রীনা পারভীন: চাকরি শুরু করার তিন মাসের মধ্যে প্রথম সন্তানের মা হলাম। মা হবার জন্য মাতৃত্ব ছুটি নামে একটি ছুটি পেলাম। নতুন চাকরি। ছুটি বাড়ানোর স্বপ্ন ছিল স্বপ্নের বাইরে। অগত্যা ছুটি শেষ হওয়ার সাত দিনের মাথায় কর্মস্থলে হাজিরা দেবার সব প্রস্তুতি শেষ করলাম। মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের মাথার কোষে কোষে উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তা পুঞ্জিভূত মেঘের মতো দানা বাঁধতে থাকে। এসব দুশ্চিন্তার কারণ একটিই। এত ছোট সন্তান রেখে আমি ঢাকায় কি করে চাকরি করবো! একজন বিশ্বস্ত কাজের লোকের খোঁজে সবাই হয়রান হয়ে গেল।খোঁজাখুঁজির শেষ পর্যায়ে ত্রিভুবনে কেউ নেই- এমন এক নারীর সন্ধান পাওয়া গেল।
তিন মাস নির্ঘুম রাতের সব ঘুম দুই চোখে বাসা বেঁধেছিল। অপুষ্ট ও লিকলিকে গড়নের সন্তানকে সেই মানুষটির কোলে দিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। কেউ বেশি ঘুমালে কথায় বলে, ‘মরার ঘুম ঘুমায়।’ আমি সেদিন মরার ঘুম ঘুমিয়েছিলাম। চাকরির ৩৩ টা বছর এভাবেই আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। আর সে জেগেছিল। তার নাম কমলা বেগম, বয়স ৪৫ বছর। গলায় বড় সাইজের একটি গয়টর। ফ্যাশফ্যাশে গলার স্বর। গায়ের রং ফর্সা। লম্বা কালো দীঘল চুল। ত্রিভুবনে আপন কেউ নেই। পান খেলে ঠোঁট টুকটুকে লাল হয়। কমলা বেগমের সবচেয়ে বড় গুণ বিশ্বস্ততা ও উদারতা।
একদিন কমলা বেগমের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তার স্বামীর কথা। ‘তোমার স্বামীর কথা বলো।’ জবাবটি ছিল পিলে চমকানোর মতো! ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলেছিল, ‘হ্যারে তো শত্রুরা দা বডি দিয়া কোপাইয়া মারছে।’ এরপর স্বামী সম্পর্কে আর কোন প্রশ্ন করিনি। কাজের ফাঁকে আবার একদিন জিজ্ঞেস করে বসলাম, ‘তোমার ছেলে মেয়ে নেই?’ জবাব দিল, ‘আছে। একটা মাইয়া। ‘জন্মের পর মাইয়ার বাপে জোর কইরা ছিনাইয়া লইয়া গ্যাছে।’ এ্যরপর আর কোনদিন মাইয়াডা দেহি নাই।’ ‘তুমি কার কাছে থাকতে?’ ক্যা? আমার থাহার জায়গার অভাব? ‘যে চাচারা স্বামীর থাইক্যা আমারে ছাড়াইয়া আনছে সেই চাচারা আমারে লালন পালন করছে। বাপ ছিল না। চাচারাই সব করতো।’ চাচাগো খুব জেদ ছিল।’ আমারে স্বামীর কাছ দিয়া ছাড়াইয়া আনছে। আরো কত কি করছে, কে জানে! কমলা বেগমের শেষ কথাটার মধ্যে আমি আটকে ছিলাম এক যুগ। পরে কমলা বেগমের কথাবার্তায় বুঝতে পেরেছিলাম চাচারাই তার স্বামীর হত্যাকারী।
এরপর জীবনের আরো অনেক সময় পার হয়েছে। আরো এক সন্তানের মা হয়েছি। কমলা বেগমেরও এ পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা বেড়েছে। দিন নাই, রাত নাই কাজের মধ্যেই ডুবে থাকে। তার ক্লান্তিহীন জীবনে আমরাই তার পরমাত্না হয়ে উঠলাম। ভাইবোনরা অনেক সময় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করত, ‘কমলা, তোমার সাথে কি জ্বীন ভূত আছে? এত কাজ করো কি করে?’ হেসে বলতো, ‘কাম না করলে খামু কী?’ কমলা বেগমের সব দায়িত্ব আমার। বেতনের যে টাকা পেত তা অবলীলায় ভাই, বোন, ভাতিজা সবাইকে বিলিয়ে দিত। আগে জানতাম কমলা বেগমের কেউ নেই। এখন ধীরে ধীরে অনেকেই তার খোঁজ খবর নিতে শুরু করেছে। তবে সবারই অভাবের সংসার। তাদের দুঃখ যেন তার দুঃখ। শত বারণ করেও কমলা বেগমের বেতনের টাকা জমানোর সুযোগ হতো না। এ উদারতার প্রতিদান ছিল শূন্য। তার বিপদে কাউকে দেখেনি। আফসোস করে কমলা বলতো, ‘আপনারা ছাড়া পৃথিবীতে আমার আপন কেউ নেই।’ কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই তা আবার ভুলে যেত। প্রিয়জনের কোন বিপদ-আপদের কথা শুনলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে আমাদেরও বিষয়টি গা সওয়া হয়ে গেছিলাম। টাকার গন্ধে মৌমাছির মতন তাকে সবাই ছেঁকে ধরতো।
