, ,

তারাগঞ্জে ভিডব্লিউবি’তে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি

নিউজটি শেয়ার করুন

রংপুরের তারাগঞ্জে চলতি বছরের ভিডব্লিউবি’র তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুস্থদের পরিবর্তে সরকারি চাকুরিজীবীর স্ত্রী, কলেজ ছাত্রী, স্কুল শিক্ষিকা, মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত নারী, প্রবাসীর স্ত্রী, পাকা বাড়িওয়ালা যাদের কয়েক বিঘা থেকে চার/পাঁচ বিঘা পর্যন্ত জমি আছে, এমন সম্পদশালী পরিবারের স্ত্রীর নাম এবারে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এসব পরিবারের নারীরা পাচ্ছে ভিডব্লিউবি’র চাল। কার্ড প্রতি ৭ থেকে ৮ হাজার করে টাকার বিনিময়ে এসব নারীদেরকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে, তালিকাভুক্তির ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো উপজেলার অর্ধেকের বেশি অসহায় নারী এ চাল পায়নি বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ ইং অর্থ বছরে উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের মধ্যে আলমপুরে ৫৪৮ জন, কুর্শায় ৬২৫ জন, ইকরচালীতে ৫৮৩ জন, হাড়িয়ারকুঠিতে ৭৫৮ জন ও সয়ার ইউনিয়নে ৫৬৯ জনসহ মোট ৩০৮৩ জন নারী এই ভিডব্লিউবি’র কার্ড পেয়েছেন। একজন কার্ডধারী প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে ২৪ মাস এ চাল পাবে। ভিডব্লিউবি’র কার্ডের নির্দেশিকায় বলা আছে তালিকায় ১ম অগ্রাধিকার পাবে স্বামীহারা দুস্থ নারী, ২য় অগ্রাধিকার পাবে পরিবারের প্রধান নারী যার অন্য কোন আয়ের উৎস নেই, ৩য় অগ্রাধিকার পাবে ১৫ শতকের নিচে জমি আছে এমন পরিবারের নারী, ৪র্থ অগ্রাধিকার পাবে অতি সামান্য আয় করে জীবিকা নির্বাহ করে যাদের বসতবাড়ির অবস্থা খড় কিংবা টিনের ছাউনি, বাঁশের খুঁটি ও বেড়া দিয়ে তৈরি এমন পরিবারের নারীরা। দুই কিংবা চার বছর আগে ভিডব্লিউবি’র চাল পেয়েছে এমন নারীসহ সরকারিভাবে অন্য কোন সুবিধাপ্রাপ্ত নারীদেরকে এই ভিডব্লিউবি’র আওতাভুক্ত করা যাবে না। কোন অবস্থায় স্বচ্ছল কিংবা পাকা বাড়ির মালিকের স্ত্রীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কুর্শা ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের রহিমপুর জাফরিপাড়া গ্রামের আজিজার রহমানের ছেলে রাশেদুল ইসলাম প্রায় ৪ বছর ধরে যশোর জেলায় সেনাবাহিনীতে চাকরি করছেন। প্রায় আড়াই বিঘা জমি আছে। ৫ কক্ষবিশিষ্ট পাকা বাড়ির মালিক এই রাশেদুলের স্ত্রী উম্মি আক্তার পাচ্ছে ভিডব্লিউডি’র চাল। একই ওয়ার্ডের পশ্চিম রহিমপুর কুটিপাড়া গ্রামের আলতাব হোসেনের অবিবাহিত মেয়ে ও সয়ার ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের ফরিদাবাদ পুটিমারি গ্রামের আফজালুল হকের অবিবাহিত মেয়ে কাজলী খাতুন পাচ্ছে এই চাল। কোম্পানিতে চাকরি করে প্রায় ২০ হাজার টাকা বেতন পায় সয়ার ৯নং ওয়ার্ডের শেখপাড়া কাংলাচড়া গ্রামের হরিশ চন্দ্র রায়। স্বচ্ছল পরিবার ও ৬ কক্ষ বিশিষ্ট পাকা বাড়ির মালিক হরিশের স্ত্রী লতা রানী পাচ্ছে এ চাল। ঠিক একইভাবে স্বচ্ছল পরিবার ও চাকুরিজীবী সয়ার ৪নং ওয়ার্ডের বারাপুর গ্রামের রহমতুল্লাহর স্ত্রী মোবাশ্বেরা বেগম ও ৫নং ওয়ার্ডের উত্তর দামোদরপুর পাশারিপাড়া গ্রামের হেলালের স্ত্রী নুরুননাহার পাচ্ছে চাল।

