জুলাই অবমাননা নাকি ভিন্নমত? কোথায় বাকস্বাধীনতার সীমারেখা? এমন প্রশ্নের পর প্রশ্ন নির্মিত হচ্ছে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদলের দুই বছর পর। কারণ কি জানেন?
কি কারণে নির্মাণ হচ্ছে ছাত্র আন্দোলন বা জুলাই প্রসঙ্গে এমন প্রশ্ন? কারণ কথা বলার স্বাধীনতার অঙ্গীকারের ভিত্তিতে, কোটা বৈষম্য দূর করার স্লোগানের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশ সারিবদ্ধ হয়ে যে জুলাই আন্দোলনে নেমেছিলো, আজ সেই জুলাইতে এসে সত্য কথা বলার কারণে নতুনধারার নেত্রী শান্তা ফারজানা, অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি, সাংবাদিক আনিস আলমগীর, সোমা ইসলাম, মোমিন মেহেদী ও পিয়া জান্নাতুলের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। যে অভিযোগে বলা হয়েছে- ছাত্রদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন অভিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্টরা জুলাই আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, শহীদ ও আহতদের নিয়ে কটূক্তি, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং ‘নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলকে পুনর্বাসনের চেষ্টা’ করেছেন। তবে এসব অভিযোগ এখনও মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি। পুলিশ বলছে, অভিযোগে উল্লেখ করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ভিডিও, লিংক ও বক্তব্য যাচাইয়ের পর আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
একজন সমাজ সচেতন নাগরিক হিসেবে বরাবরের মত আমি মোমিন মেহেদী দেশকে ভালোবাসবো, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের বিপক্ষে কথা বলবো, এসব আমার নাগরিক অধিকার। সেই অধিকার ক্ষুন্ন করতে চাইছে যারা; তাদেরকে কি অপরাধী বলতে পারবো না! এই অপরাধীরা যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকগোষ্ঠী। যে জুলাইর উপর ভর করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী মুক্তি পেয়ে আবার সংসদেও চলে গেছে, সেই জুলাই আপামর বাংলাদেশের শত্রু, জনতার শত্রু। এই জাতির শত্রু, দেশের শত্রুদের অভিযোগ গ্রহণ করে কিভাবে? অভিযোগ গ্রহণ তো করেছেই, সেই সাথে তাদের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- অভিযোগে থাকা পোস্ট, ভিডিও, লিংক এবং বক্তব্যগুলো যাচাইয়ের জন্য সাইবার ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা কোনও পোস্ট বাস্তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কিনা, সেটি সম্পাদিত বা বিকৃত কিনা এবং বক্তব্যের পুরো প্রেক্ষাপট কী ছিলÑ এসব বিষয়ও যাচাইয়ের প্রয়োজন হবে।
অভিযুক্ত ৬ জনের মধ্যে যেহেতু আমার নামও আছে, সেহেতু আমি বলতে পারি যে, জাতি সত্যিকার্থেই অসহায় হয়ে গেছে দেশ বিরোধী ও তাদের সমর্থকগোষ্ঠীর দ্বারা। শিল্পী, সাংবাদিক ও আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের ঘটনাকে ঘিরে সামনে এসেছে নানামুখী বিতর্ক। জুলাই নিয়ে করা কোন বক্তব্য রাজনৈতিক সমালোচনা, কোনটি মতামত বা ভিন্ন ব্যাখ্যা, আর কোনটি মিথ্যা তথ্য, বিদ্বেষ, অপমান, হুমকি বা সহিংসতায় উসকানির পর্যায়ে পড়ে এবং আইনগত ব্যবস্থার বিষয় হবেÑ সেটা নিয়েই এখন আলোচনা চলছে যখন তখন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে শাহরিয়ার কবির নামক স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীর সমর্থক। তার মতে ‘একাত্তর একটা ভুল ছিলো।’ কই তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ হলো না। কারণ কি? কারণ এরা রাজনৈতিক-প্রশাসনিক শক্তিতে শক্তিমান। আমরা চাইলেও এদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছি না। যারা রাজনীতি-শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-অর্থনীতি-ধর্ম-মানবতা ধ্বংস করে দিতে প্রতিনিয়ত কাজ করছে, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করছে অতিতের মত। এদেরকে কেউ না থামালে লোভি-লম্পট-টাউটাররা ধ্বংসপরিকল্পনায় সফল হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছি।
জুলাই ২০২৪-এর পর অসংখ্য ভূঁইফোর সংগঠন তৈরি হয়েছে। সেই ভূঁইফোরগুলোর মধ্যে একটি হলো- ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’। না তাদের কোনো নৈতিক কর্মসূচি আছে-ছিলো; না তাদের কোনো ভিত্তি করবার মত কোনো সাংগঠনিক পদক্ষেপ ছিলো। তবু তাদেরই প্রতিনিধিরা সাংবাদিক ও কলামিস্ট আনিস আলমগীর, টিভি উপস্থাপিকা সোমা ইসলাম, আইনজীবী ও মডেল জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া ওরফে পিয়া জান্নাতুল, কলামিস্ট মোমিন মেহেদী, মডেল মারিয়া কিসপট্টা এবং অভিনেত্রী ও মডেল তুষ্টির বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে প্রমাণ করেছে এই দেশে সন্ত্রাসী, ধর্ষক, খুনী, ছিনতাইকারী, ডাকাত- চোর বা দেশ বিরোধী-যুদ্ধাপরাধী-দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তারা কখনো না দাঁড়ালেও নীতিবান দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেই। কেননা, যুদ্ধাপরাধী-দুর্নীতিবাজদের পৃষ্টপোষকতাতেই এই জুলাই হয়েছিলো বলে অভিযোগ করছেন বিভিন্ন মহল; আমার ধারণাও অনেকটা এমন। তা না হলে এত এত বিষয় থাকতে তারা কেন বাক স্বাধীনতা রুদ্ধ করতে সাংবাদিক-শিল্পীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে! তারা হয়তো জানেই না নির্মম ইতিহাস সৃষ্টি হয় স্বৈরাচারি কায়দায় এমন মামলা-অভিযোগের পাহাড় খুরে খুরে।
