙ্খলা নেই। পূর্নাঙ্গ কমিটি হলে দলে শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশা করেন তিনি। এদিকে, পরশুরাম উপজেলায় ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ও সাধারন মানুষের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিবাদে পরশুরামে বৈষম্যবিরোধী কয়েকজন ছাত্র নেতা বলেন,‘ ছাত্র- জনতা জুলাই আগস্টে রক্ত দিয়ে নতুন করে দেশ স্বাধীন করেছে। আমরা চেয়েছিলাম একটি সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা। যেখানে সাধারন মানুষ স্বাভাবিক ভাবে জীবনযাপন করেবেন। সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু চিত্র ভিন্ন। গত কয়েক মাসে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। মানুষের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান ওইসব ছাত্র নেতা।
এ বিষয়ে পরশুরাম থানার অফিসার ইনচার্জ আশ্রাফুল ইসলাম ভুট্টো জানান,‘ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতি রক্ষা করতে থানা প্রশাসন বদ্ধপরিকর । তিনি বলেন চুরি হচ্ছে। চোর ও ধরা পড়ছে। কিন্তু যখন ই মামলার কথা আসে তখন এই বিষয়ে মামলা করার জন্য বাদী খুঁজে পাওয়া যায় না। এবিষয়ে কেউ -ই রাজী হয়না। এমনকি যার জিনিস পত্র চুরি হয়েছে তিনি ও মামলার বাদী হতে চাননা। ফলে ওইসব চোরদের আদালতে চালান করা হলে ও নির্দিষ্ট বাদী ও সাক্ষীর অভাবে তারা আদালত থেকে ছাড়া পেয়ে আবার চুরি শুরু করে।
তিনি বলেন ,মাদকের ব্যপারে জিরো টলারেন্স নীতি চলছে। মাদকসেবী সহ মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে এবং বিভিন্ন স্থানে টিম করে কমিউনিটি পুলিশ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন গৃহকর্মীর আত্মহুতির বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে। জড়িতদের অবশ্যই আইনে আওতায় আনা হবে।
এদিকে পরশুরাম উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেড়েছে। পরশুরাম গার্লস স্কুলের আশপাশে ,সুবার বাজার চৌমুড়ি ,ঘাটঘর ব্রীজ সহ মডেল স্কুলের সামনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলাকালীন সময়েও ইভটিজিংয়ের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্কুল ছাত্রী বলেন, ‘গত রোববার সকালে অনন্তপুর মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের যাওয়ার সময় ব্রীজের উপর কিশোর গ্যাং এর একটি দল মেয়েদের উত্যক্ত করে। সেদিন আমার আম্মুকেও ওরা উত্যক্ত করা থেকে রেহায় দেইনি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই ছাত্রী।
অন্যদিকে মাদকের প্রভাব ও বেড়েছে এই উপজেলায়। মাদক বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। মাদকসেবীরা ধরা পড়লে ও বিক্রেতারা রয়ে গেছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। বিশেষ করে পরশুরাম বাজারের কাউতলী রোডের কলোনি, স্টীল ব্রীজ সংলগ্ন ,খোন্দকিয়া দাস পাড়া , বাস স্টেশনের দক্ষিণ দিকের মহল্লা, বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন ব্রীজ ও রেললাইন, গরু বাজার, টিএন্ডটি ভবন , বৈদ্যের দীঘির পাড়, অনন্তপুর রাস্তার মাথাসহ পরশুরাম পৌর অফিস সংলগ্ন এলাকায় প্রকাশ্যে গাঁজা ও বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই চিত্র দেখা মেলে বিলোনীয়ার তালুক , চৈতন্য বাজার ও গুচ্ছ গ্রামে। সেখানে মাদক প্যাকেটজাত, সেবন ও বিক্রি হচ্ছে নিয়মিত।
স্থানীয় সচেতন মহলের একাধিক সুত্রের দাবি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে নিয়মিত টহল, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং মাদক ও ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সমাজে চরম বিশৃঙ্খলতা দেখা দিবে।