গলার গয়টর (ঘ্যাগ) অপারেশনের জন্য অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছি। কিন্তু অপারেশনে রাজি হয়নি। বলতো,’ শ্বাস গ্যালে শ্বাস আর আইবে না।’ বাধ্য হয়ে কমলা বেগমের অপারেশনের আশা ছেড়ে দেই।
এভাবেই সময় বাতাসের মতো ভেসে ভেসে কখন যেন বয়সের মধ্যাহ্ন শুরু হয়ে গেল! চাকরিতে অনেক উন্নতি হয়েছে। উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রতিনিয়ত আমাকে সংসার থেকে দূরে আরো দূরে নিয়ে গেছে। বিদেশে যেতাম। সন্তানদের জন্য তেমন চিন্তার কারণ নেই। কমলা তো আছে। তবে কঠিন এক মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা আমাকে পীড়া দিত। বিদেশ ফেরত স্বামী দেশের চাকরি বাকরির তেমন একটা সুযোগ না পেয়ে চব্বিশ ঘন্টা ঘরে বসে ছেলেদের আদর্শ সন্তান তৈরির প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তিনি এ কাজে সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। সন্তানদের উপর স্বামীর কঠোর উপদেশ, নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনে কমলা বেগমের ঘোর আপত্তি। এ নিয়ে বাসার পরিস্হিতি প্রায়ই উত্তপ্ত হতো। আমি কমলা বেগমের উপর অনেকবার ক্ষিপ্ত হয়েছি। তাকে বাড়িও পাঠিয়ে দিয়েছি। আবার তাকে ফিরিয়েও আনতে হয়েছে। কারণ তাকে বাদ দিয়ে আমি অসম্পূর্ণ। চাকরিজীবী মায়ের সন্তানদের নিরাপত্তা সর্বাগ্রে। অনেক বছর পরে ছেলেরা বড় হয়ে বলেছিল, ‘তুমিতো অফিসে চলে যেতে! আমাদের রেখে যেতে বাবা মানে বাঘ। আমরা থাকতাম ‘বাঘের খাঁচায়।’ তখন বোধোদয় হতো বাবার কঠিন শাসন থেকে বাঁচাতে কমলা বেগমই ছিল দুই সন্তানের ত্রাণকর্তা। ভালবাসার কত ধরন! বাবার কঠিন শাসন, উপদেশ কচি মনের ‘ইচ্ছার ডানাগুলোকে’ দিনের পর দিন নীরবে এতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, যা পরে অনুধাবন করে ভীষণভাবে অনুতপ্ত হয়েছি। সেসব দিনগুলোতে উভয় দিক রক্ষা করে ছেলেদের কঠোর শাসনের হাত থেকে বাঁচাতে কমলা বেগমকে অনেক কৌশলের আশ্রয় নিতে হত। আমি অফিস থেকে ফিরলে অনেক সময় নালিশ বৈঠক বসতো। কিন্তু পরিস্থিতি কখনোই বদলায়নি। দ্বিমুখী যুদ্ধ ক্ষেত্রের মধ্যে সংসার ধর্ম পালনের কত শত কাহিনী আজও দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে।
ঘরের বাইরেও কমলা ছিল এক সর্দার। মুরগির বাচ্চা চিলে ছো মেরে নিয়ে গেলে মুরগি যেমন কককক করে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেরকম হিংস্রতা কমলা বেগমের চরিত্রে দেখেছি। খেলার মাঠে কমলা বেগমের চিৎকার শুনতাম। ছেলেরা খেলায় হেরে গেলেও কমলা বেগম মানতে রাজি নয়। ওদের পক্ষ নিয়ে ফ্যাশফেশে গলায় চিৎকারের শব্দ আজও কানে বাজে। আমার ছেলেরা সর্বশ্রেষ্ঠ – এটা প্রমাণ করতে নিজের জান দিতেও প্রস্তুত এই নারী। এমনকি ভাইবোনদের ছেলে মেয়েদের সাথে প্রতিযোগিতায়ও ছাড় দেবার পাত্র তিনি নন। এ জন্য আমি অনেক সময় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছি। বাস্তবে ছেলেরা আমার তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। শুধু তার চোখেই ছেলেরা শ্রেষ্ঠ। এসব কারণে আমি নিজেও কমলা বেগমের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়তাম। অন্ধভাবে তার সাফাই গাইতে গিয়ে স্বামীর রোষানলে পড়েছি অনেকবার। নারীর চাকরির দায়টা এখানেই!