এদিকে, স্বচ্ছল ও সম্পদশালী পরিবার যাদের ৪ থেকে ১০ কক্ষ বিশিষ্ট পাকা বাড়ি আছে এবং এক বিঘা (৬০ শতক) থেকে আট বিঘা পর্যন্ত জমি আছে। এমন পরিবারের নারীরা পাচ্ছে ভিডব্লিউবি’র চাল। এরা হলেন- সয়ার ১নং ওয়ার্ডের শ্যামগঞ্জ বাজার পাড়ার লাল দাস রায়ের স্ত্রী সুফলা রানী, শ্যামগঞ্জ কাচারীপাড়ার নয়ন চন্দ্রের স্ত্রী মমতা রানী। সয়ার ২নং ওয়ার্ডের উত্তর সয়ার পশ্চিম পাড়া গ্রামের নওয়াব আলীর স্ত্রী রুমা আক্তার, শিয়ালগাড়ি গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী তানজিনা খাতুন। সয়ার ৩নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ সয়ার চেন্সপাড়া গ্রামের রহমত আলীর স্ত্রী মৌসুমী খাতুন ও রুবেল হোসেনের স্ত্রী রাজিয়া খাতুন। সয়ার ৪নং ওয়ার্ডের বারাপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের শফিকুল ইসলামের স্ত্রী নাজমিন নাহার ও শফিকুল ইসলামের আপন ছোট ভাই সাদে কুলের স্ত্রী সোহাগী আক্তার এবং একই পাড়ার মাসুদ রানার স্ত্রী নাসিরা বানু। সয়ার ৫নং ওয়ার্ডের উত্তর দামোদরপুর বুড়িরহাট গ্রামের আব্দুল মজিদের মেয়ে মর্জিনা আক্তার, বড়দোলাপাড়া গ্রামের ফাহিনুর ইসলামের স্ত্রী সোহাগী বেগম, রোস্তম আলীর স্ত্রী সোহাগী বেগম, পাশারি পাড়া গ্রামের হেলালের স্ত্রী নুরুননাহার, দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী আলেকজোন, পঞ্চায়েতপাড়া গ্রামের আনোয়ারুলের স্ত্রী মুক্তা আক্তার। সয়ার ৬নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ দামোদরপুর দোলাপাড়া গ্রামের নাজমুল ইসলামের স্ত্রী রাহেনা বেগম, মাটিয়ালপাড়া গ্রামের প্রবাসী আলামিনের স্ত্রী পারভীন আক্তার, ইব্রাহিমের স্ত্রী সাবিনা বেগম, জুলজালালের স্ত্রী মিনারা আক্তার, মিল্লাত বাবুর স্ত্রী ছাবিনা বেগম। সয়ার ৭নং ওয়ার্ডের ফরিদাবাদ বোতলপাড়া গ্রামের মনতাজ আলীর স্ত্রী এস্মোতারা, ফরিদাবাদ গ্রামের বাসিন্দা বর্তমান সৌদি আরব প্রবাসী আসাদুল খাঁর স্ত্রী শাহানাজ বেগম। সয়ার ৮নং ওয়ার্ডের কাজীপাড়া দীঘলপাড়া গ্রামের অহিদুল ইসলামের স্ত্রী মবেনা বেগম, রবিউল ইসলামের স্ত্রী মবিনা বেগম। ৯নং ওয়ার্ডের শেখপাড়া ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের আক্কাছ আলীর স্ত্রী গোলেজা বেগম, কাজীপাড়া জুম্মাপাড়া গ্রামের এনামুল হকের স্ত্রী সামিরা খাতুন, শাহাবুল ওরফে শাহাদুলের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা, আজহারুল ইসলামের স্ত্রী নাছরিন বেগম, শেখপাড়া পোদ্দার পাড়া গ্রামের আব্দুল খালেকের স্ত্রী হাছনা বেগম, আব্দুল খালেকের আপন বোন আদুরী খাতুন, শেখপাড়া প্রামাণিক পাড়া গ্রামের রশিদুল ইসলামের স্ত্রী আবেয়া খাতুন, শেখপাড়া কাংলাচড়া গ্রামের মাখন রায়ের স্ত্রী বিনা রানী রায়, সুনীল রায়ের স্ত্রী সুভদ্রা রানী, অনন্ত রায়ের স্ত্রী শেফালী রানী ও অনন্ত রায়ের ছেলে দিবস রায়ের স্ত্রী প্রমিলা রানী, শেখপাড়া শাইল পুকুর গ্রামের শফিকুল খাঁর স্ত্রী লায়লাতুল খানম পাচ্ছে ভিডব্লিউবি’র চাল।

