নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাত দীর্ঘদিন ধরে হকারদের দখলে থাকায় নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছিল। পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন, যানজটের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং জরুরি যানবাহনের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা—সব মিলিয়ে নগর জীবনে বিশৃঙ্খলা ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উদ্যোগে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানে সেই চিত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে, যা নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়েছে।
রাজধানীর গুলিস্তান, বনানী, মিরপুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিচালিত অভিযানে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে বসা হকারদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বনানী-কাকলী এলাকায় অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব সীমানার বাইরে ফুটপাত দখল করে রান্নার সরঞ্জাম, গ্রিল মেশিন, আসবাবপত্র ও ওয়ার্কশপের যন্ত্রপাতি স্থাপন করেছিল। অভিযানে এসব অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয় এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়েছে।
মিরপুর-১০ চত্বর ও আশপাশের এলাকায় ধারাবাহিক অভিযানে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত হওয়ায় যান চলাচলে গতি ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে একাধিক লেন দখল করে বসা ভাসমান দোকানপাট সরিয়ে দেওয়ায় যানজট কমেছে বলে জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ। ফলে পথচারীরা এখন স্বাচ্ছন্দ্যে ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছেন, যা বিশেষ করে অফিস সময় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির সময়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অভিযান কোনো এককালীন উদ্যোগ নয়; বরং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফুটপাতকে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং নগর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করাই এর মূল লক্ষ্য। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা এবং প্রয়োজন হলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে এই স্বস্তি কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে নগরবাসীর মধ্যে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উচ্ছেদের কিছুদিন পরই হকাররা পুনরায় ফুটপাত দখল করে বসে। এ কারণে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত অভিযান ও কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটপাত দখলমুক্ত থাকলে মানুষ হাঁটতে উৎসাহিত হবে, যা ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সামগ্রিক ট্রাফিক পরিস্থিতির উন্নতিতে সহায়ক হবে। তবে এ ক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ক্রেতাদের চাহিদা থাকলেই হকাররা পুনরায় বসার সুযোগ পায়—এমন মন্তব্যও করেন তারা।
অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মসংস্থান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই নির্দিষ্ট হকার জোন তৈরি করে তাদের একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা যেতে পারে। এতে যেমন জীবিকা রক্ষা পাবে, তেমনি ফুটপাত ও সড়কও দখলমুক্ত থাকবে।
গুলিস্তান এলাকার এক ব্যবসায়ী জানান, আগে ফুটপাত দখল থাকায় বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখন অন্তত নিরাপদে চলাচল করা যাচ্ছে।
ডিএমপির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে হকারদের পুনর্বাসন এবং বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উচ্ছেদ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন নিয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে করে একদিকে যেমন ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও জীবিকা হারানোর ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক অভিযানে নগর জীবনে স্বস্তি ফিরে এলেও তা স্থায়ী করতে প্রয়োজন ধারাবাহিক অভিযান, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।