এক সময় ছেলেরা বড় হয়ে গেল। জীবনের অনেক অপরিহার্যতা বদলে গেল। কমলা বেগম বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে। অসুখ-বিসুখে জর্জরিত। খাদ্য তালিকায় সবজি দুধ কলা ঠাঁই পেয়েছে। শুচিবাই রোগ যোগ হয়েছে। গলার ঘ্যাগ বুকের সিংহভাগে শিকড় বিস্তার করেছে। প্রায়ই ফোনে কথা হতো। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের বেতাল শব্দে ফোনের অপরপ্রান্তে আমি হিম হয়ে থাকতাম। এক চোখ দিয়ে অল্প অল্প পানি পড়া শুরু করলো। ডাক্তারের পেছনে যত খরচ তা বহন করেও সে কখনোই পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেনি। গলার গয়টারের কারণেই হয়তো। তার সুস্হ অসুস্থ সংবাদে আমাদের ভালো-মন্দ দিনকাল মিলেমিশে একলয়ে চলছিল। এ সময়গুলোতে কমলা বেগমের সেই সব অভাবগ্রস্ত ভাতিজাদের প্রযত্নে থাকার প্রয়োজন পড়লো। কালে কালে নাড়ি ছেঁড়া মেয়েটির সাথেও যোগসূত্র তৈরি হলো। মেয়ের ঘরের নাতি জামাল নানীর খোঁজখবর নিতে বেশ তৎপর – এ খবরও জানতে বাকি রইলো না। তবে সবকিছুই টাকার বিনিময়ে। মায়া মমতা কত মিছে! অভাব মানুষকে অনুভূতি শূন্য করে ফেলে। আমি এই মানুষটির দেখভালের আজীবনের পাহারাদার হয়ে রইলাম। ছেলেরা হলো আমার পাহারাদার। তার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র উদাসীনতা ছেলেদের মর্মাহত করতো।
এভাবে সময় গড়িয়ে যায়। ঘরে ছেলের বউরা আসে। বউরাও জেনে গেল চাকরিজীবী মায়ের সন্তানদের দ্বিতীয় মায়ের ভূমিকায় থাকা সেই ঘুমত্যাগী ফ্যাসফ্যাসে গলার কমলা বেগমকে। কমলা বেগমের অদৃশ্য চোখ এখনো ছেলেদের ভালোমন্দের খবর রাখে। কিন্তু ছেলেদের বাবা কমলা বেগমের স্নেহ ভালবাসার বাড়াবাড়ি কখনোই মেনে নিতে পারে নি।
আত্মীয়-স্বজনের কেয়ার অফে রোগশোক নিয়ে কমলা বেগমের নিরামিষ জীবন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু তাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ছেলের মাথায় বেড়ে ওঠে এক লালসবুজ স্বপ্ন। এ স্বপ্নের নায়িকা কমলা বেগম। তিনি জীবনে কোনো আনন্দ ভোগ করেননি। সারাজীবন অন্যের বাড়িতে কষ্ট করেছেন। গলায় গয়টর তার বেঁচে থাকার সব আনন্দকে ধুলিস্যাৎ করেছে। কাজেই তার এই জীবন একেবারে ফুরিয়ে যাবার আগেই এমন কিছু করা দরকার যা তার আজন্মের কষ্ট ভুলিয়ে মৃত্যুর আগে বেঁচে থাকার আনন্দ দিতে পারে। এ স্বপ্ন হয়ে উঠলো কমলা বেগমের প্রতি আমাদের সকলের সত্যিকার ভালবাসা প্রমাণের পরীক্ষা । এ পরীক্ষা যুদ্ধের অলিখিত সেনাপতি আর যোদ্ধাদের ভূমিকায় আমরা হয়ে উঠলাম এক একজন অভিনেতা। ছেলে দেশে এসে কমলা বেগমের পাসপোর্ট করিয়ে ফেললো। এরপর সবকিছুর দায়িত্ব আমাকে অর্পণ করে নিশ্চিন্তে ফিরে গেল অস্ট্রেলিয়া।
কমলা বেগমের হাতে যেন আকাশের চাঁদ ধরা দিল। সে অষ্ট্রেলিয়া যাবার স্বপ্নে বিভোর। হায়রে আমার চাকরির দায়! রাজি হলাম। পরিবারের সকলের প্রবল আপত্তি। স্বামী তো বলতে গেলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন, ‘মা ছেলে সব পাগল। শরীরে যার এত রোগের বাসা, সেতো বিদেশের মাটিতে যেকোনো সময়ে অক্কা পেতে পারে। দেশে তো সব চিকিৎসা আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তার কথা যুক্তিসঙ্গত। আত্মীয়-স্বজনের মতামতও নেতিবাচক। স্বাভাবিক চোখে এটা একটা বড় ধরনের বাড়াবাড়ি । কিন্তু সব বাড়াবাড়ির ব্যাখ্যা চলে না। তাই আমরা তিন পাগল একটু রাখডাক অর্থাৎ চুরি করে বিদেশ ভ্রমণের কাজগুলো শুরু করে এগিয়ে নিচ্ছিলাম। আত্মীয়-স্বজন জানার পরে বিষয়টি নিয়ে রীতিমত বাসায় আলোচনার ঝড় তুফান শুরু হলো। আমি নিজেকে অপরাধী মনে করতে শুরু করলাম, তখনই যখন বলা হলো ছেলেদের না হয় বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে, তাই বলে মা কি করে এমন একটি বিষয়ে ইন্ধন যোগাতে পারে! স্বামীর অবাধ্যতা শেষ পর্যন্ত কোন পরিণাম ডেকে আনে সেই চিন্তার জাল মাথায় বিস্তার লাভ করতে থাকে। কিন্তু সব চিন্তা ও সমালোচনা মাথায় নিয়ে মনে মনে আমি ছেলেদের সঙ্গে রইলাম। কারণ ঝড়ের সন্ধ্যায় মা হীন ছেলেদের বুভুক্ষ সময়গুলোতে এই মহিলার উপস্হিতি ছিল যেন কাকের বাসায় কোকিলের ডিম পাড়ার মতো নিরাপদ। এ সব স্মৃতির বেড়াজাল থেকে আমি কখনো নিজেকে মুক্ত করতে পারিনি। অতীত জীবনের ভুল-ভ্রান্তি ছায়াছবির মতো অবসর সময়গুলোতে মস্তিষ্কের পীড়াদায়ক যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। তাই