ওদিকে, কুর্শা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের বড়গোলা নদীপাড়া গ্রামের গোলজার হোসেনের স্ত্রী মোস্তাকিমা আক্তার, আতোয়ারের স্ত্রী আফরোজা বেগম এবং আতোয়ারের আপন ভাই আনোয়ারের স্ত্রী আম্বিয়া খাতুন, মোক্তারের স্ত্রী খুশি আক্তার। খনিরামপুর ঝাকুয়াপাড়া গ্রামের এরশাদের স্ত্রী ইনছানা আক্তার, শফিউলের স্ত্রী মৌসুমী খাতুন এবং শফিউলের আপন ভাই রাফিউলের স্ত্রী সাবিনা বেগম, লাল মিয়ার স্ত্রী রিক্তা খাতুন, তাহেরের স্ত্রী রেখা খাতুন। কুর্শা ৮নং ওয়ার্ডের খিয়ারপাড়া গ্রামের বাবু লালের স্ত্রী শেফালী রানী, জীবন রায়ের স্ত্রী সিথি রায়, সরকারপাড়া গ্রামের দেবদাসের স্ত্রী কবিতা বিশ্বাস, রহিমপুর মধ্যপাড়া গ্রামের বুলবুলের স্ত্রী আলবিনা বেগম, রহিমপুর হাজীপাড়া গ্রামের আবুল হোসেনের স্ত্রী শাবানা বেগম, জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মল্লিকা বেগম, সাইদুর রহমানের স্ত্রী তহমিনা বেগম। ৯নং ওয়ার্ডের রহিমপুর জাফরিপাড়া গ্রামের রাশেদুল ইসলামের স্ত্রী উম্মি আক্তার, খান সাহেবপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী নারগিস খাতুন, একরামুলের স্ত্রী ইতি বেগম, বাহার উদ্দিনের স্ত্রী মহসেনা আক্তার, মমিনুলের স্ত্রী নাসরিন নাহার, পশ্চিম রহিমপুর কুঠিপাড়া গ্রামের মজিবরের স্ত্রী দুলালী বেগম, ওই পাড়ার শাহজাহানের অবিবাহিত বোন আয়েশা বেগম পাচ্ছে ভিডব্লিউবি চাল। কুর্শা ইউনিয়নের ঝাকুয়াপাড়া গ্রামের বুলবুলি, হোসনেয়ারা, পেয়ারী, রহিমপুর গ্রামের আনোয়ারি, গোলাপী, লেবুজা, সয়ার দোলাপাড়া গ্রামের পারুল, রওশনা, মাটিয়ালপাড়া গ্রামের আয়েশা সিদ্দিকা, সয়ার দীঘলটারী গ্রামের আনজুয়ারা, শাহিনা, মনুজা, সবেজাসহ অনেকেই জানান, ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে দেড় বিঘা থেকে ৫ বিঘা পর্যন্ত জমি আছে এমন পাকা বাড়িওয়ালা সম্পদশালী পরিবারের নারীকে দেওয়া হয়েছে চালের কার্ড। শুধু কুর্শা ও সয়ার ইউনিয়নেই নয়, ইকরচালী ও হাড়িয়ারকুঠিতেও তালিকা প্রণয়নে ব্যাপকভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। তালিকাভুক্ত নারীদের মধ্যে হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের মন্ডলপাড়া গ্রামের আমির হোসেনের স্ত্রী রাশেদা বেগম, বারোঘড়িয়া গ্রামের মোজাফফর হোসেনের স্ত্রী দিলুফা, খারুভাজ গ্রামের প্রতিবন্ধী মিজানুর রহমানের স্ত্রী লাইজু বেগম ও আব্দুস সামাদের মেয়ে শিরিনা বেগমসহ অনেকেই জানান, আমরা তালিকাভুক্ত হওয়ার পর পরিষদের পক্ষ থেকে ছবি তোলা হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান না থাকার সুযোগে ইউপি সচিব অনিমেষ রায় আমাদের কাছ থেকে ৬ হাজার করে টাকা চেয়েছে। টাকা দিতে নাই পাই। এই জ্যৈষ্ঠ্যে আমাদের এখনো পর্যন্ত চালও দেয়নি। এছাড়া সয়ার ইউনিয়নের দীঘলপাড়া গ্রামের আশরাফুলের স্ত্রী সোয়ানা বেগম বলেন, টাকার বিনিময়ে ইউপি চেয়ারম্যান পাইলট আমার নামের কার্ডে ছবি লাগিয়ে একই এলাকার গোলবারের স্ত্রী শামছুনাহারকে চাল দিচ্ছেন। অনেক যোগাযোগ করেও আমাকে চাল দেওয়া হয়নি। এই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পেয়ে সাবেক ইউএনও রুবেল রানা পাঁচ ইউনিয়নে তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এই তদন্ত কমিটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক এবং হাড়িয়ারকুঠি ও ইকরচালী ইউনিয়নের ভিডব্লিউবি’র তদন্তকারী কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, দায়িত্ব দেওয়ার পর আমি দুই ইউনিয়নের তালিকাভুক্তদের প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেছি। তদন্তকালে দেখা গেছে, পাকা বাড়িওয়ালা যাদের এক থেকে পাঁচ বিঘা পর্যন্ত জমি আছে এমন সম্পদশালী পরিবারের তালিকাভুক্ত নারীদের মধ্যে হাড়িয়ারকুঠিতে ১১৮ জন এবং ইকরচালীতে ১১৪ জনের নাম রয়েছে। তিনি আরও বলেন, দুই ইউনিয়নে ২৩২ জনের নাম বাদ পড়ার কথা থাকলেও কাউকে বাদ দেওয়া হয়নি। সবাইকেই চাল দেওয়া হচ্ছে। তাহলে তদন্ত কমিটি গঠনের কি দরকার ছিল। এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে ভিডব্লিউবি’র উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মল্লিকা বেগমের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।