অবশ্য সত্য-সুন্দর-সাহস সবসময় আলোর পক্ষে থাকে বলেই আমরা ভয় পাই না নিন্দুককে, খুনীকে বা সন্ত্রাসীকেও। আমরা যারা আলোর পথযাত্রী, তাদেরই একজন নিবেদিত দেশপ্রেমিক আনিস আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন-খবরে নাম ফাটানোর সস্তা উদ্দেশ্যে সম্প্রতি কিছু ব্যক্তি, আরও কয়েকজনের সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে থানায় যে অভিযোগ করেছে, তা নিছক ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার। আমি কখনোই ‘জুলাই’কে অবজ্ঞা করিনি, জুলাইয়ের শহীদদের প্রতিও অসম্মান দেখাইনি। বরং যারা তাদের আত্মত্যাগকে অপমান করে কদর্য ভাষায় আক্রমণ করে, তাদের বিরুদ্ধেই আমি সরব থেকেছি এবং তার সুস্পষ্ট প্রমাণ রেকর্ডে রয়েছে। আমার সমালোচনা বরাবরই ড. ইউনূসের অপশাসন এবং ‘জুলাই’ নামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তির মববাজি, চাঁদাবাজি, প্রতিহিংসা, অগণতান্ত্রিক ও দুর্বৃত্তসুলভ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে। এখন যদি এসবের সমালোচনাকেই ‘জুলাই অবমাননা’ বলে চালানো হয়, তাহলে সেটা নিছক সত্যকে চেপে যাওয়ার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। চেতনা ব্যবসা। যদি সমালোচনার এই অধিকারটুকুও কেড়ে নিতে চান, তাহলে সরকারের উচিত স্পষ্ট করে আইন করে দেওয়াÑ জনগণ ‘জুলাই’ নিয়ে কী বলবে, আর কী বলতে পারবে না।”
সাংবাদিক আনিস আলমগীরের মত আমি জুলাইকে অবজ্ঞা করিনি বলবো না। বলবো- জুলাই নিয়ে প্রশ্ন করেছি, আগামীতেও করবো। কারণ এই জুলাই যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সমর্থকদেরকে সংসদে নেয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আমার মত করেই হয়তো ভাবেন অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন। যে কারণে তিনি নির্বিঘ্নে সমালোচনা করেছেন, সমালোচনায় পিছিয়ে নেই চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহিও। আর সমালোচনার পাশাপাশি স্বাধীনতার বিরোধীতা করার দায় দিয়ে নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান শান্তা ফারজানা ‘প্রতীকী জুলাই ঘৃণা স্তম্ভ’ উদ্বোধন করেছেন নতুনধারার নেতাকর্মীদেরকে সাথে নিয়ে। সেখানে নতুনধারার নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে ঘৃণা জানিয়েছে। ‘জুলাই ঘৃণা স্তম্ভ’ বাংলাদেশের পাড়ায়-মহল্লায়-ইউনিয়নে ইউনিয়নে নির্মিত হবে যদি দেশে আর কারো বাক স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা করা হয়। মানুষ সব জেনে গেছে, সব বুঝে গেছে। তাই তারা এখন আর এনসিপি বা বাংলাদেশ জামায়াতের ডাকে সাড়া দেয় না। তারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য নির্মম লাশের খেলা বুঝে গেছে। নতুন করে আর কোনো দলের ক্ষমতায় আসবার বা বিরোধী দল হওয়ার মাধ্যম মানুষ হবে না বলেই আমার কাছে প্রতিয়মান হচ্ছে। ছাত্রদের বৈষম্য দূর করার আন্দোলন যখন সরকার পতন করেছে, ছাত্ররা যখন উপদেষ্টা হয়েছে, আবার সেই ছাত্ররাই যখন আমেরিকার হাতে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে মাতৃভূমি বাংলাদেশকে তুলে দিয়েছে, যখন সেই স্বাধীনতা বিরোধী ইঙ্গ-মার্কিন শক্তিকে তাদের স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় সংসদে করতে দিয়েছে, তখনই জনগণ বুঝেছে ছাত্রদের দ্বারা তারা প্রতারিত হয়েছে চরমভাবে।
এই প্রতারণা প্রতিশোধ তো দেশ ও মানুষ নেবেই। তা ব্যালটের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো উপায়ে! কিন্তু তার জন্য যেমন তাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে, অপেক্ষা করতে হবে আমাদের মত অবিরত সংগ্রামমূখর রাজনীতি-শিক্ষা-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক-সামাজিক ও মানবিক কর্মীদেরকেও। সেই সাথে মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে- কখনো মামলা দিয়ে হামলা করে সত্যকে আড়াল করা যায় না। যেমন আড়াল করা যাচ্ছে না একাত্তরের বীরত্বগাঁথা ইতিহাসকে…
———————————
মোমিন মেহেদী : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাভাস
email : mominmahadi@gmail.com