সব কিছু পিছনে ফেলে ছেলেদের সিদ্ধান্তে আমিও অনড় রইলাম। মনকে সান্ত্বনা দিলাম এই বলে, আমি মা। সন্তানের জন্য মায়ের সীমাহীন ভালবাসা কোন বয়সে কীভাবে প্রকাশ পাবে তা কে ই বা অনুমান করতে পারে! মা ছেলের নাম ইতিমধ্যে মহাপাগলের খাতায় উঠে গেছে! সবার মুখে মুখে একই প্রশ্ন। আমার এধরনের সিদ্ধান্তের বিপরীতে স্মৃতির পাতাগুলোর জীবন্ত হয়ে ওঠার সঙ্গত কারণ রয়েছে বৈকি। অনেক কথা, অকথা, ভঙ্গি, ভেংচি হজম করে অকল্পনীয় একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আমাদের পাগলামী ধীরে ধীরে লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হতে থাকলো। কাজের মাঝামাঝি অবস্থানে আমরা পৌঁছে গেছি। যখন আমি, ছোট ছেলে এবং অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বড় ছেলে উত্তর মেরুতে অবস্থান নিয়েছি, তখন স্বামী ও আত্মীয়স্বজন দক্ষিণ মেরুতে তথা ঘোর বিরোধী পক্ষের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে লড়ছে। বউরা নিরপেক্ষ অবস্থানে।
কমলা বেগমের স্বাস্হ্য পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে এলো। তার শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি নিয়ে আমি বেশ চিন্তিত ছিলাম। তবে বড় ছেলে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ‘ছোঁয়াচে রোগ এবং হৃদযন্ত্রজনিত কোন কঠিন ব্যাধি না থাকলে ভিসা পেতে কোন সমস্যা নেই।’ তাছাড়া কমলা বেগম তো সারাদিন কাজ করে। অসুস্থ হলে এত কাজ করে কি করে? জ্বীন ভূত আছে নাকি? পুরানো দিনের সেই কথাটা মাথার মধ্যে লাফিয়ে উঠলো। ঠিক তখনই ডাক্তারের চেম্বারে আমাদের ডাক এবং আমরা হাজির। কমলা বেগমের ডাক্তারি পরীক্ষা চলছে। পাশের চেয়ারে বসে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে আমিও ব্যস্ত। ডাক্তারের পাশে দাঁড়ানো সহকারির হঠাৎ চিৎকারে আমার কথা বন্ধ হয়ে গেল। ‘ম্যাডাম তাড়াতাড়ি আসুন। পেটে তো দেখি একটা বড় সাইজের টিউমার।’ ডাক্তার পেটের টিউমারটা পরীক্ষা করতে করতে বললেন, ‘ভালো মনে হচ্ছে না। অনেক বড় হয়ে গেছে। আপনি আগে জানতেন না?’ আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়! বললাম,’না’। ইনি মাত্র আমার কাছে কিছু দিন আগে এসেছে।’ ডাক্তার বললেন, ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে। অপারেশন করতে হবে।’ আমার পায়ের নীচ থেকে সব মাটি সরে গেল। মাথার মধ্যে চক্কর দিতে লাগলো। কোনরকম কমলা বেগমকে নিয়ে বাসার পথে রওনা দিলাম। যে মানুষটি অপারেশনের ভয়ে সারা জীবন গলার গয়টর নিয়ে বসবাস করেছে, তাকে শেষ বয়সে অপারেশনের টেবিলে শুতে হবে এবং তা এখনই। যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত।
শুরু হলো নতুন যুদ্ধ। যে বাঘের খাঁচায় সন্তানদের রেখে আমার অফিস যাওয়া নিরুৎবিঘ্ন হতো, সেই খাঁচার বাঘের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া প্রহরীকে আজ ফেলে যাই কি করে? টিউমার অপারেশনের সব প্রস্তুতি শেষ। এতে প্রায় পনের দিন সময় চলে গেল। কিন্তু অপারেশনের আগেই ধরা পড়লো এক কঠিন রোগ বাসা বেঁধেছে কমলা বেগমের বুকের পাঁজরে। শ্বাসনালী ইচ্ছেমতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে বুকের গভীরে। হৃদযন্ত্র অসুস্থ। ফুসফুস পানিতে টৈ-টুম্বুর। আমি দুচোখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ছেলের উৎকণ্ঠা ও প্রতিদিনের হাজারো প্রশ্নের ঝড়ে আমার স্হির থাকা কঠিন হয়ে গেল। অপারেশন অসম্ভব। আগে বুকের রোগ বালাইয়ের চিকিৎসা অপরিহার্য। নয়তো নিঃশ্বাস ফিরে আসা নিয়ে ডাক্তার যথেষ্ট সন্দিহান। নতুন সংকল্প নিয়ে শুরু হলো বুকের চিকিৎসা। হাসপাতালের ডাক্তার প্রতিদিন একই কথা জানতে চান। ‘এই রোগীর আপনজন কেউ নাই?’ কার সাথে রোগীর বিষয়ে কথা বলবো?’ না, নেই। মৌমাছিরা সব গাঢাকা দিয়েছে। আমার সাথে সবরকম যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে। এমনকি ফোনও ধরে না। টাকার লোভ দেখিয়েও কাজ হয়নি। অগত্যা আমিও ওইসব অকৃতজ্ঞদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করেছি। পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আমার প্রতিকূলে। চাকরি করার সময় কমলা বেগমের শতভাগ সেবা আমি নিয়েছি। আজ শতভাগ তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত। অন্যদিকে, ছেলে এখনো তার ইচ্ছা পূরণের স্বপ্নে আচ্ছন্ন। এ যেন উভয় সংকট!
পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। সবসময় তটস্থ। অপেক্ষার প্রহর গুনি। দেখতে দেখতে অনেক দিন কেটে গেল। চিকিৎসা চলছে। হাসপাতালে কমলা বেগমের অবস্হান আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিতে থাকে। কমলা বেগমের শারীরিক জটিলতা এতই বেশি যে ডাক্তারদের সিদ্ধান্ত নিতে প্রচুর পরীক্ষা নিরীক্ষার দরকার হচ্ছে। কমলা বেগমের পরিপূর্ণ চিকিৎসার জন্য আমিও নাছোড়বান্দা। অষ্ট্রেলিয়ায় ছেলেও তাই ।
হাসপাতালে তার সঙ্গে একজন মানুষের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করাও ছিল ব্যয়সাপেক্ষ। তবু আমরা পিছু হটার পাত্র নই। কমলা বেগমের হাসপাতালে ভর্তি হবার দিন থেকে হাসপাতালে একজন আয়াকে নিয়োগ দেয়া হলো। টাকাপয়সার দিকে তাকালাম না। কারণ টাকা পয়সার বিনিময়েও এই সার্ভিস দেওয়ার লোকের বড়ই অভাব। সে যেকোনো মুহুর্তে চলে যেতে পারে এ আশঙ্কায় আমার নির্ঘুম রাত অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেল। দেখতে দেখতে আরও একমাস যেন চোখের পলকে উধাও হলো। ষাট কি পঁয়ষট্টি বছরের পরিপক্ক গয়টর অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে তৃতীয় বোর্ড সভা ডাক্তারদের। ধুকধুক বুকে অপেক্ষা করছি। সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত হলো। কমলা বেগমের গয়টর অপারেশন সম্ভব। এত বছর অপেক্ষার পরে এ জঞ্জাল কেটে ফেলে দেবার বন্দোবস্ত হলো। এই অপারেশনে টিকে গেলে টিউমার অপারেশন তো ডালভাত।
সব ঠিকঠাক। বেঁকে বসলো কমলা বেগম। কোনভাবেই তাকে রাজি করানো গেল না তো গেলই না। এখন উপায় কী।
শুরু হলো নতুন যুদ্ধ। গয়টর বাদ দিয়ে টিউমার ফেলতে হবে। বড় কোন বেসরকারি হাসপাতালে টিউমার অপারেশনই একমাত্র পথ। পরামর্শ, সলাপরামর্শ করে আরও কিছু সময় পার করলাম। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ডাক্তার, শুভাকাঙ্ক্ষীদের মতামত নিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে টিউমার অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে হলো এবং অপারেশনের দিনক্ষণ নির্ধারিত হলো।
নির্ধারিত দিনে কমলা বেগমের পেট থেকে ইয়া বড় এক টিউমার বের করা হলো। যে মানুষটার শরীরের ওজন মাত্র ৫৫ কেজি, সেই মানুষটার পেট থেকে এত বড় একটি টিউমার অপসারণ করা অকল্পনীয়। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার ওসিলায় কমলা বেগমের পেটের টিউমার অপারেশন করে ক্যান্সারের মতো সম্ভবনাকে মাটি চাপা দেবার আত্মতৃপ্তিতে আমি যখন বিভোর ঠিক তখনই বড় ছেলের সেই পুরানো আবদার মাথা চাড়া দিয়ে আমাকে বাস্তবে নিয়ে এলো। এত বড় এক মিশন শেষ করে যখন ক্লান্তিতে অবসন্ন, ঠিক তখন এর চাইতেও এক কঠিন মিশনে হাত দেবার মনোবল আমার শূন্যের কোঠায়। স্রোতের বিপরীতে নৌকা চালানোর শক্তি কোথায়? কিন্তু আবারও চাকরির দায় আমার চেতনাকে এক কঠিন ধাক্কা দিল। ধীরে ধীরে কমলা বেগম সুস্হ হয়ে উঠছে। নতুন স্বপ্নে চেহারায় দ্যুতি ফিরছে। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না।
আমি একটু একটু করে পুরো বিষয়টি ঝালাই করে নিলাম। কমলা বেগমের ইস্যূ উঠতেই ছোট ছেলে একটু এড়িয়ে গেল। হয়তো বাবার সঙ্গে এ বিষয়ে ওর কোনো কথাবার্তা হয়ে থাকতে পারে। অথবা বড় ভাইকে নতুন কোনো ঝামেলা কাঁধে নিতে পারবে না বলে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে। কারণ ওর নতুন চাকরিতে ম্যালা চাপ যাচ্ছে বলে শুনেছি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো সেদিনের ওভারসিজ কল। বড় ছেলে অন লাইনে নয়। বরং সরাসরি টেলিফোনে কল করেছে। আমিতো ওর গলা শুনে রীতিমতো কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে কথা বলতেই দেখি ছেলের গলায় আনন্দের কলকলানি। আমি বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এত খুশির কারণ কী? মনে হয় বাইরে কোথাও ঘুরতে বেরিয়েছো!’ ছেলে বললো, ‘এতদিনে তুমি আমার গলার স্বর শুনেই বুঝতে পারো আমি খুশি না অখুশি। অথচ যখন ছোট ছিলাম তখন এগুলো খেয়াল করার সময়ও তোমার ছিল না।’ আমি হতাশ হয়ে বললাম, ‘মোটেই না। তোমরা সবসময়ই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলে। এখন বলো কী খবরে তুমি এতটা খুশি।’ ‘কমলা বেগমের ভিসা হয়েছে।’ ছেলের খুশিতে আমিও খুশির ভাব দেখলাম। ‘নেটওয়ার্কের বাইরে আছি বলে ল্যান্ড ফোনে তোমাকে কল করলাম। সত্যি বলতে কি খবরটা একা হযম করতে পারছি না। তাই ল্যান্ড লাইনে তোমাকে ফোন করলাম। তাছাড়া এখনই তোমার সঙ্গে জরুরি কিছু কথা সেরে রাখি। কমলা বেগমের জন্য আমি অনলাইনে টিকেট পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি সব ব্যবস্হা নিতে থাকো। আচ্ছা পাসপোর্টটা তো তোমার কাছে তাইনা আম্মু?’ ‘জ্বী আব্বু। খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছি।’ ‘মা, তোমার মনে পড়ে এই পাসপোর্ট করতে কত ঝামেলা পোহাতে হয়েছে?’ ছেলের পুরানো কষ্টের স্মৃতি রোমন্থনে আমি শ্রোতা হয়ে শুধু শুনে গেলাম। ‘মনে আছে বাবা। ঠিকানা নিয়ে কত যে ঝক্কি ঝামেলা গেল! ‘যাক, এখন পরিচিত কারো সঙ্গে প্লেনে উঠিয়ে দিতে পারলেই আমাদের মিশন সফল।’ আমরা মিশনের শেষ ধাপে আছি। আমিও শেষতক টিকে রইলাম এই যুদ্ধে। যুদ্ধের অনেক ছোটখাটো বিষয় তো আমি একাই সামাল দিয়েছি। এ মিশনের বিপক্ষে তো কম লোকজন ছিল না! স্বামী, আত্মীয় স্বজনের বাইরে বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে কমলা বেগমের রক্তের একমাত্র মেয়ে কোহিনূর, জামালের মা। কমলা বেগমের অসুস্থতার সময়ে যে মেয়ে বলেছিল, ‘আপনারা হ্যারে লইয়া যা খুশি করেন আমরা কিছুই কইতে যামু না। হেতো সারাটা জীবন আপনাদের কাছেই রইছে। হ্যারে নিয়া মোগো কোনো দাবি দাওয়া নাই।’ সেই মেয়ে কোহিনূর একদিন চুপিসারে আমারে ফোন দিয়ে বলে, ‘মায়রে বিদেশ পাঠাইয়া কী হইবো! ওই টাকা আমারে দিলে আমার প্রতিবন্ধী মাইয়াডারে ঢাকা যাইয়া ডাক্তার দেহাইতে পারতাম।’ আমার মনে হয়েছে কোহিনূরের এই কথাগুলো কারো শেখানো কথা। মনের মধ্যে একটা সন্দেহ ঘনীভূত হয়ে আবার মিলিয়ে যায়। ছেলেদের সাথে এ বিষয়গুলো কখনোই আলাপ করি নি। কমলা বেগমের ভিসা হয়ে যাওয়ায় কত কথাই না আজ মনে পড়ছে! স্বামীসহ তামাম আত্মীয়-স্বজন পরিচিত অপরিচিত সবাই নারীর ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে একবিন্দুও ছাড় দেয় নি। আমি সারাজীবন টাকা-পয়সা কামাই করে অপাত্রে ঢেলেছি। বৈষয়িক জ্ঞান বলতে আমার কোন জ্ঞান নেই ইত্যাদি। তবে কয়েকদিন ধরে আমার পরিপক্ক চোখ স্বামীর মধ্যে একটা অচেনা অস্থিরতা লক্ষ্য করলাম। জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে ভাইপোরা ফোনে স্বামীর গ্রামে উপস্হিতির বিষয়টি আমাকেও অবহিত করেছে। আমি অবশ্য মনে মনে এমন কিছু একটা আশা করছিলাম। কারণ কমলা বেগমের বিদেশ ভ্রমনে তার সবচেয়ে বড় আপত্তি ছিল। কাজেই চোখের সামনে বসে বিদেশ যাবার সব প্রস্তুতি নেয়া আমাদের জন্য বিব্রতকর। আমার নিজেরও তো একটা চক্ষু লজ্জা আছে। স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে একজন কাজের মানুষকে নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি করেছি। তাই আমি মনে মনে যা হয় ভালোর জন্যই হয়- এমন ভাবনায় নিজেকে স্হির রাখলাম।
স্বামী গ্রামের বাড়ি চলে গেলে কমলা বেগমের উড়োজাহাজে আকাশে ওড়ার প্রস্তুতি পুরাদমে শুরু হলো। পনের ডিসেম্বর ফ্লাইট। পরিচিত একটা ফ্যামিলি যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে। তাদের সঙ্গে কমলা বেগমের যাওয়া ঠিক হলো। শীতের কাপড়চোপড় কেনা থেকে শুরু করে সবকিছুই ঠিকঠাক মতো এগিয়ে চলছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ত্রিমুখী যোগাযোগ। ডিজিটাল যুগে টিকেট কেনা থেকে শুরু করে সব কাজ অল্প সময়ে, কম খরচায় তরতরিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এ সব কাজ বাধাহীন ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে-এও যেন মনের মধ্যে একটা খচখচানি শুরু করে দিল। আমরা নারী জাতি বড়োই অদ্ভুত। একটা ফোল্ডারে এক এক করে জরুরি কাগজপত্র সাজাচ্ছি। ছোট ছেলে, ছেলের বৌ কাছে বসে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে মূহুর্তগুলোকে আনন্দে ভরিয়ে দিচ্ছে। কমলা বেগম কাছাকাছি বসে সব কাগজ বুঝে নিচ্ছে। ছেলের বৌ হেসে হেসে বললো, ‘ওখানে গিয়ে আবার আমাদের ভুলে যেও না। আমার জন্য কিন্তু চকোলেট আনবে। কমলা বেগম আমাদের কথা শুনেই যাচ্ছে। শুধু মুখে বললো, ‘দোয়া কইরেন।’ ‘তোমার কী ভয় করে?’ ছোট ছেলের প্রশ্ন। ‘না ভাইয়া।’ ভয় কিসের। যাগো কাছে যাইতেছি তাগো কাছে গিয়া মইরাও শান্তি।’ আমি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলাম। ‘কী অলক্ষুনে কথা! মরার কথা আসে কেন? ওখানে মরতে যাবে কোন্ দুঃখে? ওখানে তোমার মরার অর্থ জানো? অষ্ট্রেলিয়ায় তুমি মরা মানে দেশে আমাদের সবার একসঙ্গে মরা।’ এ কথা আবার বললে তোমার সব কাজ বন্ধ, যাওয়াও বন্ধ। কমলা বেগম হাত জোড় করা ভঙ্গিতে বললো, ‘না না এমন কতা আর কমু না।’ আমিও হালকাভাবে বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা বেশ। এখন যাও তো আমার ব্যাগটা নিয়ে এসো। পাসপোর্টটা ওখানে আছে।’ কমলা বেগম ব্যাগটা নিয়ে এসে আমার হাতে দিল। উড়োজাহাজে একা এই বয়সের আমার চিরদিনের পুরাতন ভৃত্য ভ্রমণ করবে। তাকে সবকিছু এমনভাবে গুছিয়ে দিতে হবে যাতে কোন সমস্যায় না পড়ে। কমলা বেগমের হাতে যে ব্যাগে সব জরুরি কাগজপত্র থাকবে, সেই ব্যাগ আমি নিজ হাতে গুছিয়ে দিলে সমস্যা হবে না। সব কাগজপত্র গোছানো প্রায় শেষ। এখন পাসপোর্টটা রেখে ব্যাগটা কমলা বেগমকে ধরিয়ে দিলেই আমার আজকে রাতের দায়িত্ব শেষ। আর একটা দিন বাকি। মনটা কেমন হু হু করে উঠছে। চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে অনেক অতীত স্মৃতি। এসব স্মৃতির যন্ত্রণা তাড়াতে সযত্নে ব্যাগে রাখা পাসপোর্ট বের করতে গেলাম। কিন্তু ব্যাগে হাত দিয়েই দেখলাম যথাস্হানে পাসপোর্ট নেই। ব্যাগের সব কয়টি চেম্বার তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করলাম। পাসপোর্ট কোথাও নেই। সম্ভাব্য অন্য সব ব্যাগ খোঁজা শুরু করলাম। স-ব স-ব খোঁজা শেষ। কোথাও পাসপোর্ট নেই। আলমারি থেকে শুরু করে বিছানার ম্যাট্রেসের তলা পর্যন্ত কোন কিছুই বাদ গেল না। যত দোয়া দুরুত জানা ছিল সব পড়লাম। আল্লাহকে তাঁর সুন্দর সুন্দর নাম ধরে ডাকলাম। কিন্তু কোথাও পাসপোর্ট পেলাম না। এরপর শুরু হলো পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ। সবাইকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করলাম। ব্যর্থ হলাম। কমলা বেগমের চোখমুখে গভীর কালো ছায়া নেমে এলো। বড় ছেলেকে জানালাম। সে কিছু সময় বাকরুদ্ধ অবস্হায় থেকে শুধু বললো, ‘আমি জানি পাসপোর্ট তুমি কখনোই আর খুঁজে পাবে না।’ আমি দিশেহারা। আমার ব্যাগ থেকেই হারিয়ে গেছে। তাই এ দায় তো আমারই। আমি যত জায়গায় গেছি, সেসব জায়গায় ফোন করেও নিশ্চিত হয়েছি যে কোথায় পাসপোর্ট ফেলে আসি নি। অগত্যা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। হঠাৎ মনে হলো স্বামীর কথা। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল হাতে নিয়ে দিলাম কল। ফোনে সংযোগ দেয়া সম্ভব না। শেষ তল্লাশিকেন্দ্র। আমার ভিতরে আশার আলো জ্বলছে। হয়তো তার কাছে সাবধানতা বিবেচনায় কোন এক সময় রেখে দিয়েছি, এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। ফোন বন্ধ। আবার করলাম। সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে দুঃসহ সময় কেটে যাচ্ছে। আমার হৃদপিন্ডের ধুকধুক শব্দে আমি নিজেই ভয় পাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত স্বামীকে পেলাম। এতক্ষণ ধরে মোবাইলে তাকে reach করতে না পারার জানতে চাইলাম না। কারণ এ রকম পরিস্থিতি জীবনে অনেকবার হয়েছে, বহুবার জরুরি বা কঠিন সময়ে তার ফোন বন্ধ পেয়েছি। একবার অফিসের জরুরি মিটিং এ যাবার তাড়াহুড়োতে একটি গোপনীয় ডকুমেন্ট বাসায় ফেলে অফিসে রওয়ানা গেছি। বাসায় সেই মূহূর্তে কেউ নেই। আবার আমার ব্যাগে বাসার চাবিও নেই। কী এক অবস্থা! তাড়াতাড়ি বাসা ফিরে দেখি স্বামী বাসায় নেই। কল দিলাম মোবাইলে। নো রেসপন্স। আবার কল দিলাম। নো রেসপন্স। এভাবে দশ/ বারোটি কল দিয়েও তাকে পাই নি। পরে বাসায় কথা বলতে গিয়ে জানালো, তিনি বাসার কাছাকাছিই ছিলেন। তবে পকেটে মোবাইল থাকায় কল শুনতে পান নি। এভাবেই তার নির্লিপ্ত জবাব শুনে শুনে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই সরাসরি জানতে চাইলাম, ‘কমলার পাসপোর্ট কি তোমার কাছে? ‘কেন?’ স্বামীর উল্টা প্রশ্ন। ‘পাসপোর্ট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’ ‘আমি জানি না। আমি কখনো তার পাসপোর্ট দেখিনি। আমাকে তো কমলার পাসপোর্ট তোমরা দেখাও নি।’ একটু থেমে আবার বললো, ‘খুঁজে দেখো। কোথাও রেখেছো হয়তো। এখন মনে পড়ছে না। পেয়ে যাবে।’ আমার শেষ আশাটুকু ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। চোখে অন্ধকার দেখছি। ফোনটা হাতে থেকে পড়ে গেল। বড় ছেলের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। ছেলের ব্যথাক্লিষ্ট মুখটা সহ্য করা কঠিন। সব চেয়ে বিশ্বস্ত স্হান থেকে সবচেয়ে কষ্টার্জিত জিনিস হারিয়ে গেছে। ছেলে কী আমাকে সন্দেহ করবে? আমিও তো অনেক সময় কমলা বেগমের বিদেশ যাওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছি। বিশেষ করে যখন অপারেশনের পর আমার ক্লান্তির ব্যারোমিটার সর্বোচ্চে পৌঁছেছিল? আমি আর ভাবতে পারছি না। নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে কখন যেন পৌঁছে গেলাম স্বামীর স্টাডি রুমে। চারিদিকে বই, ম্যাগাজিন, পেপার, পেপার কাটিং ইত্যাদি। বেডের পাশে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রসামগ্রী। এককথায় একটি আজব স্টাডি চিড়িয়াখানা। এখানে যিনি প্রবেশ করবেন তিনি একসাথে অনেক কিছুর রস আস্বাদন করবেন। কিন্তু আমি কেন এখানে এলাম? আমি কী নিজের স্বামীকে অবিশ্বাস করি? আমি কে? কেন এসব করছি? এসব প্রশ্ন একদিকে ঠেলে দিয়ে আমার দুচোখকে টর্চ লাইটের মতো তীক্ষ্ণ করে খোঁজা শুরু করলাম। আমার সাধ্যমত সবকিছু হাতড়িয়ে দেখলাম। সাড়াশি তল্লাশি। হালকা শীতের রাতেও আমি ঘামিয়ে গেলাম। পেলাম না। স্বামীকে অবিশ্বাস করার কষ্ট যেন পুরো কাহিনীকে আরো ভারী করে দিল। এখন আমি কী করতে পারি। আগামীকাল সকাল দশটায় ফ্লাইট………
স্বপ্নটা অনেক পথ পাড়ি দিয়ে অনেক দূর গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। মরে যাওয়া স্বপ্নকে বাঁচিয়ে তোলার মতো সময় বা শক্তি ছিল না। আকাশে ওড়ার স্বপ্ন নিঃশেষ হয়ে গেল কমলা বেগমের।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো। এরপর আরো দুই বছর কেটে গেছে। মৃম্ময়ী পৃথিবীতে আমাদের সময় কেটে যাচ্ছে।
একদিন,
ড্রয়িংরুমে ঘরে বসে আমি দুই সন্তানের মা একজন দিলরুবা জামান, প্রধান, মানব সম্পদ বিভাগ, প্রযত্নে- রাশেদুল হক, ফ্রিল্যান্সার, যখন পুরান পেপারের বস্তা ফেলে দেবার কসরত করছিলাম, তখন হঠাৎ পুরানো পেপারের মধ্যে কিছু একটা হাতের ঠনঠনে মাংসে মৃদু আঘাত হানলো। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে না পারলেও দেখলাম সেটা আর কিছু নয়। কমলা বেগমের পাসপোর্ট।
রীনা পারভীন: বিসিএস (প্রসাশন) ক্যাডারের একজন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব পদস্থ কর্মকর্তা। হালে তিনি একজন অনুপ্রেরণামূলক, সচেতনতামূলক ও সৃষ্টিশীল শিশুতোষ গল্পকার।







